সোমবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ৩ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান: প্রতিবাদের মন্ত্রধ্বনি

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২১, ১৬:৩১

হেমাঙ্গ বিশ্বাসের (১৯১২-১৯৮৭) লক্ষ্য ছিল সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে মানুষকে জাগানো। তাই সংগীত আর নাটক হয়ে ওঠে তার সংগ্রামের হাতিয়ার। ১৯৩৮ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ গঠনে ভূমিকা রাখেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন বিনয় রায়, নিরঞ্জন সেন, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখ। আইপিটির শেষপর্যন্ত তিনি এই সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন।

১৯৪২ সালে বাংলার প্রগতিশীল লেখক শিল্পীদের আমন্ত্রণে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের প্রথম কলকাতায় যান গান গাইতে। ১৯৪৩ সালে জ্যোতিপ্রকাশ আগরওয়ালের সহযোগিতায় তার উদ্যোগে সিলেট গণনাট্য সংঘ তৈরি হয়। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের গানের সুর যারা করতেন, হেমাঙ্গ ছিলেন তাদের প্রধান ব্যক্তি। সেই সময়ে কাস্তে নিয়ে লেখা ও সুর করা গানগুলো কৃষকসমাজকে তুমুলভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ষাটের দশকে ‘সোভিয়েত দেশ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে কাজ করতেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় কাজ ছেড়ে দেন। এসময় চীন-ভারত মৈত্রী সৃষ্টিতে অবদান রাখেন। চীনা ভাষা শিখে গানও রচনা করেন তিনি। জীবনের শেষ দিকে ‘মাস সিঙ্গার্স’ নামে একটি গানের দল গঠন করে গ্রামে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। 

সাধারণ মানুষের জীবনের সুরকে তিনি গানে প্রয়োগ করেছেন। লোকসংগীতের সুরে তিনি জুড়ে দিয়েছেন শ্রেণীসংগ্রামের বাণী। তার গান তাই মানুষের প্রিয় হয়ে উঠেছে। ঝুমুর, ভাওয়াইয়া, জারি-সারি, মুর্শিদি, ভাটিয়ালি, বাউল প্রভৃতি গানের সুর লোকজ আঙ্গিকের গাজির গান, ধামাইল, টপ্পা, হোরি প্রভৃতি নানান ধরনের সুরকে নিজের মতো গ্রহণ করে নতুন মাত্রায় প্রয়োগ করেছেন। সেখানেই তার গানের নতুনত্ব আর জনলগ্নতার মূল রহস্য। কারণ এই সুরগুলো সাধারণ মানুষেরই সৃষ্টি। তাই তিনি বলেছেন, ‘আমার অধিকাংশ গানের সুর উৎপাদনকারী শ্রমজীবী জনগণের সৃষ্টি। আমার গান আমার একার সৃষ্টি নয়, একটা আন্দোলনের সৃষ্টি।’ তিনি কেবল বাংলার সুর নয়, সাম্যবাদী দেশগুলোর গানের সুর থেকেও গ্রহণ করেছেন নতুন সুর।

‘লোকসংগীত একটি দেশজ প্রচলিত art form, যা একান্তই মাটি থেকে জন্ম নিয়ে স্বীয় ভৌগোলিক সীমায় যুগ যুগ ধরে প্রবহমান। এক একটি উপজাতির মাতৃভাষার বা dialect-এর মতো তাদের সুরের total formation-ও আলাদা। যদিও human basic feelings-গুলো সর্বত্রই এক, তথাপি পাহাড়, নদী, সাগর, উপত্যকা, মরুভূমি এবং মানুষের বিভিন্ন শ্রম প্রক্রিয়ার প্রভাব এসে পড়ে সুরের আঞ্চলিক প্রভেদ আনে।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর হয়ে রাজনীতিতে আসেন। কিন্তু হয়ে ওঠেন গানের মানুষ, নাটকের মানুষ। তার সম্পর্কে সলিল চৌধুরী বলেছেন, ‘কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা, গঙ্গা থেকে ভোলগার হাওয়ায় ছোটে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের গানের কথা... [তার] গানের সুর মানুষকে উদবুদ্ধ করে...করে উত্তেজিত। পৃথিবীর খেটে খাওয়া মানুষের বন্ধু তিনি। শোষিত মানুষের মুক্তির দিশারী, শোষকের ত্রাস। সাম্রাজ্যবাদিদের শত্রু তিনি। গানের সমুদ্রে তাঁর গান রোষবর্জিত ঢেউ। আর একদিকে শান্ত আকাশে কালবৈশাখীর ঝড় তাঁর গান। অশান্ত মানব জীবনে তিন শান্তির দূত। মানব চেতনার আর এক নাম হেমাঙ্গ বিশ্বাস। জীবন বড় সুন্দর, জীবন বড় মধুর, জীবনকে ভালবাসার প্রতীক হেমাঙ্গ বিশ্বাস। শৃঙ্খলিত মানুষের শৃংখল মুক্তির আশা হেমাঙ্গ বিশ্বাস। বিশ্বশান্তির শ্বেত পারাবত তিনি। মুক্ত নীল আকাশে ডানা মেলে যে শঙ্খচিল গান গেয়ে ফেরে সেইতো হেমাঙ্গ বিশ্বাস। কেরানির কলম তিনি। শ্রমিকের হাতুড়ি তিনি। কৃষকের কাস্তে তিনি। ধানের সোনালি শিসের নাম হেমাঙ্গ বিশ্বাস।’

কেবল লোকসংগীতকে গণসংগীতে রূপান্তর নয়, জনগণের সুরে বাঁধা জাগরণের গান নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন। ‘লোকসঙ্গীত সমীক্ষা: বাংলা ও আসাম’ নামের গ্রন্থে তার সেই গবেষণার উপাত্ত বিধৃত রয়েছে। সংগীতকে যেখানে গুরুমুখী বিদ্যা বলা হয়, লোকসংগীতকে তিনি ‘গুরুমুখী নয়, গণমুখী’ বলে নতুন অভিধায় চিহ্নিত করেছেন। লোকসংগীত নিয়ে তার ধারণা:

‘লোকসংগীত একটি দেশজ প্রচলিত art form, যা একান্তই মাটি থেকে জন্ম নিয়ে স্বীয় ভৌগোলিক সীমায় যুগ যুগ ধরে প্রবহমান। এক একটি উপজাতির মাতৃভাষার বা dialect-এর মতো তাদের সুরের total formation-ও আলাদা। যদিও human basic feelings-গুলো সর্বত্রই এক, তথাপি পাহাড়, নদী, সাগর, উপত্যকা, মরুভূমি এবং মানুষের বিভিন্ন শ্রম প্রক্রিয়ার প্রভাব এসে পড়ে সুরের আঞ্চলিক প্রভেদ আনে। গণসংগীত কিন্তু ভিন্ন জিনিস। এ মানুষের সচেতন জীবন সংগ্রামের ফসল। বলা যেতে পারে, জাতীয় চেতনার ধারা যেখানে আন্তর্জাতিক মেহনতি মানুষের আন্দোলনের সমুদ্রে মিশেছে, সেই সাগর সঙ্গমে গণসংগীতের উৎপত্তি। এর form বা আঙ্গিক ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু content বা ভাব একতাবদ্ধ।’

তেভাগার আন্দোলনে হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে যেমন পেয়েছি তেমিন বোম্বাইয়ের নৌবিদ্রোহ, তেলেঙ্গানা বিপ্লব, মালাবার লড়াই, কাকদ্বীপ লড়াই; এরকম গণসংগ্রামে আমরা হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে পাই গানের অস্ত্র হাতে। এইসব লড়াই হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু হেমাঙ্গরে গান বেঁচে আছে, কারণ হেমাঙ্গ মানুষের মৌলিক সমস্যাকে তুলে এনেছেন মানুষেরই সাধারণ ভাষায়। 

দেশর প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে হেমাঙ্গ বিশ্বাসে সাংগীতিক প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ১৯৮১ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর গানের দল ‘মাস সিঙ্গার্স’ নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন।

তেভাগা আন্দোলনের বিখ্যাত সেই গানটি র কথা যদি ভাবি। হেমাঙ্গ আমাদের কিষানভাইদের ডাক দিয়েছেন, যে কাস্তে দিয়ে সে ফসল কাটে সেই কাস্তেটারে জোরে শাণ দিতে বলেছেন। এই যে আহ্বান তা তো চিরায়ত। তাই হেমাঙ্গের এই গান এখনো প্রাসঙ্গিক মনে হয়:

কাস্তেটারে দিয়ো জোরে শান।
কিষান ভাই রে
কাস্তেটারে দিয়ো জোরে শান
ফল কাটার সময় হলে কাটবে সোনার ধান
দস্যু যদি লুটতে আসে কাটবে তাহার জান রে।
শান দিয়ো জোরসে দিয়ো দিয়ো বারে বার
হুঁশিয়ার ভাই কভু তাহার যায় না যেন ধার রে –

‘নাম তার ছিল জন হেনরী’ তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান। এখনো বাংলাদেশ পকির আলমগীর ও অন্য শিল্পলা এই গান করে থাকেন, এর উপযোগিতা আছে বলেই। দীর্ঘ ‘মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য’ পালাগানের আঙ্গিকে রচিত। তৎকালীন বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে ব্যঙ্গ করে তিনি লেখেন:

মাউন্টব্যাটেন সাহেব
ও তোমার সাধের ব্যাটন
কার হাতে থুইয়া গেলায় ও
... ... ...   ... নয়াদিল্লিতে মোর কলিতে
আইলা কল্কি অবতার–কী বাহার
পতিত ভারত করিতে উদ্ধার
বড় বড় নেতা দিলা পায়ে ধরনা
তপস্যায় লভিলেন বর অন্নপূর্ণা।

প্রবল রাজিনৈতিক বক্তব্য তিনি ব্যঙ্গসূরে প্রকাশ করেছেন। আঞ্চলিক সমস্যা নিয়েও তিনি রচনা করেছেন চমৎকার গান:

বাইন্যাচঙে প্রাণ বিদরায় ম্যালেরিয়া মহামারী
হাজার হাজার নরনারী মরছে অসহায়
শান্তি ভরা সুখের দেহ
শূন্য আজি নাই রে কেহ
মৃত সন্তান বুকে লইয়া কান্দে বাপমায়।

চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে নিজের এলাকা হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের মানুষ যখন ম্যালেরিয়ার মহামারিতে আক্রান্ত হন এবং প্রাণ হারাতে থাকেন, তখন রচিত হয় এই গান। জনগণের পাশে থাকার এই কে অভিনব উপায়; সুরে সুরে অসুর তাড়ানোর প্রক্রিয়া। হবিগঞ্জ ছেড়ে তিনি কলকাতায় চলে গেলেও দেশভাগের এই যন্ত্রণা তিনি উপলব্ধি করেছেন মর্মের্মে। তাই গেয়ে ওঠেন;

হবিগঞ্জের জালালী কইতর, সুনামগঞ্জের কুড়া
সুরমা নদীর গাংচিল আমি শূন্যে দিলাম উড়া
শূন্যে দিলাম উড়া রে ভাই যাইতে চান্দের চর
ডানা ভাইঙ্গা পড়লাম আমি কইলকাত্তার উপর,
তোমরা আমায় চিনোনি তোমরা আমায় চিনোনি।

এই গান মর্মবেদনার গান, আত্মজৈবনিক গান। হবিগঞ্জ থেকে উড়ে গেছেন কলকাতার মতো আধুনিক নগরে। সেখানে তিনি ডানা ভেঙে পড়ে গেছেন। আর ফিরতে পারছেন না দেশভাগের ৫ বছর পরে ১৯৫২ সালে চোখের জলে তিনি গেয়ে ওঠেন একই বেদনার নতুন গান:

‘পদ্মা কও, কও আমারে
(আইজ) মন-বাঁশুরী কাইন্দা মরে তোমার বালুচরে

পদ্মারে, তুমি আমার ভালোবাসা
তুমি আমার স্বপ্ন আশা
কে বলেরে কীর্ত্তিনাশা কূলভাঙ্গা তোরে
ও যে-জন ভাঙলো কূল ভাঙলো বাসারে
সর্বনাশা চিন্ নিলা তারে।।

পদ্মারে, পরান মাঝি হাইল ধরিত
হুসেন মাঝি গুণ টানিত
ভাটিয়ালী সুর নাচিত ঢেউ-এর নূপুরে
কত চান্দের বাতি জ্বলতো জলেরে
রাইতের নিঝুম আন্ধারে।।

পদ্মারে, কোন বিভেদের বালুচরে
তোর ময়ূরপঙ্খী ভাঙলো ওরে
কোন কালসাপে দংশিলা তোর
সুজন নাইয়ারে
আজ ভেলায় ভাসে বেহুলা বাংলারে
বধূর বিষের জ্বালা অন্তরে

১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে রক্ত দেখে তিনি গান নিয়ে এই আন্দোলনে সামিল হন।

শোনো দেশের ভাই-ভগিনী, 
শোনো আচানক কাহিনী
কান্দে বাংলা জননী ঢাকা শহরে।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস (১৯১২-১৯৮৭) আমাদের বাংলাদেশের মানুষ। হবিগঞ্জ জেলার মিরাশির গ্রামের হরকুমার বিশ্বাস ও মা সরোজিনী দেবীর ঘরে। ২০ বছর বয়সেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। ২৩ বছর বয়সেই কারাভোগের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ বিষাণ (গানের সংকলন, ১৯৪৩), চীন দেখে এলাম, সীমান্তপ্রহরী (কবিতার সংকলন, ১৯৬১), কুলখুরার চোতাল (অসমিয়া কাব্য, ১৯৭০), শঙ্খচিলের গান (গান স্বরলিপিসহ, ১৯৭৫), আবার চীন দেখে এলাম (১৯৭৫), আকৌ চীন চাই আহিলো (অসমিয়া, প্রথম খণ্ড ১৯৭৫, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৭৭), লোকসঙ্গীত সমীক্ষা (বাংলা ও অসমিয়া, ১৯৭৮), হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান (১৯৮০), চীন থেকে ফিরে, জীবনশিল্পী জ্যোতিপ্রকাশ (অসমিয়া, ১৯৮৩)। তার মৃত্যুর পর ছেলে মৈনাক বিশ্বাসের সম্পাদনায় বের হয় আরো দুটি গ্রন্থ: ‘উজান গাঙ বাইয়া’ ও ‘গানের বাহিরানা’।

দেশর প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে হেমাঙ্গ বিশ্বাসে সাংগীতিক প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ১৯৮১ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর গানের দল ‘মাস সিঙ্গার্স’ নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। ঢাকা, গাজীপুর-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি গান শুনিয়েছেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান এখনো প্রতিটি প্রতিবাদের আসরে মূলমন্ত্র হয়ে ধরা দেয়।

ইত্তেফাক/এনই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

মঈন ও তার বাইসাইকেল 

‘তোমরা নতুন লেখক তৈরি করো না বাপু’

অন্যের সিলেবাসে চলার দাসত্ব ও আত্মহত্যার দর্শন 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ফাদার দ্যতিয়েন যেভাবে হয়ে ওঠেন বাঙালির আত্মজন 

জীবন কি ‘পোকা’ হয়ে ওঠারই নাম? 

কবিতা

অভিভূতকর অপেক্ষা