সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস ও অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না। সরকারি ব্যাংকে ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু থাকলেও তার শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
এদিকে, সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ৫ ব্যাংক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গত ৬ নভেম্বরের পরীক্ষা বাতিল করারও চিন্তা করা হচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী রবিবার পর্যন্ত সময় নিয়েছে। তিনটি ব্যাংকে অন্য পদে নিয়োগের জন্য আগামী ১৩ ও ২০ নভেম্বরের অনুষ্ঠেয় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানানো হয়।
গত শনিবারের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ইতোমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছে কয়েকজন এবং এ ধরনের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে ব্যাংকার ছাড়াও আউটসোর্সিংয়ের লোকেরাও জড়িত রয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখার জন্য তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া বা আউটসোর্সিং করা হয়ে থাকে। কিন্তু আউটসোর্সিংয়ের কতিপয় ব্যক্তি, ব্যাংকের কোন কোন কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রশ্নপত্র আগেই ফাঁস করে দেয়।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই বাণিজ্য চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। সাধারণত, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ, বাংলাদেশ ইসস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর মাধ্যমে ব্যাংক ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়ে থাকে। এসব পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কতিপয় ব্যক্তি প্রশ্ন ফাঁস, খাতায় পাস নম্বর দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করার চুক্তি করে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলেছে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যাদের বিশ্বাস করা হয়েছে তাদের মধ্য থেকেই অবিশ্বাসের কাজটি হচ্ছে। অথচ আউটসোর্সিংয়ের পেছনেও প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এরপরও যখন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তখন আউটসোসিংয়ের বিষয় নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
গত শনিবারের পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছে। এই পরীক্ষা বাতিলের প্রস্তাবও এসেছে। বাতিলের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী রবিবার সিদ্ধান্ত জানাবে। তবে পরীক্ষা বাতিল হলেও পরবর্তী পরীক্ষার সময়, প্রার্থীদের বয়সসীমা নানা বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। কারণ, সরকারি ৫ ব্যাংকের ১ হাজার ৫১১টি পদে নিয়োগের এই পরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন না করলে শূন্য পদ পূরণেও বিলম্ব হবে।
৫ ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংকে ১৮৩টি, জনতা ব্যাংকে ৫১৬টি, অগ্রণী ব্যাংকে ৫০০টি, রূপালী ব্যাংকে ৫টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ৭টি পদ রয়েছে। এসব পদের বিপরীতে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ১৬ হাজার ৪২৭ জন।
এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও পুরো প্রক্রিয়া সম্পাদনের দায়িত্বে ছিল আহছান উল্যাহ ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি।
পরীক্ষা জালিয়াতির ঘটনায় আহছানউল্ল্যা ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন, কী কারণে এমনটি ঘটলো সে বিষয়ে জানতে চেয়েছে। একইসঙ্গে পরবর্তী দুই শনিবারে অনুষ্ঠেয় তিন ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার (আইটি) এবং অ্যাসিসটেন্ট ডাটাবেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
পরীক্ষা সময়সূচি পরে গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হুমায়ুন কবির সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, আহছানউল্ল্যার মাধ্যমে আর কোন নিয়োগ পরীক্ষা হচ্ছে না।
কর্মকর্তা গ্রেফতার-বরখাস্ত
নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত থাকার দায়ে গত বুধবার পর্যন্ত গোয়েন্দা বিভাগের অভিযানে ৫জনকে গ্রেফতার করা হয়। এরা হলেন-জনতা ব্যাংকের গুলশান শাখার কর্মকর্তা শামসুল হক শ্যামল, রূপালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার জানে আলম মিলন, পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান মিলন, নিয়োগ প্রার্থী স্বপন, আহছানউল্ল্যা বিশ্ববিদ্যায়ের আইসিটি টেকনিশিয়ান মোক্তারুজ্জামান।
ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে জনতা, রূপালী ও পূবালী ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের বরখাস্ত করেছে। আহছানউল্ল্যা ইউনিভার্সিটিও তার তিন কর্মীকে বরখাস্ত করেছে। এরা হচ্ছেন-মোক্তারুজ্জামান, পারভেজ মিয়া ও দেলোয়ার হোসেন।

