শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২, ৭ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

সহজিয়া

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২১, ২১:৩৬

নদীর এক কূলে খেয়ার জন্য বসে আছি। বছর দশেক আগে এ খেয়াঘাট তৈরি হয়েছে। ও কূলেও অপেক্ষা করছে কেউ কেউ। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে হাঁসফাঁস করছে প্রকৃতি। এ তপ্ত দুপুরে মাঝির দেখা না-পাওয়া কিছুটা অস্বস্তির। কিছুক্ষণ পর চোখের দৃষ্টিতে ধরা পড়ল মধ্যবয়সি এক মানুষ নদীর কিনারের পানিতে ডুব দিচ্ছে। বার কয়েক তাকালাম। এ মরা নদীতে কেউ কখনো এভাবে এমন পোশাকে, এমন কাজ করেছে, তা আমার অদেখা। কূলে বসে মাঝখানে গজিয়ে ওঠা নতুন চর দেখছি। এখানেই এককালে নদীর তীব্র জোয়ার বয়ে যেত। আজ সবকিছুই মৃতপ্রায়। নতুন কেবল হরেক রকম গাছের সারি, বন।

নৌকা পার হয়ে এ কূলে আসার পর মানুষটি অদৃশ্য। চারদিকে তাকালাম। কোথাও ছায়াও খুঁজে পেলাম না। লোকটি কেনইবা নদীতে ডুব দিল, তা অস্পষ্ট। খেয়াঘাটের মাঝিও কিছুটা বায়ুবীয় কায়দায় এর ব্যাখ্যা দিলেন। কাজীরহাট স্লুইসগেট পার হতে হতে মনের মাঝে অনেক কথা উদয় হলো। সেটা ভৌতিক, তাত্ত্বিক কিংবা লৌকিকও।

জেলেপাড়া পার হতেই গেরুয়া কাপড়ে আপদমস্তক আবৃত এক লোক আমার সামনে আবির্ভূত হলো। লোকটির পোশাক, চুল আর গোঁফ প্রমাণ করে, এ ইহধামে তার সঙ্গে কোনোদিন কোনো নরসুন্দরের সাক্ষাত্ হয়নি। আমাকে অকস্মাত্ প্রশ্ন করলেন—‘মানুষ দেখতে বের হয়েছেন? এ আজব চিড়িয়াখানায় মানুষ পাবেন?’

বললাম, ‘আপনার কাছে আমি এক অচেনা মানুষ। এমন প্রশ্ন আমার কাছে কিছুটা উদ্ভট বটে। আত্মীয় সম্পর্কিত এক লোকের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তাছাড়া আমার বাড়ি এই নদী পার হয়ে তিন ক্রোশ হাঁটাপথ।’

তিনি কোনো কিছু না বলে ‘আমার মনের মানুষ কে রে’ গাইতে গাইতে বাঁ পাশের রানিখালের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছেন।

আমি অবাক হয়ে ভাবছি—কে এ ব্যক্তি? তাকে কোনোদিন এ তল্লাটে দেখেছি বলে মনে হলো না। তারপর আবার গেরুয়া পোশাক আবৃত। ছোটবেলায় একবার আবু মাঝির ঘাট পেরিয়ে, তিন ক্রোশ হেঁটে নলদিয়ার মেলায় এরকম লোকের দেখা পেয়েছি। কালের বক্ররেখায় সেসব আজ বিস্মৃতির অংশ।

আমি উত্তর চর পেরিয়ে, বাইরের চর ধরে হাঁটছি। চরের মাঝখানে অতিকায় এক বটবৃক্ষ। এককালে এখানে মেলা বসত। মাঘের প্রথম সপ্তাহে নানা জায়গা থেকে লোক সমাগম হতো। সেটা আধা শতাব্দী আগের কথা। এ চর তার অনেক রূপ পালটিয়েছে। চরের মাঝে এখন শত শত বসতবাড়ি। টিকে আছে বটের চর নামটি আর সাক্ষী গোপাল এ শতায়ু বটবৃক্ষটি।

বটের ছায়ায় এক লোক উদাসী হয়ে বসে আছেন। লোকটির সঙ্গে আগেকার লোকের মিল আছে বৈকি।

‘সাধু, আপনার আপন আলয় কোথায়?’

পথ দেখিয়ে বললেন, ‘এ চলমান রাস্তাই আমার ঠিকানা, ঘরও নেই, সংসারও নেই।’ তারপর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

বিড়বিড় করে বলছেন, ‘তিথির বাহুডোরে আবদ্ধ হয়েছি ক্ষণকালে কিছুটা পার্থিব আশায়। আট বছর পার করলাম। একদিন তার মনোবাসনা হলো, হরিণাকুণ্ডের এক ভূস্বামীর সাথে চাঁদের হাটের মেলায় জ্যোত্স্না উপভোগের। সেই যে বেচাকেনার মেলায় গেল, আর ফিরে এলো না। ঐ ভূস্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে পুরুষ হওয়ার  বাসনাও আমার আর হলো না। চিরতরে বিদায় দিলাম তিথির রচিত সুখ যাপন কবিতাকে। বেছে নিলাম এই পোশাক, ঝোলা আর অদেখা স্রষ্টাকে। বাউলের ইশারা, ভঙ্গি, বাতাসের ভাব বোঝা, বাউলের আউলা জীবন সবই আমাকে টেনে নিল। পরম ঈশ্বরের সন্ধানে একদিন বেরিয়ে পড়লাম। আজো সেই পথের পথিক হয়ে আছি।’

আমার বিরক্তি উদ্রেক হচ্ছে। অস্তগামী সূর্যের আগেই বাড়ি পৌঁছা প্রয়োজন। ছোটবেলায় দাসপাড়ায় এক অনাত্মীয় স্বর্গীয় আইছারাম দাসকে বৈরাগী হতে দেখেছি। তাকে নিয়ে আমার মনোজগতে গবেষণার অন্ত ছিল না। আজ এ ক্ষণে এমন মানুষ আমাকে নানা বায়ুবীয় কথা বলে কেবল বিরক্তির উদ্রেকই করছে না, চিন্তার পরিধিও বাড়াচ্ছে।

বছর কুড়ি আগে একবার আসামের গোহাটি থেকে আট কিলোমিটার দূরে কামরূপ-কামাক্ষায় গিয়েছিলাম। এক সাধু বন্ধ অক্ষিতে বলেছিল ‘এ ইহধাম কেবলই বালুচরের খেলা।’ মাঝে মাঝে চোখ খোলেন আর এরকম আপ্তবাক্য আউড়িয়ে চোখ বন্ধ করেন। সেবার মন্দির এলাকায় অনেক সাধুর দেখা হয়েছিল। প্রচলিত ছিল, এ মন্দির থেকে কোনো পুরুষ কখনো ফিরে যেতে পারে না। এ ক্ষণে হাজারো রহস্যঘেরা কামাখ্যা দেবীকে আমার সহজ বিদ্যায় বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। তারপরও এ গৃহহীন, সংসার-ধর্মহীন মানুষগুলো আমার স্বল্পবিদ্যার পুঁজিকে কিছুটা স্ফীত করেছিল। আজ নিজ বাসভূমে এমন দৃশ্য আমাকে আহারীপাড়ার বিহারীনাথ পণ্ডিতের মতো শিষ্যত্বভাব এনে দিয়েছে।

‘আচ্ছা, আপনার বংশ পরিচয় কি জানা যাবে?’

বললেন, ‘দক্ষিণে দরিয়া পাড়ে এক মিত্তির বংশে আমার জন্ম। শুনেছি, আশির দশকের কোনো এক প্রবল জলোচ্ছ্বাস কেড়ে নিয়েছে আমাদের ঘরবাড়ি ও পরিজনদের। সাবালক হওয়ার পূর্বে নিজকে খুঁজে পেয়েছি চর নারায়ণের এক বাড়িতে। তারা আমার আত্মীয় না অনাত্মীয়, তা জানার পূর্বে গৃহস্বামী প্রয়াত হলেন। সত্ ভাইদের ভূসম্পত্তির লোভে একদিন ঐ ঘরও ছাড়তে হলো। এখনো বেঁচে আছি। এই তো মহান স্রষ্টার কৃপায়।’

‘বংশ-পরিচয় বুঝলাম, আপনার এমন বেশভূষা ধারণ করার কারণ কী?’

‘মাতৃগৃহে পিতামাতার খোঁজ পেলাম না, সংসার বলতে কী বোঝায়, তার বোধও হলো না। মহান স্রষ্টার রহস্য সন্ধান, তাও এক কঠিন কর্ম—সেই পথে ফলাফলও শূন্য।’

‘আপনি এ বেশ ধারণ করে আবার কী সন্ধান করবেন?’

‘না, সেই কথা আজ আর নয়।’ এ কথা বলে তিনি চললেন দক্ষিণে দরিয়ার কূলে।

আমি সন্ধ্যার গন্ধ বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরছি। এমন সময় কলিম মাঝি দূর থেকে ডাক দিলেন। আকাশ থমথমে। তুফান আসছে। নাও কূলে ভিড়াও। দূর থেকে ভেসে আসছে, এ তো মহাজনের নাও, আমরা সবাই তো যাত্রী। মহাজনের হুকুমেই তো নাও ভাসে, ডোবে।

চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। আমি ত্রস্তপদে বাসগৃহে ঢুকছি। স্বস্তির নিশ্বাস নিয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। কেমন যেন সাগরের গর্জন কিংবা প্রলয় নিনাদ শুনছি। ক্রমেই চোখে ভাসছে গেরুয়া কাপড় পরিহিত মানুষটিকে।

এ জীবনের হিসাব অনেকটা সরল, সহজ। বক্র কেবল আমাদের দৃষ্টিপথ।

ইত্তেফাক/ইউবি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রাজনীতির মহাকবির বয়ান

‘তুমি তো লয়ের পুতুল!’ 

অস্তাচলে বাংলা থ্রিলারের নবাবি সূর্য 

অভিনয় 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

মঈন ও তার বাইসাইকেল 

‘তোমরা নতুন লেখক তৈরি করো না বাপু’

অন্যের সিলেবাসে চলার দাসত্ব ও আত্মহত্যার দর্শন