বর্তমানে ইউরোপ একইসঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। এই নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যেমন, তেমনি এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে একটি যৌথ সামরিক বাহিনী গড়ার উদ্দেশ্যে আলোচনা করেছে ইইউ-ভুক্ত দেশগুলো।
১৯৫৩ সালে ইইউ জোট গঠনের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্কের শুরু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ইউরোপের ১০টি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা; এই ১২ দেশ মিলে আন্তঃসরকার সামরিক সহযোগিতা জোট দ্য নর্থ আটল্যান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) গঠন করে। ন্যাটোর মূল উদ্দেশ্য ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকানো। সেই থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসে দপ্তর খোলে।
১৯৯০ সালে আটলান্টিকের উভয় পাশের দুই অংশীদারের মধ্যে একটি ট্রান্সআটলান্টিক ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এরপর থেকে ইইউ কমিশন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলনে একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আলোচনায় বসতেন। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ইউরোপ থেকে তৈরি গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম নেওয়ার ওপর শুল্ক চাপানো, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি বাতিল, জেরুজালেমে মার্কিনদের দূতাবাস স্থানান্তর এবং জলবায়ু ও পরিবেশসংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়া, ন্যাটো সামরিক জোটে পর্যাপ্ত অর্থ দেওয়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ইউরোপীয় পুরোনো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন চলে বেশ কয়েক বছর ধরেই। যে কারণে সামরিক জোট গড়তে চায় ইইউ।
২০২৫ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার সদস্যের এই বাহিনী গড়তে চায় ইইউ। ‘ইইউ ব়্যাপিড ডিপ্লয়মেন্ট ক্যাপাসিটি’ নামের এই বাহিনীতে ইইউর ২৭ সদস্য রাষ্ট্রের সবার অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক থাকবে না। তবে এই বাহিনী মোতায়েন করতে ঐকমত্যের প্রয়োজন হবে। ইইউ নেতারা দুই দশক আগে ৫০-৬০ হাজার সদস্যের একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করতে একমত হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সম্প্রতি তৈরি খসড়ায় বলা হয়েছে, সামরিক সংকট ব্যবস্থাপনার কাজ করতে তাদের আরও ক্ষিপ্রতা, শক্তিসামর্থ্য ও নমনীয়তা প্রয়োজন। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি লজ্জাজনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেক বিশ্ব নেতা। শেষদিকে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে বিশৃঙ্খলাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের এমন ব্যার্থতায় নিশ্চুপ ছিল ইইউ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারাও এগিয়ে আসতে পারেনি। মার্কিন সেনাদের ওপর একরম বিশ্বাস এবং আস্থা হারিয়েই নিজস্ব বাহিনী তথা সামরিক জোট গড়তে চায় ইইউ।
আফগানিস্তানের মতো বিপর্যয় মোকাবিলায় ‘ইইউ ব়্যাপিড ডিপ্লয়মেন্ট ক্যাপাসিটি’ নামের এই বাহিনী গড়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে জোটে। এটা এমন একটা বাহিনী
হবে, যাদের কাবুল সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি যেকোনো সংকটকালীন মুহূর্তে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে মোতায়েন করা যাবে। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াকে ‘বিপর্যয় ও দুঃস্বপ্ন’ বলছেন ইইউর নেতারা। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই উদ্ধার অভিযানে ইইউকে কোনো ভূমিকাই রাখতে
দেওয়া হয়নি। নিজস্ব কোনো বাহিনী না থাকায় শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া তেমন কিছুই করতে পারছে না তারা। ফলে চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকটে জরুরি পদক্ষেপ নিতে নিজস্ব যৌথ সামরিক সক্ষমতা তৈরির প্রয়োজনীয় উপলব্ধি করছে জোটটি।
ইইউ-এর পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেল সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে, আফগানিস্তান বিপর্যয়ের পর ইউরোপের নিজস্ব একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।’ আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক কতটা সহজভাবে একে অন্যের অংশীদার হতে পারবে বা ন্যাটো জোট নিয়ে কতটা কাজ করতে পারবে, তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের সদিচ্ছার ওপর।

বাইডেন-জিনপিং বৈঠক থেকে যে বার্তা পেলো বিশ্ববাসী
যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াই যৌথ সামরিক বাহিনী গড়তে চায় ইইউ