স্মরণ

‘বিলাতফেরত হেড মাস্টার’

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০৫:১৯

“মরহুম শামসুল হক ছিলেন সমীহ জাগানিয়া এক অনন্য প্রধান শিক্ষক। তার ক্ষুরধার ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্ব ও সততা ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকদের তটস্থ রাখত। তার সুশিক্ষা ও ব্যক্তিত্বের ছাপ শুধু ছাত্রদের মানসপটেই নয়, সমাজের মানসপটেও পরিস্ফুটন ঘটেছিল। তিনি ছিলেন সবার শ্রদ্ধেয় ‘হেড মাস্টার স্যার’।”

ওপরের কথাগুলো মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি হাইস্কুলের প্রকাশিত সাময়িকী থেকে উদ্ধৃত। হ্যাঁ, তিনি ছিলেন এক অসাধারণ কিংবদন্তিতুল্য প্রধান শিক্ষক। যার তুলনা কেবল তিনি নিজেই। স্থান, কাল, পেশা ও পাত্রনির্বিশেষে তিনি সব মানুষের কাছে ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র, যার কথা এখনো গল্পের মতো প্রবীণদের মুখে মুখে।

১৯৩১ সালে দেশের পিছিয়ে থাকা প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়ানোর উদ্দেশ্যে তত্কালীন ধনাঢ্য শিক্ষানুরাগী (সাবেক মন্ত্রী মরহুম আব্দুল মমিনের পিতা) মরহুম আব্দুল আজিজ খান সাহেব স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলার পানিবেষ্টিত হাওর অঞ্চলের এটিই ছিল ঐ সময়ের একমাত্র বিদ্যাপিঠ। মোহনগঞ্জ, বারহাট্টা, মদন, খালিয়াজুরী, কেন্দুয়া, ধর্মপাশা, শাল্লাহ, দিরাই ও জগন্নাথপুর উপজেলার লাখ লাখ মানুষের শুকনায় হাঁটা ও বর্ষায় নৌকার বাহনে শহরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম রেল যোগাযোগের মূল কেন্দ্র মোহনগঞ্জ হয়ে উঠেছিল একমাত্র ব্যাবসায়িক হাব ও হাট।

প্রতিষ্ঠিত প্রভাবশালী শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের প্রচেষ্টাই ছিল ভালো ভালো শিক্ষকের সমন্বয় করে স্কুলটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠার প্রায় ২২ বছর পর ১৯৫৩ সালে তারা এই জ্ঞান তাপস মেধাবী শিক্ষাবিদ মরহুম শামসুল হককে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেন। তিনি তার মেধা, দেশপ্রেম, শিক্ষাদানের তীব্র বাসনা ও ভালোবাসায় গরিব অসহায়, অনগ্রসর জনপদের সন্তানদের শিক্ষিত ও কর্মক্ষম করে গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে পথ চলেছেন আজীবন। তার সুযোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সৃষ্টি করেছিলেন একটি সত্ ও দক্ষ শিক্ষকমণ্ডলী।

তিনি শুধু প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব, শিক্ষাদান ও স্কুল পরিচালনাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। হোস্টেলে ছাত্রদের থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনারও খোঁজখবর রাখতেন। হোস্টেলে পর্যাপ্ত সিট না থাকায় সচ্ছল পরিবারের ছাত্রদের লজিং বন্দোবস্তও নিজে তদারক করতেন। অভিভাবকদের ডেকে সন্তানদের পড়াশোনার অগ্রগতি ও আচরণ অবগত করতেন। অনেক অভিভাবকই নিজেদের অভাব, অভিযোগসহ অনেক বিষয়ে সাহায্যের জন্য তার কাছে ছুটে আসতেন। এমনি এক বিরল মানবিকতার সুমহান আত্মিক বন্ধন তার সঙ্গে অভিভাবকদের গড়ে উঠেছিল।

তিনি ছিলেন এলাকার সব শ্রেণি-পেশার মানুষজনের শিক্ষক। প্রবীণেরা নাম দিয়েছিলেন ‘Bearded Tiger', কেউ ডাকতেন ‘বিলাতফেরত হেড মাস্টার’। মাধ্যমিক শিক্ষার পাইলট স্কিমের বৃত্তিতে ১৯৬৩ সালে সারা পাকিস্তান থেকে তিনিসহ সাত জন আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছিলেন।


মরহুম শামছুল হক ১৯১৮ সালে নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টার রানীগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম শমশের উদ্দীন তালুকদার ও মাতা হাসনা বানু পাঠানের আট সন্তানের সবার বড় তিনি। তিনি ১৯৩৬ সালে নেত্রকোনা দত্ত স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক, ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক ও ১৯৪২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার্থে কলকাতায় গিয়ে খাদ্যনিয়ন্ত্রকের চাকরি নেন। পরে এই লাভজনক চাকরি ছেড়ে করাচি গিয়ে সেখানকার মুসলিম বয়েজ হাইস্কুল ও টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি নিজ জেলার শ্যামগঞ্জ হাইস্কুল ও আঞ্জুমান স্কুলেও শিক্ষকতা করেন।

উল্লেখ্য, ১৯৫৩ সালে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে স্কুলটিকে নিজ সন্তানের মতো করে গড়ে তুলেন তিনি এবং দায়িত্বরত অবস্থায়ই ১৯৭৭ সালের ১৩ নভেম্বর স্ত্রী, কন্যা ও ১০ পুত্র রেখে মৃত্যুবরণ করেন।

 ছাত্রাবস্থায় রাজনীতিতে যুক্ত থাকায় ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তাকে নেত্রকোনা বারহাট্টা থেকে প্রার্থী হতে সুপারিশ করা হলেও তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে যাননি। স্কুলটিকে এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র করতে তিনি নিজে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলে ১৯৭৫ সালেই পরীক্ষাকেন্দ্রের অনুমোদন লাভ করে। মোহনগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ, বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু মরহুম আব্দুল ওয়াহেদ ডিইও সাহেব কর্তৃক শ্যামপুর হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায়ও তার যথেষ্ট অবদান ছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি। প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেন। আন্দোলনকারী ছাত্রদের সার্বিক নিরাপত্তা দিতেন। মুক্তিযুদ্ধকালে স্কুলে তার অমতে পাকসেনারা ঘাঁটি করেছিল। যুদ্ধ শুরুর আগেই গোপন খবরের ভিত্তিতে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। নয়তো সেদিন তাকে হত্যা করা হতো।

১৯৮১ সালে স্কুলটি সরকারিকরণ করা হলে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্কুলের মিলনায়তনের নামকরণ করা হয় শামছুল হক মিলনায়তন।

লেখক: সাবেক ছাত্র, আমেরিকা প্রবাসী। মার্কিন ফেডারেল সরকারের কর্মকর্তা।

ইত্তেফাক/বিএএফ