বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

পবিত্র কোরআনের ইংরেজি অনুবাদ করেন যিনি

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০৩

আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলী (১৮৭২-১৯৫৩) একজন ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তা (আইসিএস), লেখক, গবেষক, সুবক্তা, সমাজকর্মী, সর্বোপরি ইসলামি চিন্তাবিদ ছিলেন। তবে এ সবকিছুকে ছাড়িয়ে গিয়েছে পবিত্র কোরআনের ইংরেজি অনুবাদক এবং টীকাকার হিসেবে। তিনি কোরআনের একজন হাফেজ ছিলেন এবং আরবি ভাষা ও ইসলামি জ্ঞানে একজন সুপণ্ডিত।

মূল আরবি থেকে ইংরেজি ভাষায় কোরআনের একজন স্বীকৃত ও ইংরেজি ভাষাভাষীদের নিকট গৃহীত অনুবাদক, লন্ডন ও কানাডার একাধিক মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা, সমাজকর্মী, লন্ডনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে বিএলএল এবং এলএলএম ডিগ্রিপ্রাপ্ত মেধাবী ছাত্র এবং ব্রিটিশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব কমান্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার- সিবিই-প্রাপ্ত অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তার দাম্পত্য জীবন কেটেছে দুই ব্রিটিশ মহিলার সঙ্গে। তাদের পাঁচ সন্তান (চার ছেলে ও এক মেয়ে) সবাই ব্রিটেনে বসবাসরত ও প্রতিষ্ঠিত। তিনি মারা যান ১৯৫৩ সালের ১০ ডিসেম্বর লন্ডনে।

উল্লেখ্য, ইউসুফ আলীর অনুবাদ সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বে প্রখ্যাত ইসলামি বিশেষজ্ঞগণ কর্তৃক স্বীকৃত ও অনুমোদিত। ইউসুফ আলী তার অনুবাদে প্রায় ৬ হাজার টীকা উল্লেখ করেছেন, যা অনেক বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থেও পাওয়া যায় না। প্রখ্যাত অনলাইন পুস্তক বিক্রেতা আমাজন.কম পরিচালিত গ্লোবাল কাস্টমার রিভিউজের এক মূল্যায়নে দেখা যায়, ইউসুফ আলীর অনুবাদ ৫ তারকার মধ্যে ৪.২ স্টার স্কোর অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। খুব অল্পসংখ্যক অনুবাদ গ্রন্থ অনুরূপ স্কোর অর্জন করতে পেরেছে। ১৯৩৪ সালে প্রথম প্রকাশের পর এর ৩০টি সংস্করণ বেরিয়েছে। এ ছাড়া পুনর্মুদ্রণ বেরিয়েছে অনেক বার।

আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলী।

ইউসুফ আলী মূল আরবি থেকে কোরআন ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ছোটোবেলায়ই তিনি সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করে হাফেজ হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আরবি ভাষার ওপর ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। আইসিএসের একজন সদস্য হিসেবে ইংরেজি ভাষায় তার দখল প্রশ্নাতীত। তার জীবনীকার (খিজির হুমায়ুন খান ও এম এ শেরিফ)-সহ অনেকেই বলেন, ইউসুফ আলী ইংরেজির মতোই আরবি বুঝতে ও বলতে পারতেন। বাহ্যিকভাবে একজন ব্রিটিশের মতো জীবনযাপন করলেও নেপথ্যে সারা জীবন কোরআনের প্রচার ও প্রসারে কাজ করেছেন। সারা বিশ্বে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে ইংরেজি ভাষায় কোরআন পাঠকদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলী এবং মুহম্মদ মার্মাডিউক পিকথলের অনুবাদই বেশি জনপ্রিয়।

ইউসুফ আলীর জন্ম ভারতের বোম্বে শহরে ১৮৭২ সালের ১৪ এপ্রিল। তার পিতা ইউসুফ আলী আল্লাবক্স ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করতেন। তিনি একজন সমাজসেবকও ছিলেন। চাকরি ও সমাজসেবায় অসাধারণ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসাবে ব্রিটিশ সরকার তাকে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেন।

পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে আব্দুল্লাহর শিক্ষাজীবন শুরু হয় মক্তবে ধর্মশিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে। ভর্তি হন আঞ্জুমানে হেদায়েতুল ইসলাম স্কুলে। এখানে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের সময় তিনি পুরো কোরআন মুখস্থ করে ফেলেন। অনেকে তার নামে সঙ্গে হাফেজ যোগ করে হাফেজ আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলীও লিখে থাকেন।

অনুবাদসহ ইসলাম বিষয়ক আরও কয়েকটি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। গ্রন্থগুলোর রিসার্চ এবং রেফারেন্স ভ্যালু অসাধারণ। এনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলাম এ আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলী শীর্ষক অধ্যায়ে তার নিম্নোক্ত গ্রন্থগুলোর উল্লেখ রয়েছে: 1. The Indian Mohamedans (1907), 2. Mestrovic and Serbian Sculptor (1916), 3. Muslim educational ideals (1923), 4. Islam as a world force (1926), 5. India and Europe (1926), 6. Personality of Muhammad the prophet (1929), 7. Fundamentals of Islam (1929), 8. Moral education: Aims and methods (1930), 9. Personality of man in Islam (1931), 10. Medieval India (1932), 11. Religion and social equality (1936), 12. Islamic history, its scope and content (1939), 13. The message of Islam (1940), 14. The Holy Quran: Text, translation and commentary (1934).

এছাড়াও তার অসংখ্য প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখ্য, তিনি ব্রিটিশ রয়েল সোসাইটি অব আর্ট এবং ব্রিটিশ রয়েল সোসাইটি অব লিটারেচারের সম্মানিত ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন। এগুলোর প্রসিডিংসেও তার অনেক লেখা ও বক্তৃতা ছাপা হয়েছে। তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্সি অব বোম্বে স্কলারশিপ লাভ করেন। সে সময় ভারত উপমহাদেশে প্রতি বছর ব্রিটিশ সরকার ৯ জন ছাত্রকে ব্রিটেনে অধ্যয়নের জন্য এই বৃত্তি প্রদান করতেন। ঐ বৎসরই (১৮৯১) আইন পড়ার জন্য তিনি বিলাত গমন করেন এবং ক্যামব্রিজের সেন্ট জনস কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৮৯৫ সালে বিএ ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯০১ সালে আব্দুল্লাহ এমএ এবং এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৮৯৫ সালে ক্যামব্রিজে অবস্থানকালীন সময়ে আব্দুল্লাহ ভারতের আইএএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং উত্তীর্ণ হন। ঐ বছরই তিনি ভারতে এসে আইসিএসের সদস্য হিসেবে উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর হিসাবে যোগদান করেন। চাকরিরত অবস্থায়ই তিনি ১৮৯৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের অনুমতিক্রমে লিংকনস ইন বার অ্যাসোসিয়েশনে যোগদান করেন। তার দ্বিতীয় পোস্টিং ছিল ব্রেইলি জেলায় ডেপুটি কমিশনার, এরপর ফতেহপুরে ডিসি ও কালেক্টর এবং পদত্যাগের পূর্বে তিনি ব্রিটিশ সরকারের আন্ডার সেক্রেটারি ও ডেপুটি সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চাকরি থেকে ইস্তফার পর তিনি ক্যামব্রিজের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ল্যাংগুয়েজে হিন্দুস্থানি ভাষার লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। আল্লামা ইকবাল প্রতিষ্ঠিত লাহোর ইসলামিয়া কলেজে কবি ইকবালের অনুরোধে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (১৯২৫-২৭ ও ১৯৩৫-৩৭)। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দুই-দুই বার দায়িত্ব পালন করেন (১৯২৫-১৯২৮ ও ১৯৩৫-১৯৩৯)। এর আগে ১৯২৮ সালে আব্দুল্লাহ জাতিপুঞ্জে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও বিপিএটিসির সাবেক পরিচালক। 

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ধর্মের সীমায় আনন্দ-বিনোদন

লোক দেখানো আমল আর নয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

 ইসলামে দান-সদকার তাত্পর্য

গুরুত্বপূর্ণ আমল মোনাজাত