কিছুদিন আগেও সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে প্রায় পাঁচ শতাধিক জলদস্যুর রাজত্ব ছিল। ত্রিশেরও অধিক জলদস্যু বাহিনীর তাণ্ডবে তটস্থ থাকতো উপকূলবাসী। এখন সেই দিন বদলেছে। সুন্দরবনকে জলদস্যু মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ৩১ মে থেকে এ পর্যন্ত সুন্দরবনের মোট ৩২টি বাহিনীর দস্যু সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেছে। আর এ আত্মসমর্পণের নেপথ্যে সরকার ও জলদস্যুদের মাঝে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করেছেন সাহসী সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিম।
২০০৯ সালের কথা। একটি বেসরকারী টেলিভিশনের হয়ে ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রতিবেদন করতে সুন্দরবনের নিকটবর্তী বাগেরহাটের গাবুরায় যান মোহসীন। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন সুন্দরবনের জলদস্যুদের দৌরাত্ম্যের কথা। কথায় কথায় স্থানীয় এক ভুক্তভোগী তাঁকে বলেন, ‘আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব। কিন্তু দস্যুদের তো ঠেকাতে পারব না। আমাদের বাঁচান। পারলে দস্যুদের ঠেকাতে কিছু করুন।’ কথাটি নাড়া দিল মোহাসীনের হৃদয়ে। ভাবলেন পেশাদারিত্বের বাইরে গিয়েও দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে কিছু দায়-দায়িত্ব আছে, এ দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সেই থেকে শুরু সুন্দরবনকে মোহসীনের দস্যু মুক্ত করার যুদ্ধ।
এরপর গত ১২ বছর ধরে তিনি কয়েক শ' বার গেছেন সুন্দরবনে। ঘুরে রেড়িয়েছেন জলদস্যুদের সঙ্গে। তাদের আস্তানায়, তাদের ডেরায় কাটিয়েছেন দিনের পর দিন। তাদের নৌকায় ছুটে বেড়িয়েছে সুন্দরবনের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কয়েকবার কোস্টগার্ডের গুলির মুখেও পড়েছেন। তবে তিনি কখনোই ভুলে যাননি নিজের পেশাদারিত্ব। ভুলে যাননি যে তিনি একজন সাংবাদিক। আর সবসময় তাঁর মাথায় কাজ করেছে গাবুরার মানুষের করুণ আবেদন, ‘ভাই আমাদের জলদস্যুদের হাত থেকে বাঁচান।’
মোহসীন তাদের নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন শুরু করলেন, তুলে ধরলেন তাদের অত্যাচার ও নিপীড়নের কাহিনী; সাথে সাধারণ মানুষের কান্না আর আহাজারি। একের পর এক এসব প্রতিবেদন প্রচারের পর সুন্দরবন এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে যেমন পরিচিত হয়ে ওঠেন মোহসীন, তেমনি জলদস্যুরাও তাকে চিনে ফেলে। তিনি বনদস্যুদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ শুরু করেন। তাদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলেন তারাও হিংস্রতা ছেড়ে ফিরতে চায় স্বাভাবিক জীবনে। কিন্তু পরবর্তী জীবনের অনিশ্চয়তা ও উপযুক্ত সুযোগের অভাবে এ পথে পা বাড়াতে পারছে না তারা। মোহসীনের সদাহাস্য উজ্জ্বল চেহারা আর সাবলীল কথাবার্তা জলদস্যুদের মনে দারুণ আস্থা জুগিয়েছে। আর এই আস্থাই পরবর্তী পথটুকু সহজ করে দিয়েছে।
তবে পুরো যাত্রাটা এতোটা সহজ ছিল না। স্থানীয় কিছু সিণ্ডিকেট নিজেদের স্বার্থের জন্য কখনোই চায়নি সুন্দরবন দস্যু মুক্ত হোক। তারা বিভিন্ন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে মোহসীনকে। কিন্তু নিজ লক্ষ্য থেকে একবিন্দুও টলেননি মোহসীন। আবার আত্মসমর্পণের বিষয়টিকে সরকারের কাছে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতেও বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে।
ইত্তেফাককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহসীন বলেন, ‘আমি সুন্দরবনকে ইতিবাচক ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করি। একটা সময়ে এসে বুঝেছি শুধু দূর থেকে সংবাদের মাধ্যমে সুন্দরবনের বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই পেশাদারিত্বকে ছাপিয়ে দিনের পর দিন সুন্দরবনে গিয়ে থেকেছি। তাদের সাথে মিশেছি। সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করেছি।’
মোহসীনের ছেলেবেলা কেটেছে নওগাঁতে। প্রাথমিকের হাতেখড়ি নওগাঁ কেডি স্কুল থেকে। এরপর রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাংবাদিকতা করছেন। সম্প্রতি মোহসীন তার দীর্ঘদীনের সুন্দরবনের অভিজ্ঞতা ও জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের ঘটনা নিয়ে 'জীবনে ফেরার গল্প' নামের একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া সুন্দরবনের জীবন নিয়ে তাঁর তৈরি নানা ভিডিও কন্টেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ কাজটিও ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
