ঈশ্বরদীতে কৃষি জমিতে সার-কীটনাশক-লবণের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে বিগত কয়েক বছরে কৃষি-অকৃষি জমির মাটির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে। সবজি উৎপাদনে পরিচিত দেশের অন্যতম ঈশ্বরদী উপজেলায় গত ৩-৪ বছরের ব্যবধানে আবাদি জমিতে সবজির উৎপাদন ক্ষমতাও কমেছে শতকরা ১২ ভাগ। বেশিরভাগ জমিতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ফসল উৎপাদন কমেছে। উপজেলা কৃষি অফিস, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিটিউট ও মাটি গবেষকদের সাথে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে।
তাদের মতে অধিক পরিমাণে উৎপাদনের জন্য মাত্রাতিরিক্ত সার বিশেষ করে টিএসপি ও কীটনাশক ব্যবহারের সঙ্গে জমিতে সরাসরি লবণ প্রয়োগ করায় ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকার জমির মাটি অম্লতা-ক্ষারীয় হওয়ায় বিরূপ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ঈশ্বরদীর সলিমপুর, সাহাপুর, দাশুড়িয়া ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৫-৬ বছর আগেও জমিতে যে পরিমাণ ফসল উৎপাদন হতো, এখন তা হচ্ছে না। মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ায় নিরাশ হয়ে কেউ কেউ আবাদ কমিয়ে দিয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী দেশে সবজি উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে ঈশ্বরদী উপজেলা। দেশের সবজির মোট চাহিদার ২০ শতাংশ যোগান দেয় ঈশ্বরদী । অতিউচ্চ মাত্রায় ফলনের আশায় কৃষকরা সবজি চাষে ব্যবহার করছেন সার-কীটনাশক এবং লবণ। বিশেষ করে শীতকালীন সবজি বেগুন, শিম, ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষে সকাল-বিকাল প্রয়োগ হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক।
কৃষকদের দাবি, পোকার আক্রমণ থেকে সবজিকে রক্ষা এবং ভালো ফলনের জন্য তারা কীটনাশক ব্যবহার করছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কীটনাশকে উৎপাদিত সবজি মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করে কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণের পাবনার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক আব্দুল লতিফ বলেন, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার থেকে দূরে থাকতে নানাভাবে কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছি। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিজ নিজ ব্লকে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন।
মাটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমিতে অতিরিক্ত সার-বিষ-লবণ প্রয়োগের কারণে এমনটি হচ্ছে। বেশি ফসল উৎপাদনের আশায় মাত্রাতিরিক্ত টিএসপি সার ও কীটনাশকের পাশাপাশি লবণ প্রয়োগের ফলে মাটি তার নিজস্ব ক্ষমতা হারিয়েছে। মাটির অম্লতা বৃদ্ধি এবং এর প্রভাব পানিতেও পড়েছে। ফলে মাটির সাথে মাছের উৎপাদনও কমেছে।
উপপরিচালক আব্দুল লতিফ বেশী পরিমাণে উৎপাদনের আশায় কৃষকরা জমিতে অতিমাত্রায় টিএসপি সার ও কীটনাশকের সাথে সরাসরি লবণ প্রয়োগে ঈশ্বরদীর মাটি ক্রমশ: উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে বলে জানিয়েছেন। মাটির প্রাণ বাঁচাতে এবং উর্বরা শক্তি ফিরিয়ে আনতে হলে লবণ পরিহার এবং সার-কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে। পাশাপাশি জৈবসারের ব্যবহার বাড়াতে হবে বলে জানান তিনি।
পাবনা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফারুক হোসেন জানান, মাটির দুর্বলতা পরীক্ষা করতে ১৫৬টি স্থান থেকে মাটি সংগ্রহ করেছি। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এমন মাটিতে ফসফরাস ও পিএইচ পরিমাণ বেশী পাওয়া গেছে। পরীক্ষা সম্পূর্ণ শেষ হলে রিপোর্ট পর্যালোচনা করে কিভাবে মাটির উন্নয়ন বাড়ানো যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু করা হবে।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিতা সরকার শুক্রবার (১০) ডিসেম্বর) সকালে পরীক্ষা সম্পন্ন কয়েকটি মাটি প্রসঙ্গে জানান, বেশী ফলনের জন্য কৃষকরা নির্দিষ্ট মাত্রার অতিরিক্ত টিএসপি সার ব্যবহার করায় জমিতে ফসফরাসের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। আবার যেসব জমিতে লবণ ব্যবহার হয়েছে সেখানে পিএইচ বেড়ে মাটি ক্ষারীয় হওয়ায় এসব জমির ফলন কমে যাচ্ছে। জমিতে পিএইচের পরিমাণ ৬-৭ সহনীয়। কিন্তু পরীক্ষায় মাত্রা ৮ ছাড়িয়েছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে ওই জমিতে আর কখনও ফসলই হবে না। নির্দিষ্ট পরিমাণে টিএসপি সার ব্যবহার এবং লবণ পরিহারের জন্য আমরা কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ শুরু করেছি। পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহার করে জমি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য উদ্বুদ্ধ করছি বলে তিনি জানিয়েছেন।
