শনিবার, ২১ মে ২০২২, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইয়াহিয়ার যুদ্ধে সহায়তার প্রস্তাবে নিশ্চুপ থাকেন নিক্সন

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:১৬

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ড. এম এ মালিক যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আত্মসমর্পনের প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাব এইদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নাকচ করে দেন। সাংবাদিক ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ সানডে টেলিগ্রাফ পত্রিকায় রিপোর্টে উল্লেখ করেন, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী গভর্নরের পক্ষে পাঁচটি শর্তে আত্মসমর্পনের কথা জানান। 

শর্তগুলো হচ্ছে:
এক. পাকিস্তানি বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করবে।
দুই. বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তারা কোন লিখিত চুক্তি করবে না।
তিন. পশ্চিম পাকিস্তানের এক লাখ নাগরিককে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত যেতে দিতে হবে।
চার. এরপর পাকিস্তানি সৈন্যদেরও পশ্চিম পাকিস্তানে আসতে দিতে হবে।
পাঁচ. সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেবে।

কিন্তু ইয়াহিয়া খান এ প্রস্তাব নাকচ করেন। বরং তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে পাকিস্তানকে যুদ্ধ সহায়তা দেবার দাবি জানান। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নিক্সন এ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র জাতিসংঘ সাধারন পরিষদে উত্থাপিত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নেওয়ার জন্য জোর দাবি জানায়। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র এদিন জানান, জাতিসংঘ সাধারন পরিষদের প্রস্তাব মেনে নেওয়া ভারত-পাকিস্তান উভয়ের জন্যই অত্যাবশ্যক। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট নিক্সন এ ব্যাপারে নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা কিসিঞ্জারের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন।

১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১। এই দিনগুলিতে পরাজয় নিশ্চিত জেনে যখন পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকায় সাহায্যের বার্তা পাঠাচ্ছিল তখন ঢাকা থেকে কোন সাহায্য পাঠানো সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। অথচ এদিন লে. জেনারেল নিয়াজী ঢাকা বিমানবন্দর পরিদর্শন করতে এসে দম্ভভরে বলেন, কোনক্রমেই শত্রুকে কাছে ঘেঁষতে দেয়া চলবে না। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের ঐতিহ্যকে আরো উজ্জ্বল করবে। পরে বিমানবন্দরে তিনি বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে সর্বশেষ যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করেন।

এদিকে, রণাঙ্গণে যৌথবাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে জোর সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেছে। কোন সংঘর্ষেই পাকবাহিনী যৌথবাহিনীর সুসংগঠিত আক্রমনের মুখে টিকতে পারছিল না। কোথাও তারা আত্মসমর্পন করছিল। কোথাও পালিয়ে ঢাকার পথে রওয়ানা করছিল। এই পালাবার পথে পাকবাহিনী বিভিন্ন গ্রামে গণহত্যা চালায়। নির্বিচারে মানুষ হত্যা করতে করতে তারা পিছিয়ে যেতে থাকে।

মুক্তিবাহিনী দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা মুক্ত করে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা অব্যাহত রাখে। হিলি সীমান্তে মিত্রবাহিনী প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তুমুল লড়াই অব্যাহত থাকে। সন্ধ্যায় সম্মিলিত বাহিনী বগুড়া - রংপুর মহাসড়কের মধ্যবর্তী গোবিন্দগঞ্জে শক্তিশালী পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটির ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। সারারাত যুদ্ধের পর হানাদাররা ভোরের দিকে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়।

জামালপুর গ্যারিসন সম্মিলিত বাহিনীর কাছে অস্ত্র সমর্পন করে। জামালপুরের পূর্বে হালুয়াঘাট এলাকায় প্রচণ্ড সংঘর্ষের পর পাকিস্তানি বাহিনীর আর একটি ব্রিগেড প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে অস্ত্র গোলাবারুদ ফেলে টাঙ্গাইলের দিকে পালিয়ে যেতে শুরু করে। পলায়নের সময় শত্রুবাহিনী রাস্তার সমস্ত বড় বড় সেতু ধ্বংস করে দিয়ে যায়। অপর দিকে ময়মনসিংহে অবস্থানরত শত্রুবাহিনীর আর একটি ব্রিগেড শহর ত্যাগ করে টাঙ্গাইলে তাদের প্রতিরক্ষামূলক ঘাঁটিতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সম্মিলিত বাহিনী রাতে বিনা প্রতিরোধে জামালপুর দখল করে নেয়।

জাতিসংঘের অনুরোধে মিত্রবাহিনীর বিমান হামলা সকালে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। উদ্দেশ্য, বিদেশী নাগরিকদের ঢাকা ত্যাগের ব্যবস্থা করার জন্য বিমানবন্দর মেরামতের সুযোগ করে দেয়া। সন্ধ্যায় মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী যুদ্ধবিরতি ও পাকিস্তানীদের ঢাকা থেকে অপসারনের ব্যবস্থা করার জরুরি আবেদন জানান। এদিকে ঢাকায় বিকাল তিনটা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন জারি করা হয়।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

৫০ বছরে বাংলাদেশ: যা ভাবছেন তরুণরা

বিশেষ সংবাদ

সপ্তম নৌবহর যুদ্ধে অংশ নেওয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়

বিজয়ের মাস

নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোতে বাতিল

বিজয়ের মাস

বাংলাদেশে যুদ্ধবিরতি ঘোষণায় মুখ থুবড়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

যেসব স্থান মুক্ত হয়েছিল আজ

মুক্তিযুদ্ধের সময় সংবাদ প্রকাশে ইত্তেফাককে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো

বাংলাদেশ অভিমুখে সপ্তম নৌবহর রাশিয়ার হুমকিতে যাত্রা বিরতি

বিজয়ের মাস

সারাদেশেই পাকিস্তানি বাহিনী সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে