সড়ক দুর্ঘটনা নিয়া বহু লেখালেখি হইয়াছে। আমরা আর কত লিখিব? লিখিয়া কোনো বিশেষ লাভ হইতেছে বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে না। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয়বারের মতো নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামিয়াছিল। কিন্তু আন্দোলনের মধ্যেই একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিতে থাকে। এইরূপ একেকটি দুর্ঘটনা একেকটি করুণ কাহিনীর জন্ম দিতেছে। পরিবার-পরিজনের বুক ফাটা আর্তনাদের ছবির দিকে তাকানো যায় না। কিন্তু ঐসব মর্মান্তিক খবর যেন গা-সওয়া হইয়া যাইতেছে! সড়কের ঘাতকরা কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করিতেছে না। তাহাদের ডোন্ট কেয়ার মনোভাব কেন তৈরি হইতেছে তাহা নিয়া আমরা গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতেছি না। তিন দিন আগে নারায়ণগঞ্জে নিহত হইলেন পিতা-কন্যা। কন্যা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শিক্ষার্থী। পিতা-কন্যা রিকশায় চড়িয়া যাইবার সময় পিছন হইতে নিয়ন্ত্রণহীন ট্রাক আসিয়া প্রাণ কাড়িয়া লইল। এদিকে গত শনিবার দিবাগত রাত্রে রাজশাহীতে সড়কে প্রাণ হারাইলেন পিতা-পুত্র। এ কেমন অনিরাপদ দেশে বসবাস করিতেছি আমরা?
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই কেহ না কেহ প্রাণ হারাইতেছেন। কিন্তু ইহা হইতে মুক্তি পাইতে আমাদের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নাই। গতকালও পাবনার ঈশ্বরদীতে ট্রাকের ধাক্কায় ভ্যানগাড়ির দুই যাত্রী নিহত হইয়াছেন। এই মৃত্যুর মিছিল থামিবে কখন? বিশৃঙ্খল সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরাইবে কে? কে থামাইবে বেপরোয়া যানবাহনের গতি? এত দিন আমরা জনগণকেও সচেতন হইয়া চলাফেরার পরামর্শ দিয়া আসিয়াছি। সাধারণ মানুষের অসতর্কতার কারণেও অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। ইহা অস্বীকার করিবার কোনো উপায় নাই। কিন্তু সচেতন হইলেও কি রক্ষা পাইবার নিশ্চয়তা আছে? ফুটপাত দিয়া মোটরসাইকেল চালানো সম্পূর্ণ নিষেধ। অথচ ফুটপাতে অবলীলায় গাড়ি উঠাইয়া দেওয়া হইতেছে। মানুষ ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করিবে, কিন্তু সেখানেও দেখা যাইতেছে হকার ও ভাসমান মানুষের উৎপাত। নোংরা পরিবেশ। তাহা ছাড়া এই খোদ ঢাকা শহরেও সব রাস্তায় ফুটপাত নাই। ফুটপাত ও সড়কের বড় একটি অংশ চলিয়া গিয়াছে বেদখলে। কাহারা জনগণের রাস্তা ভাড়া দিয়া বাণিজ্য করেন, তাহা আজ অজানা নহে। সারা দেশে আমরা এখনো সড়কের টার্নিং পয়েন্টগুলিতে ফুটওভারব্রিজ বা আন্ডারপাসের ব্যবস্থা করিতে পারি নাই। রোড ইঞ্জিনিয়ারিং বলিয়া একটি শব্দ আছে। কিন্তু তাহার সঠিক ব্যবহার নাই আমাদের দেশে। সড়ক মেরামতেও আমরা উদাসীন। ইহার পর লাইসেন্সহীন চালক ও ফিটনেসহীন যানবাহনের দৌরাত্ম্য আমরা এখনো বন্ধ করিতে পারি নাই। বাস স্টপেজগুলিতে উঠানামার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করিতে পারি নাই শৃঙ্খলা। কাজের চাইতে কথাই আমাদের সার হইয়া উঠিতেছে।
গত কয়েক দশকে আমাদের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন হয় নাই বলা হইলে ভুল হইবে। রাস্তা প্রশস্ত হইয়াছে। নির্মিত হইয়াছে নূতন নূতন সড়ক। তবে মানিতে হইবে যে, আগের তুলনায় সড়কে যাত্রী ও যানবাহনের সংখ্যাও বাড়িয়াছে। বিচিত্র বাহনের বিচিত্র গতি। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়া আসিবে কীভাবে? ট্রাফিক অব্যবস্থাপনার কথা না হয় বাদই দিলাম। দেশে এখন ওভারব্রিজ, মেট্রোরেল কত কী তৈরি হইতেছে। সেই সঙ্গে এখন গণপরিবহন ব্যবস্থাকেও ঢালিয়া সাজাইতে হইবে। শহর হইতে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত এই ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিতে হইবে। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি ও নানা প্রকার অনিয়ম দূর করিতে হইবে। নিরাপদ সড়ক পরিবহন আইনটি কেন বাস্তবায়িত হইতেছে না, তাহার জবাবদিহিতা থাকা দরকার। এতদিনেও তাহা যদি বাস্তবায়িত না হয়, তাহা হইলে আইন করিয়া কী লাভ? সরকার বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর নিকট জিম্মি থাকিতে পারে না। সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাইবার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে সরকারকে অবশ্যই চেষ্টা করিতে হইবে। স্বজন হারানোর বেদনা উপলব্ধি করিতে হইবে অন্তঃকরণ দিয়া।
