যে কারণে কক্সবাজারে ‘নৌকা’ ডুবলো

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯:৫২

কক্সবাজারের চকরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচনেও সরকার দলীয় সংসদ সদস্য জাফর আলম নৌকার প্রার্থী ও তার অপছন্দের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের কোন ধরণের হস্তক্ষেপের নির্দেশনা না থাকলেও নৌকার প্রার্থীসহ অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিপক্ষে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জয় করাতে সরকার দলীয় এ এমপি নানা ধরণের বক্তব্য দিচ্ছেন।

এদিকে চকরিয়া ৮ ইউপিতে ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটারদের হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তুলেছেন ভীতসন্ত্রস্ত একাধিক চেয়ারম্যান প্রার্থী।

এর আগে তৃতীয় দফার নির্বাচনেও চকরিয়া-পেকুয়ার ১১ ইউপির নির্বাচনে নৌকার ভরাডুবির জন্য এমপি জাফর আলমকে দায়ী করেছেন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

তাদের দাবি, চকরিয়া-পেকুয়ায় তার অনুসারী ছাড়া যারা নৌকা পেয়েছেন তাদের নানাভাবে পরাজিত করিয়েছেন তিনি। এর ফলসরূপ চকরিয়ার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের নৌকার প্রার্থী জান্নাতুল বকেয়া রেখা মাত্র ৯৯ ভোট পেয়ে দেশে ইতিহাস গড়েছেন। আবার নিজের পছন্দের স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের গরুচোর সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে পরিচিত আলোচিত নবী হোসেন ওরফে নইব্যা চোরাকে চেয়ারম্যান হিসেবে জয় পেতে তিনি সহযোগিতা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সদস্য সমাপ্ত তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে হেরে গেছেন পেকুয়ার উজানটিয়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শহিদ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, স্বতন্ত্রপ্রার্থী তোফাজ্জাল করিমকে জেতানোর জন্য নৌকার বিরুদ্ধে যা যা করা দরকার সব-ই করেছেন এমপি জাফর আলম। নির্বাচনের আগেও একই অভিযোগ করেছিলেন তিনি। 

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন, নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে হেরে যাওয়া আরও কয়েকজন প্রার্থী।

এদিকে তৃতীয় ধাপের মত আগামী ২৬ ডিসেম্বর চতুর্থ ধাপের নির্বাচনকে সামনে রেখে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের একজন মোটরসাইকেল প্রতীকের কর্মী-সমর্থকদের প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য জাফর আলম, এমন অভিযোগ করে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমার বিপুল জনসমর্থনে ঈর্ষান্বিত হয়ে চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম আমার ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। তিনি হুংকার দিচ্ছেন যেকোন মূল্যে প্রতিটি ভোট কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আমিসহ তার অপছন্দের প্রার্থীদের চেয়ারম্যান হতে দিবেন না। 

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে ফাঁসিয়াখালীতে অবৈধ অস্ত্রধারী বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়েছে। ২৬ ডিসেম্বর নির্বাচনে ইউনিয়নের ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোট কেন্দ্র দখলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি (এমপি)। 

ডুলাহাজারা ইউনিয়নের লাঙ্গল প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল আমিন এবং স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী কলিম উল্লাহ কলি অভিযোগ করেন, এমপি জাফর আলমের বিশেষ বাহিনী দিয়ে দখলে নিয়ে (এমপির) সাবেক পিএস বিদ্রোহী প্রার্থী হাসানুল ইসলাম আদরের (আনারস মার্কায়) পক্ষে ভোট ছিড়ে নেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া এ সংক্রান্ত তাদের দুটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। 

অপর দিকে, চিরিংগা ইউনিয়নে এমপি জাফরের বেয়াই স্বতন্ত্র প্রার্থী জামাল হোসেনকে নির্বাচনে জেতার কৌশল হিসেবে তার আপন ভাইপো তৃণমূলে অগ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে নৌকার মনোনয়ন এনে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। 

চিরিংগা ইউনিয়নের টানা ৩ বারের নির্বাচিত বর্তমান চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, আমাদের এমপি (জাফর) উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েও নৌকার পক্ষে প্রচারণা না করে, আমাকে হারানোর অপকৌশল হিসেবে প্রকাশ্যে আমার কর্মী-সমর্থকদের হুমকি ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন এবং ভোট কেন্দ্র দখলে নিবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। 

একই ইউনিয়নের সাবেক ৩ বারের চেয়ারম্যান ও মোটরসাইকেল প্রতীকের প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা খাজা সালাহউদ্দিনও এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন চলাকালে উনি (এমপি) স্থানীয় সরকার নির্বাচন আচরণ বিধির ১২ ধারার তোয়াক্কা না করে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ওনার পছন্দের প্রার্থী (বিদ্রোহী প্রার্থী) জামাল হোসেন চৌধুরীর আনারস প্রতীকে ভোট চাইতেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চকরিয়া-পেকুয়ার উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বলেন, মূলত চকরিয়া-পেকুয়ায় এমপি জাফর পক্ষ-ই শেষ কথা। তার (এমপির) অনুসারীরা নৌকা না পেলে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা প্রার্থীদের ডুবাতে যা যা করা দরকার সবই করেছেন জাফর আলম। এবং অনুসারীদের বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে জয়ের জন্য ভূমিকা রেখেছেন তিনি। চতুর্থ ধাপের নির্বাচনকে সামনে রেখে ও একই পথ অবলম্বন করেছেন এসপি জাফর আলম। এতে করে অসহায় হয়ে পড়া আওয়ামী লীগের প্রার্থীর করুন পরিণতি হতে পারে। এমনটি উল্লেখ করে এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে জেলা ও কেন্দ্রের কাছে অভিযোগ করা হবে বলে জানান আওয়ামী লীগ নেতারা।

এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী দিয়ে নৌকার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। এরমধ্যে কেন্দ্রে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে।

তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে সাংসদ জাফর আলাম বলেন, নির্বাচনী আচারণ বিধি অনুযায়ী একজন সাংসদের নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণার সুযোগ নেই। অগ্রহণযোগ্য প্রার্থীর হাতে নৌকা দেয়ায় তৃতীয়ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কয়েকটি ইউনিয়নে নৌকার সূচনীয় পরাজয় হয়েছে দাবি করেন তিনি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে একটি মহল নানাভাবে ষড়যন্ত্র লিপ্ত থাকায় এসব অভিযোগ তুলছেন বলেও উল্লেখ করেন এমপি জাফর আলম।

 

ইত্তেফাক/এমএএম