অণুগল্প 

যুদ্ধে যাওয়া

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:২৬

‘আচ্ছা বাবু ভাই, তুমি যুদ্ধে যাচ্ছ না কেন?’ হঠাত্ রুমানার এ প্রশ্নে থতমত খেয়ে যাই। এরকম প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে ভাবিনি। কী জবাব দেব, হঠাত্ বুঝে উঠতে পারি না। ‘কই, আমার কথার জবাব দিলে না তো, তোমার বয়সি সবাই তো আজ মুক্তিযোদ্ধা।

অথচ তুমি ঘরে বসে আছ—’ রুমানার কথাগুলো সুচের মতো বিঁধতে থাকে আমার মনে। কথাগুলো তো মিথ্যা নয়। আমি একজন রাজনীতি সচেতন তরুণ। দেশজুড়ে যুদ্ধ চলছে। অথচ আমি এখনো হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে আছি। এই মুহূর্তে রুমানার প্রশ্নের জবাব দিতে পারছি না যে কারণে। অক্ষমতায়, অনুশোচনায় আমার বুকের ভেতরটা জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে যেতে থাকে।

নিজেকে কোনোভাবে সামলে নিয়ে ম্লান হেসে রুমানাকে বলি, ‘আমি যুদ্ধে গেলে তুমি খুশি হবে?’ রুমানা মুখে কিছু না বলে মাথা নাড়ে বাচ্চা মেয়েদের মতো। আমার মধ্যে হঠাত্ যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি—ফুলতলিতে রুমানাদের পৌঁছে দিয়েই চলে যাব মুক্তিযুদ্ধে। বাবা-মাকে কোনোভাবেই বুঝতে দেওয়া যাবে না ব্যাপারটা।

সমবয়সি সহপাঠী বন্ধুবান্ধবদের অনেকেই যুদ্ধে গিয়েছে। ওরা সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছে আমাকে। কিন্তু বাবা-মায়ের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটা নিতে পেরে মনটা আনন্দে ভরে উঠছে। এই সময় হঠাত্ কাছে কোথাও মেশিনগানের ব্রাশফায়ারের একটানা শব্দ শোনা যায়। ভীষণ ভয় পেয়ে দু’হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে রুমানা। অনেকক্ষণ এভাবে জড়িয়ে ধরে রাখে সে আমাকে। গুলির শব্দ থেমে যাওয়ার পরেও রুমানার ভয় যেন কাটে না। প্রচণ্ডভাবে আঁকড়ে ধরে থাকে। 

আমি ওকে বলি, ‘ঘরের ভেতরে চলো, কেউ এ অবস্হায় দেখে ফেললে কী ভাববে বলো তো?’ ‘যা খুশি ভাবুক, যুদ্ধ শেষে তুমি যেদিন ফিরে আসবে, আমি ফুলের মালা দিয়ে তোমাকে বরণ করব।’ আর বলতে পারে না রুমানা। আবেগে ওর গলাটা বুজে আসে। এক সময়ে কেঁদে ফেলে সে।

এই অন্ধকারেও আমি ওর চোখেমুখে আনন্দের উজ্জ্বল ঝিলিক আবিষ্কার করি। ওর চোখের পানিতে আমার শার্ট, বুক ভিজে যেতে থাকে। আমার মনে তখন যুদ্ধে যাওয়ার চিন্তা—ফুলতলি গিয়ে কীভাবে সীমান্তের ওপারে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পে পৌঁছব।

ইত্তেফাক/এএএম