আমাদের একটি বিজয় দিবস আছে। ইহা পৃথিবীর সকল জাতি পায় নাই।পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের পরে কেবল বাংলাদেশই ঘোষণা দিয়া মুক্তিযুদ্ধ শুরু করিয়াছিল এবং বিজয় অর্জন করিয়াছিল। তবে ইহার জন্য বাংলাদেশকে বিশাল মূল্য চুকাইতে হইয়াছিল। একসাগর রক্তক্ষয়ের বিনিময়ে আমরা বিজয় অর্জন করি। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রানন্তে আসিয়া বহু ক্ষেত্রেই আমরা নিশ্চয়ই আত্মশ্লাঘায় ভুগিব। পাকিস্তানিদের পোড়ামাটি নীতির কারণে একাত্তরে তাহারা এই দেশটিকে নির্মমভাবে ধ্বংস করিয়াছে।
বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করিলে ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা পড়া সদ্যস্বাধীন দেশটিকে লইয়া বিশ্বের অনেক বড় বড় অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞই ঠাট্টা করিতেন। এমনও বলা হইত যে, বাংলাদেশ যদি তাহার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমস্যার সমাধান করিতে পারে, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে পৃথিবীর যে কোনো দেশই উন্নতি করিতে পারিবে। বলা বাহুল্য, বিজয়ের ৫০ বত্সর পর এই উত্তর স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ তাহা পারিয়াছে। শত সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশে বিগত অর্ধশতকে অর্থনৈতিক সামষ্টিক প্রবৃদ্ধি ৭৩ গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে, মাথাপিছু আয় বাড়িয়াছে ১৫ গুণ, বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদ্যুতের আওতায় আসিয়াছে এবং মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা পাইতেছে। শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়াছে নিশ্চয়ই, যদিও শিক্ষার মান লইয়া প্রশ্ন রহিয়া গিয়াছে। বিজয়ের ৫০ বত্সর পর আমরা বিশ্বের কাছে প্রমাণ করিতে পারিয়াছি, অসীম আকাশের মতোই সম্ভাবনার উজ্জ্বল দিগন্তে আমরাও ফানুস উড়াইতে পারি।
ব্যর্থতার পরিসংখ্যান সকলেই জানেন, তবে অর্জন যাহা হইয়াছে তাহা সার্বিক ব্যর্থতাকে ছাপাইয়াই বিশ্বের নিকট সমীহ অর্জন করিয়াছি আমরা। সেই অভাবনীয় অর্জন দিনদিন মূর্ত হইয়া উঠিতেছে সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে। আর এইভাবেই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার প্রত্যয়দীপ্ত পদশব্দ স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। আমাদের নূতন প্রজন্ম ইহা যেন কখনো ভুলিয়া না যায়—স্বাধীনতার পরবর্তীকালে আমাদের যেই অর্জন সম্ভব হইয়াছে—তাহার নেপথ্যে রহিয়াছে আমাদের সূর্যসন্তানদের আসমুদ্র রুধিরধারার আত্মত্যাগ।
আমরা যদি বাংলাদেশকে একটি কল্যাণকর ও উন্নত রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া তুলিতে পারি, তবেই না এই নিযুত নিযুত মানুষের আত্মত্যাগের প্রতি সত্যিকারের সম্মানজ্ঞাপন করা হইবে। আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য ইহাই হওয়া উচিত। এই ক্ষেত্রে আমরা আরো স্পষ্ট করিয়া বলিতে চাই, বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটে বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি ও অদক্ষতা এখনো সহনশীল পর্যায়ে উন্নীত হয় নাই। অনেকের মতে, দুর্নীতি ও অদক্ষতার জন্য আমাদের বাজেটের অপচয় হয় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। ইহা সহনশীল ন্যাঘ্যমাত্রার চাইতে অনেক বেশি। এই অপচয়ের লাগাম যদি টানিয়া ধরা যাইত, তাহা হইলে আমরা আরো ২৫ শতাংশ উন্নয়ন কাজ অধিক করিতে পারিতাম! উন্নয়ন বাজেটের অর্থ তো জনগণের অর্থ, ইহার অপচয় রোধ করাটা দেশপ্রেমেরও অংশ।
আমাদের মধ্যে এই দেশপ্রেমের ঘাটতি পূরণ করিতে হইবে। আরেকটি বিষয় হইল, আমরা দেখিতে পাই, দেশের উন্নয়নযাত্রায় বহু ক্ষেত্রেই দেশের বিভিন্ন খাতে মনোপলি ব্যাপার রহিয়া গিয়াছে। অনেকে মনে করেন, আমাদের অর্থনীতির ভিতরে নীরবে রক্তক্ষরণ ঘটিতেছে রাঘববোয়াল দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি এবং লুটেরাদের কারণে। ব্যাংকগুলির অবস্হা কতটা খারাপ তাহা অনেকের মনেই আশঙ্কা তৈরি করে। তারল্য সংকট বাড়িতেছে। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় লক্ষ কোটি টাকা। সুতরাং দেশ আগাইতেছে—ইহা লইয়া যেমন কাহারো মধ্যে সংশয়ের অবকাশ নাই, তেমনি এই অপচয় ও দুর্নীতিও প্রশমিত করিবার মাধ্যমে দেশপ্রেমের পরিচয় দেওয়ার মধ্যেও কোনো সংশয় নাই। জনগণের অর্থের যে কোনো ধরনের অপচয় রোধ করাই হউক আমাদের আজকের বিজয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তীর শপথ।
বাংলাদেশ এখন আর কাহারো অবহেলার পাত্র নহে। বিজয়ের এই সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করিতেছি একাত্তরে আমাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ এবং সর্বতোভাবে সহযোগিতা করা ভারতসহ সকল বন্ধুরাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গকে। সকলের অপার অবদানের সমন্বয়েই আমরা বিজয় অর্জন করিতে পারিয়াছি।
