বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মহান বিজয়ের স্মৃতি 

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬:৪৭

৯ মাসে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হলো—পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বিরল। কিন্তু এর পেছনেও অনেক গল্প ছিল, ছিল অনেক বিশ্ব রাজনৈতিক চাল ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। পূর্ণ হলো স্বাধীনতার ৫০ বছর।

এই দিনটি বাঙালি জাতির জীবনে সর্বোচ্চ গৌরবের একটি অবিস্মরণীয় দিন। আজকের এই দিনে বিশ্বের মানচিত্রে উদিত হয় নতুন একটি সার্বভৌম দেশ—বাংলাদেশ; যা বাঙালি জাতিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বিশ্বপরিমণ্ডলে।

৩০ লাখ শহিদের বুকের তাজা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা। দেখেছে অসংখ্য নিপীড়িতের আর্তনাদ, দুই লক্ষ্য নারীর সম্ভমহানী, বাস্তুহারা অগুনিতের হাহাকার ও ধ্বংসলীলা। ঔপনিবেশিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি হাঁপিয়ে উঠেছিল। দুঃশাসন, অত্যাচার, বৈষম্য, নিষ্পেষণ বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল। তারা মুক্তির স্বাদ আস্বাদনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। যার ফলশ্রুতিতে এই ভূখণ্ডে এক পুনর্জাগরণের সূচনা হয়েছিল, যার আভাস আমরা ’৪৮, ’৫২, ’৬২, ’৬৬, ’৬৯-এর আন্দোলনে দেখতে পাই। সে পুনর্জাগরণে যোগ দিয়েছিল আবাল বৃদ্ধ বণিতা। এসব আন্দোলন ছিল কখনো মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, কখনো ছাত্রদের বিজ্ঞানভিত্তিক সর্বজনীন শিক্ষার জন্য সংগ্রাম, কখনো বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার তথা স্বায়ত্তশাসন আদায়ের জন্য সংগ্রাম। কখনো বা সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম, কখনো অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া আদায়ের সংগ্রাম। এই পুরো সময় জুড়ে বাংলার মানুষ জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদিয়কতা, গণতন্ত্র এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছে।

মূলত বাঙালি জাতি নিষ্পেষিত ছিল বহু আগে থেকেই। ব্রিটিশ শাসন, পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্ব—কোনোকালেই বাঙালি জাতি তার স্বাধীন চিন্তা-ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারেনি। সমস্যা ছিল নেতৃত্বের সংকট। কেউ সামনে থেকে নেতৃত্বে দিয়ে জাতীয় সংকটের সমাধান করতে পারেনি। নিষ্পেষণের ইতিহাসের ক্রান্তিকালে রচনা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুর কিশোর জীবন থেকে পরিণত জীবনে পদার্পণ এ যেন মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ সৃষ্টির আন্দোলন তার কিশোর জীবন থেকে পরিণতিতে পৌঁছেছে— বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাধ্যমে।

আজকের দিনে বাঙালি জাতিকে সবচেয়ে যে বিষয়টি অনুপ্রাণিত করেছে সেটি হচ্ছে ইউনেসকো স্বীকৃত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত এতদঞ্চলের মানুষ একটি ভাষণ শুনেছিল—‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এরপরের ইতিহাস সবার জানা। বাংলার আবালবৃদ্ধাবনিতা দল-মত নির্বিশেষে পশ্চিম পাকিস্তানের নিস্পেষণের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র দেশের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমি তখন জেনেভায়। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করি। যুদ্ধচলাকালে সময় ৯ মাস জেনেভায় পলিটিকাল রিফিউজি ছিলাম। আমরা বহিঃবিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে স্বাধীনতার স্বপক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরির প্রচেষ্টায় ছিলাম। মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ হতো।

সাধারণত কূটনীতিকরা যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন না। কিন্তু হাজার মাইল দূরে বসেও আমরা হাতেগোনা কয়েক জন বাঙালি কূটনীতিক কূটনৈতিক ফ্রন্টে পাকিস্তানিদের মোকাবিলা করেছিলাম। বিদেশেও আমাদের নিরাপত্তার সংকট তৈরি হয়েছিল। আমরা ভালো করেই জানতাম, পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যে কোনো সময় আমাদের দেশে থাকা মা-বাবা, ভাইবোনদের ওপর অত্যাচার করতে পারে ও মেরে ফেলতে পারে। তবুও আমরা সংকল্পবদ্ধ ছিলাম। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে আমাদের কূটনীতিকদের একযোগে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ বিরাট চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে ও সেসব দেশের প্রশাসনের ওপর বিরাট চাপও সৃষ্টি করে। অন্যদিকে তাদের এ প্রয়াস আমাদের যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে।

সেসময় মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছি এবং বাংলাদেশের জন্য সাহায্য চেয়েছি। তখন সকল দেশে যেতে ভিসা লাগত কিন্তু আমার যে রিফিউজি ডকুমেন্ট ছিল সে ডকুমেন্ট নিয়ে আমি ভিসা ছাড়া ঘুরেছি কোনো অসুবিধা হয়নি। যখন তারা শুনেছে আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রিপ্রেজেন্টেটিভ তখনই তারা একটি শব্দ উচ্চারণ করত, ‘আচ্ছা আপনি যান’ ফরাসি ভাষায় বলত ‘আলেজি’। তারা বলত ‘আপনি শেখ মুজিবের রিপ্রেজেন্টেটিভ আপনার কোনো ভিসা লাগবে না’। এ মুজিব স্ফুলিঙ্গ সমস্ত ইউরোপকে আচ্ছন্ন করেছিল।

৯ মাসে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হলো—পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বিরল। কিন্তু এর পেছনেও অনেক গল্প ছিল, ছিল অনেক বিশ্ব রাজনৈতিক চাল। আমরা সেগুলোকে কিছু বন্ধু রাষ্ট্র বিশেষ করে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় মোকাবিলা করতে সক্ষম না হলে আরো কত প্রাণের বিসর্জন দিতে হতো তা কে জানে? ১৬ ডিসেম্বরের আগেও এ প্রশ্ন ছিল অমীমাংসিত। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল এবং সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করেছিল যাতে বাংলাদেশ স্বাধীন না হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তত্কালীন ওয়াশিংটনের ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এল কে ঝা কে সতর্ক করেছিলেন এই বলে যে ‘যদি ভারত পশ্চিম পাকিস্তানের বিপক্ষে তাদের কর্মকাণ্ড চলমান রাখে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েতের মধ্যকার যুদ্ধ অনিবার্য। সোভিয়েতের মধ্যকার যেরকম ভারতের সঙ্গে চুক্তি আছে, আমাদেরও পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি আছে’।

ডিসেম্বর ৯ তারিখে নিক্সন চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট। ও চীন যৌথভাবে ভারতের বিপক্ষে অবস্থান নেবে। এ লক্ষ্যে সে বেইজিং কে ভারতীয় সীমান্তে সৈন্য পাঠাতেও বলেছিল। আমরা মুজিবনগর সরকারকে বিভিন্ন তথ্য দিচ্ছিলাম এবং রাশিয়ার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ইতিমধ্যে মস্কোর সৈন্যবাহিনী চীনের সীমান্তে অবস্হান করছিল। ফলে বেইজিং নিক্সনের ফাঁদে পা দিতে চায়নি।

এরপরে যুক্তরাষ্ট্র ১১ ডিসেম্বর তার সপ্তম নৌবহর পাঠায়। যদিও পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বিপর্যস্ত অবস্হায়, সবাই উপলব্ধি করতে পারছিল যে সপ্তম নৌবহর এসে পৌঁছলে প্রেক্ষাপট পুরোই পরিবর্তন হয়ে যাবে। চতুর্দিকে একটি ভীতি কাজ করছিল। সপ্তম নৌবহর আসার আগেই বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।

১৬ই ডিসেম্বর সকাল থেকেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানে যুদ্ধবিরতি করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে মিটিং চলছিল। আমাদের সঙ্গে মুজিবনগর সরকারের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। জেনেভা থেকে আমি, ওয়াশিংটন ডিসি থেকে শাহ এম এস কিবরিয়া এবং নিউ ইয়র্ক থেকে এস এ করিম ও লন্ডন থেকে মহিউদ্দিন আহমেদ সেখানে সার্বক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান করছিলাম। জেনেভা থেকে পুর্ণেন্দু কুমার ব্যানার্জি, সুইস রাজধানী বার্ন থেকে এ আর ভাইস মার্শাল অর্জুন সিং সার্বক্ষণিকভাবে আমাকে দিল্লি ও মিস গান্ধীর মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের খবরাখবর দিয়ে যাচ্ছিলেন। মুজিবনগর সরকার আমাদেরকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি কিছুক্ষণ পর পর বিবৃত করছিল। আমাদের দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করা ও বাংলাদেশে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার আগে পর্যন্ত মিটিং চলমান রাখতে সহায়তা করা যাতে নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারে। তত্কালীন ভারতীয় প্রতিনিধি সরদার স্বরণ সিং বক্তৃতা দিলেন। সোভিয়েত পররাষ্ট্র মন্ত্রী আন্দ্রেই এন্ড্রেয়েভিচ গ্রোমিকো বক্তব্য রাখলেন। জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ইয়াকভ মালেকও টানা চার ঘণ্টা বক্তব্য রাখলেন। ফলে নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছার আগেই পাকিস্তান সৈন্যবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় ও বিজয় নিশ্চিত হয়। আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বসে উদযাপন করছি মহান স্বাধীনতার স্বাদ। সবুজ বাতাসে বুক ভরা নিঃশ্বাস নিয়ে অনুভব করছি বাংলার মাটির মমতা। এ আমাদের পরম পাওয়া, পরম স্বাধীনতা।

লেখক ও গবেষক