শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

অর্থনীতিতে যত অগ্রগতি হলো

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯:৩৭


যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যে দেশকে তলাবিহীন ঝুঁড়ি বলা হতো সেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আনা এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। প্রবৃদ্ধি হলেও সে তুলনায় কর্মসংস্থান হয়নি, কমেনি আয়ের বৈষম্য। 

বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের প্রথম আবাসিক প্রতিনিধি ছিলেন নরওয়ের ইয়ুস্ট ফালান্দ। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ফালান্দ ও মার্কিন অর্থনীতিবিদ জ্যাক আর পার্কিনসন যৌথভাবে একটি বই লেখেন। যার নাম ছিল বাংলাদেশ: দ্য টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট। যেখানে তারা লিখেছেন, অর্থনীতির দিক থেকে বাংলাদেশ টিকে থাকতে পারবে না।

তাদের অনুমানের অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়েছে বাংলাদেশ। ইয়ুস্ট ফালান্দের সম্পাদনায় আরেকটি বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮১ সালে। নাম ছিল এইড অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স: দ্য কেস অব বাংলাদেশ। সেখানেও তিনি পরিষ্কারভাবে লিখেছিলেন, টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে বহু বছর বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে।

১৯৫৯-৬২ সময়ে অস্টিন রবিনসন ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট। ১৯৭৩ সালে তিনি ইকোনমিক প্রসপ্রেক্টস অব বাংলাদেশ নামে একটি গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। যেখানে তিনি লিখেন, বাংলাদেশে উৎপাদন যে হারে বাড়ছে, তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ছে জনসংখ্যা। এর ফলাফল হচ্ছে—দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, মৃত্যু ইত্যাদি।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৭০ ডলার। অস্টিন রবিনসন এক হিসেবে বলেছিলেন, যদি বাংলাদেশ ২ শতাংশ হারে মাথাপিছু আয় বাড়ায়, তাহলে লাগবে ১২৫ বছর, আর ৩ শতাংশ হারে আয় বাড়লে লেগে যাবে ৯০ বছর। এটা সম্ভব যদি কেবল বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারে। বাংলাদেশ তা পারবে কি না, তা নিয়ে তার গভীর সংশয় ছিল।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল ১৯৭২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। বিশ্বব্যাংক তখন বলেছিল, ‘সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল।’ সেই বিশ্বব্যাংকই ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ ২০২০: একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত সমীক্ষা শিরোনামে বাংলাদেশ নিয়ে একটি গবেষণা করে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোথায় যাবে—এটাই ছিল গবেষণার বিষয়বস্তু।

পোশাক শ্রমিক

বিশ্বব্যাংকের সেই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা ছিল, দারিদ্র্যের হার দ্রুত নামিয়ে আনা, প্রবৃদ্ধির হার ৭-৮ শতাংশে উন্নীত করা, ৫ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানিপণ্য বহুমুখীকরণ, পরিবেশের কার্যকর সংরক্ষণ, ২০২০ সালের মধ্যে বার্ষিক ৮০০ কোটি ডলার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আনা ইত্যাদি। এখন দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব কটি লক্ষ্যই অর্জন করেছে বাংলাদেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক বেশি এগিয়েও রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম এ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। ২০০৭ সালে প্রকাশিত বইটিতে নুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘এখন যদি কেউ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনের এবং সরকারের প্রতিক্রিয়ার কথা স্মরণ করে তাহলে মনে হবে বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে ৩০ বছরে তেমন কিছু বদলায়নি, আজও বাংলাদেশ এবং তার উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে আলোচনার প্রধান বিষয় হচ্ছে দুর্নীতি।’

এসঅ্যান্ডপির পূর্বাভাস অনুযায়ী, তুলনামূলকভাবে দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তির প্রভাব মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্রমাগত স্বাভাবিক হবে ২০২২ সালের দ্বিতীয়ার্ধে। এই বছর প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ অর্জিত হতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জুন মাসে সমাপ্ত অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। করোনার ধাক্কা মোকাবিলা করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার আগামী এক থেকে দুই বছর সম্ভব হবে।

ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনোমিক্স এন্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) তাদের সর্বশেষ এক রিপোর্টে বলেছে, বাংলাদেশ এখন যে ধরণের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি। ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ।

সিইবিআর তাদের রিপোর্টে বলছে, কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর আগের বছরগুলোতে বাংলাদেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল বেশ ভালো এবং এটা ঘটেছে দেশটিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও। গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ছে গড়ে ১ শতাংশ হারে।

বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় কোভিড-১৯ যেভাবে ছড়িয়েছে, সে তুলনায় বাংলাদেশে সংক্রমণ অনেক সীমিত। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে মারা গেছে ৭ হাজার ৫২ জন। প্রতি এক লাখে মাত্র ৪ জন। যদিও এই মহামারির কারণে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ছিল সীমিত, তা সত্ত্বেও অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে এটি। কারণ মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে চাহিদা গিয়েছিল কমে আর আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

সিইবিআর এর পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, ২০২১ সাল হতে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটবে গড়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হারে। তবে এর পরের দশ বছরে এই হার কিছুটা কমে গড়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হবে।

বাংলাদেশি মুদ্রা টাকা

সিইবিআর এর সূচক অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রথম ২৫টি দেশের তালিকায় যুক্ত হবে তিনটি নতুন দেশ: ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন এবং বাংলাদেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশের উত্থানকেই সবচেয়ে নাটকীয় বলতে হবে। বর্তমান র্যাংকিং ৪১ থেকে বহু দেশকে টপকে বাংলাদেশ পৌঁছাবে ২৫ নম্বরে।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ৪১। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ৩৪। এর পাঁচ বছর পর ২০৩০ সালে বাংলাদেশ হবে ২৮তম বৃহৎ অর্থনীতি। ২০৩৫ সালে ঢুকবে প্রথম ২৫টি দেশের তালিকায়। (তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবল ২০২১, সিইবিআর)

 

ইত্তেফাক/ইউবি