বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২, ৩ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিজয়ের শেষ মুহূর্তের কিছু ঘটনা

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২১:৫৫

মাত্র ৯ মাসে দখলদার বাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাজিত করে নজিরবিহীন আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন বিশ্বের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। এ রকম উদাহরণ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। 

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্বাধীনতাযুদ্ধ। প্রথমে প্রতিরোধপর্ব, দ্বিতীয়ত গেরিলা যুদ্ধ এবং সর্বশেষ ডিসেম্বরের ৩ তারিখে সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের মাত্র ১৩ দিনের মাথায় একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে। মার্চ মাসে যুদ্ধের শুরু থেকে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের আগ পর্যন্ত একটা দোলাচল ছিল—যুদ্ধ কত দিনে শেষ হবে, কত মাস বা কত বছর লাগতে পারে ইত্যাদি। 

কিন্তু ৩ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর প্রত্যক্ষ সামরিক অভিযান শুরু এবং ৬ ডিসেম্বর ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিদানের সঙ্গে সঙ্গে মনে হতে থাকে, সব মেঘ কেটে গেছে। অচিরেই আমরা বিজয় অর্জন করতে চলেছি। কিন্তু হঠাত্ করেই যেন প্রচণ্ড এক বজ্রপাত এবং পরে ভয়েস অব আমেরিকার সূত্রে খবর ছড়িয়ে পড়ে এই মর্মে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাহায্যার্থে প্রেসিডেন্ট নিক্সন আমেরিকার সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে অবস্হান নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। 

খবরটি রণাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ার পর সবার মনে একটা অনিশ্চয়তার কালো মেঘ এসে জমা হয়। সবার কপালে ভাঁজ, তাহলে কি শেষ হয়েও হইল না শেষ? আমরা কি ভিয়েতনামের মতো পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম? তবে রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর একের পর এক পরাজয় ও পিছু হটার খবর এবং ঢাকায় সংঘটিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে বিশাল ভূমিকা রাখে। প্রথম ঘটনাটি ৭ ডিসেম্বরের আর দ্বিতীয়টি ঘটে ১৪ ডিসেম্বর। প্রথম ঘটনার সময় ৭ ডিসেম্বর পূর্বাহ্ন। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মালেক ও পাকিস্তানি মিলিটারি কমান্ডার আবদুল্লাহ নিয়াজি আরো দুজন সিনিয়র অফিসারসহ গভর্নর হাউজের (বর্তমান বঙ্গভবন) একটি কক্ষে বসেছেন। গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করবেন। কিন্তু সবাই নিশ্চুপ, কেউ কিছু বলছেন না।

এর মধ্যে গভর্নর আবদুল মালেক নিয়াজিকে কিছু সান্ত্বনার কথা বলতে শুরু করেন। তাতেই বালির বাঁধের মতো নিয়াজি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় একজন বাঙালি মেসওয়েটার কিছু নাশতা ও কফি নিয়ে রুমে ঢুকে পড়েন এবং সব দৃশ্য দেখে ফেলেন। দ্রুত তাকে রুম থেকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাইরে এসে নিয়াজির কান্নার কথা তিনি অন্যদের কাছে বলে দেন। 

খবরটি সংবাদমাধ্যমে চলে যায়। ৯ অথবা ১০ ডিসেম্বর কোনো সূত্র উল্লেখ না করেই আকাশবাণী সংবাদটি প্রচার করে। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে ১৪ ডিসেম্বর। গভর্নর আবদুল মালেক ও জেনারেল আবদুল্লাহ নিয়াজিসহ উচ্চপর্যায়ের সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের এক গুরুত্বপূর্ণ সভা বসে গভর্নর হাউজে। সভা শুরু হওয়ার পরপরই বেলা ঠিক ১১টা ১৫ মিনিটে ভারতের মিগ যুদ্ধবিমান গভর্নর হাউজের ওপর আক্রমণ চালায় এবং বোমা বর্ষণ করে। তাতে মূল হলরুমের ছাদ ভেঙে পড়ে। আতঙ্কিত গভর্নর মালেকসহ সবাই দৌড়ে গিয়ে মাটির নিচে তৈরি গর্তে আশ্রয় নেন। সেটাই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক সরকারের শেষ দিন। 

১৪ ডিসেম্বর বিকালেই গভর্নর মালেকসহ উচ্চপদস্হ সব বেসামরিক কর্মকর্তা পাকিস্তানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে রেডক্রস নির্ধারিত নিরপেক্ষ জায়গা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আশ্রয় নেন। ১৪ ডিসেম্বর দুপুর ১২টায় আকাশবাণী থেকে খবরটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে সপ্তম নৌবহরের হুমকি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের সে কী উল্লাস, তা আজ বলে বোঝানো যাবে না। একাত্তরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে ঘিরে তখনকার দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনেতিক যুদ্ধ শুরু হয়। 

তখন সপ্তম নৌবহরের হস্তক্ষেপ অথবা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রসমূহের যে কোনো অপরিপক্ব পদক্ষেপে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রবল আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। আর সে রকম কিছু ঘটলে বাংলাদেশ কবে স্বাধীন হতো তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও এটা বলা যায় যে, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন সম্ভব হতো না। ৪ ও ৫ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ও ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য পরপর দুটি প্রস্তাব উত্থাপন করে। দুটি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো প্রয়োগ করে। 

৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ৭ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তানের শক্তিশালী ঘাঁটি যশোরের পতন ঘটে। চীনকে সামরিক অভিযানে যুক্ত করতে এবং সপ্তম নৌবহর নিয়োজিত করার জন্য ওয়াশিংটনে বসে হেনরি কিসিঞ্জার চীন সরকার ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে অনবরত দেনদরবার করতে থাকেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন ডেকে ১০৪-১১ ভোটে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস করিয়ে নেয়। ৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সন ফিলিপাইন-ভিয়েতনাম উপকূলে অবস্থিত সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন। 

পাকিস্তান বাহিনীর পরাজয় ও পতন রোধের জন্য নৌ, বিমান ও স্থল অপারেশন চালানোর সম্ভাব্য মিশন দেওয়া হয় সপ্তম নৌবহরকে। ৫ হাজার সৈন্য ৭৫টি জঙ্গি বিমান, মিসাইল ও ডেস্ট্রয়ারসহ ২৫টি অ্যাসল্ট হেলিকপ্টার নিয়ে সপ্তম নৌবহর টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে জানিয়ে দেয়, ভারত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হলে সপ্তম নৌবহর নিয়োগসহ শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আমেরিকার হুংকার মোকাবিলায় সোভিয়েত ইউনিয়ন পাঁচটি সাবমেরিনসহ ১৬টি যুদ্ধজাহাজ বঙ্গোপসাগর ও তার আশপাশে মোতায়েন করে। সব মহলে উদ্বেগ ও আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের গতিধারা এখন থেকে যে কোনো দিকে মোড় নিতে পারে। তবে অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শান্ত ও ধীরস্হির অবস্থায় তিনটি নির্দেশ প্রদান করেন। প্রথমত, সপ্তম নৌবহরের মিশন ব্যর্থ করার জন্য ভারতীয় নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের সব উপকূল জুড়ে শক্তিশালী নৌ ব্যারিকেড গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, যৌথ বাহিনীর সামরিক অগ্রযাত্রার গতি আরো বৃদ্ধি এবং দ্রুত ঢাকা দখল করতে হবে। 

তৃতীয়ত, সপ্তম নৌবহর সামরিক অভিযানে নামলে সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। পালটা ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তিনটি উদ্যোগ গ্রহণে সচেতন হয়। এক. জাতিসংঘের মাধ্যমে বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে ভারতকে বিচ্ছিন্ন করা। দুই. দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির অজুহাত দেখিয়ে সপ্তম নৌবহরকে পাকিস্তানের পক্ষে সামরিক অভিযানে নিয়োজিত করা। তিন. ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নামতে চীনকে সম্মত করা। ১২ ডিসেম্বর ভারতকে যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার চরম হুমকি দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। 

পালটা কৌশল অবলম্বন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনকে হুঁশিয়ারি বার্তা দেওয়ার জন্য চীনের উত্তর সীমান্তে ব্যাপক সৈন্যের সমাবেশ ঘটায়। ১২ ডিসেম্বরের চরম হুংকার ভারত উপেক্ষা করার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু তার জন্য চীনের সরাসরি সামরিক সংশ্লিষ্টতা আমেরিকার জন্য অত্যাবশ্যকে। 

কিন্তু ১২ ডিসেম্বর শেষ প্রহরে চীন অতি গোপনে আমেরিকাকে জানিয়ে দেয়, তারা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে যাবে না। তবে জাতিসংঘে পাকিস্তানের পক্ষে সব রকম সমর্থন দেবে। সব দিক থেকে সব রকমের সাহাঘ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানি কমান্ডার জেনারেল নিয়াজি ১৬ ডিসেম্বর বিকালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশ তখন পাকিস্তানের দখল থেকে মুক্ত।

লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক 

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন