বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক খাতগুলো কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। মূলত বেসরকারি খাত কিছু বড় প্রতিষ্ঠান নির্ভর। সরকারি সুরক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ বাজার সুবিধার মাধ্যমে এই বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বেড়ে উঠেছে। এ অবস্হা দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্হানের জন্য প্রতিযোগীসক্ষম নয় বলে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ পরিস্হিতিকে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতি ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘সিস্টেম্যাটিক কান্ট্রি ডায়াগনস্টিক-২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। দেশের অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্য আয়ের দেশে উপনীত হতে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সামনে প্রধানত কয়েকটি চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের দুর্বলতা অন্যতম। এতে তৈরি পোশাক শিল্পের এগিয়ে যাওয়ার উদাহরণ দেওয়া হলেও রপ্তানি পণ্যে অতি নির্ভরতার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং বাজার ব্যবস্হা নিয়েও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর কার্যক্রম বেশ ধীর। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ কম। একই ধরনের অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশে নতুন ব্যবসার আধিক্যও কম। বিস্তৃত বেসরকারি খাতের অভাব বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের অন্তরায়। কৃষি খাতে শস্য বৈচিত্র্যকরণও সীমিত, যা কৃষি উত্পাদনশীলতার গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে যেভাবে নগরায়ণ হচ্ছে, তা পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে উত্পাদনশীলতা ও অন্তভুর্ক্তি কমছে। ফলে নগর দারিদ্র্য বাড়ছে। নগরের পরিবেশের অবনতির ফলে জীবনমান ও স্বাস্হে্যরও অবনতি হচ্ছে। মানসম্পন্ন শিক্ষা, স্বাস্হ্যসেবাসহ অন্যান্য মৌলিক সেবায় বৈষম্য রয়েছে। বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো বাংলাদেশের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক সক্ষমতার সমস্যাও চ্যালেঞ্জ।
উল্লেখ্য, এর আগের কান্ট্রি ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট বিশ্বব্যাংক প্রকাশ করে ২০১৫ সালে। করোনা ভাইরাসের অভিঘাত মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়ানো, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ এবং ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে আগামী এক দশকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে, তা এবারের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশ স্হিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে দারিদ্র্য হার কমিয়েছে এবং মানবসম্পদের উন্নয়ন করেছে। এক দশক ধরে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছিল। করোনা ভাইরাসের কারণে কর্মসংস্হান তৈরি ধীর হয়ে যাওয়ায় দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমে এসেছে। এতে দেশব্যাপী বৈষম্য বাড়ছে। করোনা ভাইরাসের প্রভাব প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন দুটিকেই প্রভাবিত করেছে। এরপরও আগামীতে বাংলাদেশের সামনে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। রপ্তানিকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্হান তৈরির জন্য বাংলাদেশকে এখন কাঠামোগত রূপান্তরের নতুন স্তরে যেতে হবে।
কর্মসংস্হানের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশের এখনই কর্মপম্হা ঠিক করতে হবে। ডিজিটাল কার্যক্রম বা প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের দ্রুত বিকাশ এবং বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে অন্তভুর্ক্তি বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে। আঞ্চলিক সংযোগের সুবিধা বাংলাদেশের সামনে রয়েছে। চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে মোকাবিলা করা গেলে বাংলাদেশের উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর দ্রুত হবে বলে সংস্হাটি উল্লেখ করেছে।
