বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ব্যাংকিং ব্যবস্থা

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:৩৯

৫০ বছর আগে শূন্য থেকে উন্নয়নের অভিযাত্রা শুরু করেছিল লাল-সবুজের পতাকাখচিত এই বাংলাদেশ। যুদ্ধবিদ্ধস্ত এর সঙ্গে বন্যা, খরা, ঝড়ঝঞ্জাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন অর্থনীতি, আর্থসামাজিকসহ বেশির ভাগ সূচকে উদীয়মান একটি রাষ্ট্র। বর্তমানে দেশি-বিদেশি মোট ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়াত্ত ছয়টি, বিশেষায়িত তিনটি, বেসরকারি ৪৩টি (ইসলামী ব্যাংক ১০টি), পাঁচটি নন তপশিলি ব্যাংক, বৈদেশিক ব্যাংক ৯টি, এছাড়া নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৩৪টি। বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোর মোট শাখার সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার, আমানত ১৫ লাখ কোটি টাকা, ঋণ বিতরণ ১২ লাখ কোটি টাকা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন ডলার। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন এবং আর্থিক অন্তভু‌র্ক্তির বিভিন্ন প্রোডাক্ট উদ্ভাবনের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের আজকের এই অবস্হানে দাঁড়ানোর পেছনে রয়েছে অনেক আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের গল্প।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে তত্কালীন সরকারের প্রধানতম লক্ষ্য হয়ে ওঠে অর্থনীতিকে দাঁড় করানো এবং এর পুনর্গঠন। সেই লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অর্থনৈতিক পুনর্বাসন, পুনর্গঠন ও সংস্কারের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পুনর্গঠনের প্রতি মনোনিবেশ করেন।

১৯৭০ সালে সাইক্লোন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ধ্বংসলীলার কারণে দেশের অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়ে। ১৯৭০ সালে সাইক্লোনে তত্কালীন মোট জাতীয় উত্পাদনের ৩ দশমিক ৮০ শতাংশ বিনষ্ট হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা বা সোনা রিজার্ভ ছিল না। দেশের অর্থনীতি, উন্নয়নকাঠামো, আর্থিক কাঠামো, ব্যাংকব্যবস্হা পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে।

এ অবস্হায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পুনর্গঠন ছিল দুরূহ কাজ। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের নীতিনির্ধারণী কাজ, মুদ্রাবিষয়ক ব্যাংকিং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতো পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে। স্বাধীন বাংলাদেশে তত্কালীন স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঢাকা শাখাই ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ নামে স্বাধীন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে আবিভূ‌র্ত হয়। ব্যাংকব্যবস্হা পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক গতি চালু করার জন্যই ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক গঠন করা হয়। এই আদেশ কার্যকর করা হয় ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ থেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম প্রশাসক নিযুক্ত করা হয় মুশফেক-উস-সালেহীন এবং ১৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ প্রথম গভর্নর নিযুক্ত করা হয় এ এন হামিদুল্লাহকে। কোনো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সোনা রিজার্ভ ছাড়া এবং পাকিস্তানিদের রেখে যাওয়া ৩৫৮ কোটি টাকা দায় মাথায় নিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের যাত্রা।

পাকিস্তানের বিরোধিতা সত্ত্বেও এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ লাভ করেছিল এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে জমা দেওয়ার জন্য চাঁদা বাবদ ২০ লাখ ডলার মূল্যের সোনা কানাডা সরকারের কাছ থেকে ক্রয় করেছিল। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল, ফলে স্টার্লিং এলাকার সদস্য হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্যপদ লাভ করেছিল। এই তহবিল থেকে নিজস্ব ভাগ বা কোটা এবং প্রত্যাহার বা ড্রইংয়ের অধিকার দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার ছয় মাসের মধ্যে ৯৫ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছিল।

স্বাধীনতার আগে মোট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল ২২টি। এর মধ্যে তিনটি বিদেশি ব্যাংক, পাঁচটি ভারতীয় ব্যাংক, ১০টি অবাঙালি পাকিস্তানি মালিকানাধীন, দুটি বাঙালি মালিকানাধীন ব্যাংক এবং দুটি সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক। ২২টি ব্যাংকের মধ্যে অবাঙালি পাকিস্তানি মালিকানাধীন ১০টি ব্যাংক এবং বাঙালি মালিকানাধীন দুটি ব্যাংক রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী জাতীয়করণ করা হয়। ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন ছিল বাঙালি মালিকদের; বাকিগুলো ছিল অবাঙালি পাকিস্তানিদের। জাতীয়করণ থেকে বাদ দেওয়া হয় তিনটি বিদেশি ব্যাংক এবং পাঁচটি ভারতীয় ব্যাংক। ভারতীয় পাঁচটি ব্যাংক ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর অকার্যকর ছিল।

১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকার প্রতিষ্ঠা করে—১. বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্হা ও ২. বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে আরো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকার প্রতিষ্ঠা করে—বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) স্হাপিত হয় ১৯৭৪ সালে।

উল্লেখিত ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংক দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালায়। দেশের জনসাধারণের কাছে সঞ্চিত অর্থ জমাকরণ এবং জমাকৃত অর্থ উত্পাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাকা গতিশীল করার জন্য ব্যাংকের শাখার পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহের জন্য এই দশকেই সরকারি ব্যাংকগুলো শাখা বিস্তার শুরু করে। সত্তরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে মোট ১২টি ব্যাংকের শাখার সংখ্যা ১ হাজার ৬০০ ছাড়িয়ে যায় এবং ১৯৮০ সালে এর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮০০-এর ওপরে। এই শাখা বিস্তারে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোই মূলত ভূমিকা রাখে, যা ছিল মোট ব্যাংকিং শাখার প্রায় ৮৮ শতাংশ। বিশেষত সত্তরের দশকের শেষ দিকে ব্যাংকিং খাতের গ্রামীণ শাখার সংখ্যা খুব জোরেশোরে বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। এক্ষেত্রে ঐ সময়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকও বিশেষ তহবিল গঠন করেছিল। 

ইত্তেফাক/কেকে