ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলের মধ্যে ছাত্রী হল পাঁচটি। এ পাঁচটি হলে আবাসিক হয়ে ওঠার সময় ২৭টি ধারার একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়। এসব নিয়ম শুধুমাত্র পাঁচটি ছাত্রী হলে কার্যকর। বাকী ১৩টি ছাত্র হলে নেই কোন নিয়ম, নেই কোন অঙ্গীকারনামা। ছাত্রী হলের এসব নিয়মের মধ্যে একটি ধারায় উল্লেখ আছে—‘কোনো ছাত্রী বিবাহিত হলে অবিলম্বে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। অন্যথায় নিয়ম ভঙ্গের কারণে তাঁর সিট বাতিল করা হবে। শুধু বিশেষ ক্ষেত্রে বিবাহিত ছাত্রীকে হলে থেকে অধ্যয়নের সুযোগ দেওয়া হবে। অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রী হলে থাকতে পারবেন না।’
সম্প্রতি পাঁচ হলের আবাসিক ছাত্রীরা অঙ্গীকারনামার এসব নিয়মকে ‘অদ্ভুত ও আদিকালের’ আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আবাসিক শিক্ষক বলেন, ছাত্র হলের আবাসিক শিক্ষকরা বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে প্রশাসনিক কার্যক্রম ছাড়া আর কোন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেনা৷ ছাত্রদের খোঁজ নেয়া, তাদের শিক্ষার মান যাচাই, হলে অবস্থানের বিষয়ে অবগত হওয়া, অছাত্রদের হল থেকে বের করার কোন কাজই তারা করেনা। কিন্তু একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী হলের ছাত্রীদের জন্য যতসব নিয়ম করে রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নিয়মহীন হল জীবন পরিচালনা করছে আরেকটি অংশ কঠোর নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ থাকছে।
ছাত্র হলের একজন সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছাত্র হলের জন্য কোন নিয়ম নেই বলে জানান। তিনি বলেন, প্রথম বর্ষে ছাত্রদের ভর্তি করানোর সময় আমরা তাদের ঠিকানা নেই। অঙ্গীকারনামা বলতে ছাত্রের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা সঠিক কিনা সে বিষয়ে অঙ্গীকার নেয়া হয়। কিন্তু কোন ধরনের নিয়মের জন্য জন্য কোন অঙ্গীকারনামা ছাত্রদের হলে নেই।
এসব নিয়ম বাতিলসহ চার দাবিতে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের কাছে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছে ছাত্রীদের একটি প্রতিনিধিদল। দাবিগুলো হলো—বিবাহিত ছাত্রীদের হলে থাকার যে বিধি-নিষেধ এবং তাঁদের জন্য প্রচলিত যে নিয়ম তা বাতিল করতে হবে; শিক্ষার্থীদের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মর্যাদা রক্ষার্থে সব ছাত্রী হলে ‘লোকাল গার্ডিয়ান বা স্থানীয় অভিভাবক’-এর পরিবর্তে ‘জরুরি যোগাযোগ’ শব্দের প্রবর্তন করতে হবে; আবাসিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাধ্যমে হয়রানি বন্ধে তা করলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে; শিক্ষা কার্যক্রম চলমান থাকা সাপেক্ষে অনাবাসিক ছাত্রীদের হলে প্রবেশের অধিকার পুনর্বহাল এবং জরুরি প্রয়োজনে তাঁদের হলে থাকতে দিতে হবে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল এবং শামসুন্নাহার হলের দুই ছাত্রীর সিট দেওয়া নিয়ে এই আলোচনা শুরু হয়েছে। বিবাহিত হওয়ায় বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল কর্তৃপক্ষ ছাত্রীর সিট কেটে দেয়। শামসুন্নাহার হলে ছাত্রীর বড় বোন বিবাহিত হওয়ায় ও হলে অবস্থান করায় ছোট বোনকে সিট দেওয়া হচ্ছে না। একপর্যায়ে একই হলে থাকা ওই ছাত্রীর বিবাহিত বড় বোন সিট ছেড়ে দিলেই শুধু তিনি সিটে উঠতে পারবেন—এমন শর্ত দেওয়া হয়। এর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও প্রতিনিধিদলের সদস্য সাগুফতা বুশরা মিশমা বলেন, অনেক ছাত্রীর বিবাহ গ্রামে হয়। সেক্ষেত্রে হল থেকে ছাত্রীদের নামিয়ে দেয়া হলে তাদের যাওয়ার জায়গা থাকে না। প্রকৃতপক্ষে বিবাহিত জানলেই সিট কেটে দেয়। তবে লিখিত নিয়মে আছে, বিশেষ বিবেচনায় থাকতে পারবেন। আর অন্তঃসত্ত্বা কোনো নারী হলে থাকতে পারবেন না। এটি একটি অমানবিক বিষয়। বর্তমান সময়েও এ নিয়ম থাকার কোনো মানে হয় না। আমরা এ নিয়ম বাতিলের দাবিতে উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আশা করি, তিনি যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।
দাবির বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেছেন, 'আমাদের পূর্বপুরুষরা মূল্যবোধ ও সামাজিক দিক বিবেচনায় নিয়মগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সেখানে অনেক ভালো নিয়মও আছে। তবে বর্তমান সময়ে তা যৌক্তিক কি না, সেটা পর্যালোচনার দাবি রাখে। শিক্ষার্থীদের লিখিত আবেদন পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলবো আমরা। একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় এ বিষয়ে আলাপ করতে হবে। সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এ নিয়ম বলবৎ থাকবে।'
