পাবনায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন নিয়ে সংঘাত থামছে না। নির্বাচন ঘিরে প্রথম ধাপ থেকে শুরু হয়ে চতুর্থ ধাপ না পার হতেই প্রচার-প্রচারণা, অন্তকোন্দল, অভ্যন্তরীণ বিরোধ আর আধিপত্য বিস্তারের জেরে চার জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় দফায় এক জন ও চতুর্থ দফায় তিন জন খুন হয়েছেন। এর বাইরে সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ ৪০ জনের বেশি ব্যক্তি আহত হয়েছেন। শতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। প্রথম ও তৃতীয় দফার নির্বাচনে একাধিক সংঘর্ষ হলেও মারা যাননি কেউ। আগামী ২৬ ডিসেম্বর চতুর্থ দফার ভোটকে সামনে রেখে চলছে প্রচারণা।
গত ১১ ডিসেম্বর সকালে পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের ভাঁড়ারা গ্রামের মোজাম্মেল হক খানের ছেলে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ইয়াসিন আলম (৩৫) সংঘর্ষে মারা যান। এ দিন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী সুলতান মাহমুদের কর্মী-সমর্থকেরা প্রচার-প্রচারণায় বের হয়। সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সুলতান মাহমুদের চাচাতো ভাই ইয়াসিন আলম। এ সময় নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবু সাঈদ খান ও তার কর্মী-সমর্থকেরাও বের হয়। উভয়পক্ষের সঙ্গে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কমপক্ষে ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। এদের মধ্যে আহত স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়াসিন আলম মারা যান। পরিবারের পক্ষ থেকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবু সাঈদ খানকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকলেও চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে গ্রামবাসী। এদিকে এই ঘটনার কারণেই নির্বাচন কমিশন ভাঁড়ারা ইউনিয়নের সব পদে নির্বাচন স্হগিত ঘোষণা করেছেন। অপরদিকে গত ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় একই উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে নিহত হন আটঘরিয়াপাড়া গ্রামের নায়েব আলীর ছেলে কলেজছাত্র নাছিম আহমেদ (১৭)। এখানে গুলিবিদ্ধসহ আহত হন আরো অন্তত ১০ জন। এ ঘটনায়ও মামলা হয়েছে। পুলিশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছে।
এদিকে পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার দেবোত্তর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রচারণা ও গণসংযোগে নৌকার সমর্থকদের হামলায় সেলিম হোসেন (৩৫) নামের এক যুবকের মৃতু্য হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর বিকাল ৪টার দিকে তার মৃতু্য হয়। ঘটনার পর শনিবার সন্ধ্যায় নিহত সেলিমের লাশ নিয়ে উপজেলার দেবোত্তর বাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে এলাকাবাসী। মৃত সেলিম হোসেন উপজেলার দেবোত্তর ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের জমসেদ আলীর ছেলে। এ সবের আগে গত ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনকে সামনে রেখে পাবনার সুজানগর উপজেলার ভায়না ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দুই পক্ষের সংঘর্ষে সবুজ হোসেন (৩৫) নামের একজন নিহত হন। গত ৯ নভেম্বর রাতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্হায় তার মৃতু্য হয়। তার আগে ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় নৌকার প্রার্থী আমিন উদ্দিন আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ওমর ফারুকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হন সবুজ। নিহত সবুজ চলনা গ্রামের হাচেন আলীর ছেলে। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী ওমর ফারুকের সমর্থক ছিলেন।
পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স বলেন, ‘বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তি কেন্দ্রিক ঘটনাগুলোই রাজনৈতিক রং দিয়ে একটি শ্রেণি ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।’ জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল রহিম লাল বলেন, ‘আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কারণে ইউপি নির্বাচনে সংঘাতের সৃষ্টি হচ্ছে।’ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাসুদ আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নজরদারির সঙ্গে কাজ করছি। প্রতিটি ইউনিয়নে একজন ইন্সপেক্টরের নেতৃত্বে আলাদা টিম করে দেওয়া হয়েছে। তারা সেই ইউনিয়নে ভোটের আগে থেকেই কাজ করছে। এখন এর মধ্যে কোনো জায়গায় হঠাত্ করেই সংঘর্ষ বা হত্যার ঘটনা ঘটলে সেটা কীভাবে প্রতিহত করা যাবে। আগে থেকেই তো আর সবকিছু জানা যায় না।’ জেলা সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, কয়েকটি ধাপে নির্বাচন শান্িতপূর্ণ পরিবেশে শেষ হয়েছে। আগামী ২৬ ডিসেম্বর চতুর্থ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভাঁড়ারা ইউনিয়ন ছাড়া পাবনা সদর, আটঘরিয়া পৌরসভা ও ইউনিয়ন এবং ভাঙ্গুড়া উপজেলার ইউনিয়নগুলোতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়ন পরিষদের সব পদের নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১১ ডিসেম্বর সকালে দুই পক্ষের নির্বাচনি প্রচারণায় সংঘর্ষে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নিহতের ঘটনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
