নিয়োগী গৃহ বলতে এখন অস্হায়ী আশ্রয়স্হল। কারো জায়গা হয়নি নিজ পরিবারে। জীবন্ত লাশের বুকে হাহাকারের ঝড়োবাতাসে ওরা বাকরুদ্ধ। এভাবে আর কতদিন? বাঁচতে হলে লড়াই করেই বাঁচতে হবে। এসব ভাবে অস্হায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের মেয়েরা। ভাবে রুখসানা। কখনো বিগলিত অশ্রুতে বুক ভেসে যায়। আবার শান্ত হয়। এক বছর তো হয়ে গেল! ঢাকার রাস্তা মুখর বিজয়ের কেতন উড়িয়ে।
বিধ্বস্ত নগরের রাজপথে বিজয়ানন্দের মিছিল। অস্হায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের মৃতপ্রায় মেয়েগুলোর বুকে কান্নার ঝড়। এই বিজয়ানন্দের স্লোগান ওদের বুকের ঝড়কে আরো তুমুল বেগে উসকে দেয়। সব জানালা বন্ধ করে ওরা বরফের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। দুপাশের দুটি জানালার একটি করে পাট খুলে ওরা বাইরের হাজার হাজার মানুষের উল্লাস দেখে। তাদের একজন আমিনা। সে হাসে। সে সারা দিনই হাসে। রাতেও হাসে। ঘুমেও হাসে। খেতে বসেও হাসে। বাথরুমে গিয়েও হাসে। শুধু ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ালে হাসে না, ঘুমিয়ে থাকে। আর রুখসানা একটি জানালার পাট খুলে নিষ্প্রভ নিরুত্তাপ দৃষ্টি মেলে নির্বাক চেয়ে থেকে ১৯৭৩ সালের সকালের হালকা কুয়াশার স্তরে ঝলমলে রোদ দেখে আর ভাবে এখানে আর কতকাল? একদিন রুখসানা বের হয় চাকরির সন্ধানে। লেখাপড়া তো কম নয়। বিএ পাস। স্বাধীন দেশে প্রতিটি অফিসেই জনবল প্রয়োজন। দরখাস্ত দিলেই ডাক পড়ে। দুটি ইন্টারভিউ দিয়েছে। চাকরি হয়নি। আজকে আবার ডাক...
বোর্ডে চারজন একদিকে। রুখসানা অন্যদিকে। কথোপকথন চলছে। একে বলা হয় চাকরির সাক্ষাত্কার। শুনেছি ক্যাম্পে মেয়েরা নির্যাতিতা হয়েছে। কেমন নির্যাতন হতো? আসলে জানার ইচ্ছে থেকে প্রশ্নটি করলাম, জনৈক বোর্ড মেম্বার বললেন। প্রশ্নটি কি ব্যক্তিগত হলো না? না, ব্যক্তিগত কেন হবে? ক্যাম্পের ধারণা, জাস্ট অভিজ্ঞতার জন্য। রুখসানার মাথার রগগুলো ফুলে ওঠে। দাঁড়িয়ে বলল, বলে আর কী লাভ? বরং দেখাই। কথা শেষ করে, বুকের আঁচলটা ফেলে ব্লাউজের বোতাম খুলতে উদ্ধত হলে আরেকজন বলল, প্লিজ থামুন। দেখাতে হবে না। রুখসানা শাড়ির আঁচল দিয়ে সম্ভম ঢেকে বলল, তোরা পাকিস্তানি হানাদারদের চেয়েও ভয়ংকর। প্রতিটি অফিসে ঝিম ধরে আছিস আর আমাদের মতো সর্বস্বহারা নারীদের দেখলেই ফণা তুলিস। তোরা ভয়ংকর গোখরা। ওয়াক থু... রুখাসানা বের হয়ে আসে। পথে নেমে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশটি যেন আরো বড় হতে থাকে, অসীম থেকে অসীমতর...

