প্রজন্মের ভাবনায় ইত্তেফাক

দীর্ঘ ৬৮ বছর পেরিয়ে ৬৯ এ পা রাখলো দেশের ইতিহাসের সাক্ষী সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কয়েকজন তরুণ জানিয়েছেন ইত্তেফাকের প্রতি তাদের অনুভূতির কথা।

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৩:৫৯

ইত্তেফাকের সাথে প্রথম পরিচয় একদম ছেলেবেলায়। একবার আমাদের স্কুলের শিক্ষক মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়াতে গিয়ে স্মরণ করেছিলেন কিংবদন্তী সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার কথা। গল্পে গল্পে তুলে ধরেছিলেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে জড়িয়ে থাকা দৈনিক ইত্তেফাকের কথা। সেই থেকে ইত্তেফাক নামটাকে ঘিরে ভালো লাগার শুরু। কলেজ জীবনে এসে প্রায় প্রতিদিনই ১ নম্বর রামকৃষ্ণ মিশন রোডে অবস্থিত ইত্তেফাকের পুরনো অফিসটার সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করতাম। সময়ের প্রয়োজনে ইত্তেফাক ততোদিনে নতুন অফিসে স্থানান্তরিত হয়ে গিয়েছে। তবে জায়গাটি ঘিরে অদ্ভুত একটা মুগ্ধতা কাজ করতো সব সময়।
বাঙালির সুখে-দুঃখে, উৎসবে-পার্বনে কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার ঘোর অনিশ্চিত সময়ে—গণমাধ্যম হিসেবে ইত্তেফাক তার দৃপ্ত পদচিহ্ন রেখেছে সব সময়। আর তাই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি প্রান্তে আজও ইত্তেফাক সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এদেশের গণমানুষের মত প্রকাশের সবচাইতে বড় মাধ্যম হয়ে উঠুক ইত্তেফাক। সমৃদ্ধ ইতিহাসকে ধারণ করে এগিয়েযাক সম্ভাবনাময় আগামীর পথে। তরুণ প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকুক ইতিহাসের এক জীবন্ত আর্কাইভ। 
৬৮ বছর পেরিয়ে ৬৯ এ পা রাখছে ভালোবাসার ইত্তেফাক। এই প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে ইত্তেফাকের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি।
_তাসনিমুল হাসান উদয় 
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 



ইত্তেফাক কেবল একটি পত্রিকা নয় বরং বাঙালীর জাতীয় ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িয়ে থাকা এক আবেগের নাম।
ভাষা সংগ্রামের পরপর যাত্রা শুরু করা ইত্তেফাক মুক্তিযুদ্ধের সময় সাহসী ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়ে এসেছে। “দখলদার পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ: সোনার বাংলা মুক্ত”—একাত্তরের ইত্তেফাকের এই প্রথম পাতার শিরোনাম আজও শিহরিত করে যেকোনো বাঙালিকে। প্রাচীন পত্রিকা হলেও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সব প্রজন্মের পাঠকের অভিন্ন মঞ্চ হয়ে উঠেছে ইত্তেফাক। তুমুল জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছে শিশুদের জন্য কচি কাঁচার আসর, তরুণদের জন্য প্রজন্ম কিংবা তরুণকন্ঠ সহ অন্য সব ফিচার পাতা।
রাজধানী ঢাকায় আমার একটি প্রিয় সড়ক মানিক মিয়া এভিনিউ। ছোটবেলায় এই সড়কের নামকরণের গল্প জানতে গিয়ে ইত্তেফাক সম্পর্কে প্রথম বিস্তারিত জানি। শ্রদ্ধেয় তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার এই সড়ক যত দীর্ঘ তার চেয়েও দীর্ঘ তার প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার পাড়ি দেয়া পথ। দীর্ঘ ৬৮ বছর পেরিয়ে আজ ৬৯-এ পা রাখছে প্রিয় ইত্তেফাক। এই মহান যাত্রা নিরন্তর হোক এই প্রত্যাশা করি।
—আরিফুল হাসান শুভ
শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

 



বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাস এবং দৈনিক ইত্তেফাকের পথচলা একই সূত্রে গাঁথা; একই সুর, অভিন্ন আবেদন। ‘ইত্তেফাক’ একটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘ঐক্য বা একত্রে বা মিলেমিশে কাজ করা। কালের আবহে বারবার-ই প্রমাণিত হয়েছে নামকরণের যথার্থতা। জনগণের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে বস্তুনিষ্ঠ, সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের প্রকাশে দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সেই সৃষ্টি লগ্ন থেকে। কঠিনতম সময়কে জয় করে, শত কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে অসংখ্য চড়াই-উত্রাই শেষে এখনো সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আজকের দৈনিক ইত্তেফাক। পাকিস্তানের ২৪ বছরের ইতিহাসে শাসন-শোষণ-নিপীড়ন-নির্যাতন অসহ্য অসহনীয় হয়ে উঠলে ফুঁসে উঠে বাঙালী। তখন অস্ত্রের মুখে স্বাধিকারের ডাকে প্রকম্পিত করে তোলে আকাশ-বাতাস। আর সেই রণধ্বনির প্রকম্পনকে স্ফুলিঙ্গের মোত প্রজ্বলিত করেছিল আজকের দৈনিক ইত্তেফাক।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার হয়েছে। পরিবর্তন এসেছে নানা বিষয়ে। বিবর্তন ঘটছে গণমাধ্যমের। বহুমুখী প্রতিযোগিতার সাথে তাল মেলাতে না পরে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক পত্রিকা। কিন্তু প্রতিযোগিতার এই জোয়ারেও দৈনিক ইত্তেফাক খানদানী পত্রিকা হিসাবে এখনো তার নিজেস্ব স্বকিয়তাকে ধরে সুনামের সাথে টিকে আছে। গৌরবের ৬৮ বছর পেরিয়ে ইত্তেফাক পা রেখেছে ৬৯ এর কাতারে। এই শুভক্ষণে প্রত্যাশা থাকবে ইত্তেফাক তার অতীতের ঐতিহ্যকে ধারণ করে আগামীতেও এদেশের জনমানুষের মুক্তি ও কল্যাণে কাজ করে যাবে। আজকের এই দিনে ইত্তেফাকের সকল লেখক, পাঠক, সম্পাদক ও প্রকাশের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে হৃদয় নিংড়ানো শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
—শাকিরুল আলম শাকিল
শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

 



আজকালকার ছেলেমেয়েদের কাছে ইত্তেফাক হয়তো নিছক একটি পত্রিকা কিন্তু আমরা যারা নব্বই দশকে কিংবা তারও আগে জন্মেছি, তাদের জন্য ইত্তেফাক একটি আবেগের জায়গা। আমার মায়ের ভাষ্যমতে, তিনি ছোট থেকে দেখে আসছেন, আমার নানুর বাসায় সকাল শুরু হয় ইত্তেফাক পত্রিকার সাথে কারণ আমার নানা বলতেন, তৎকালীন সকল পত্রিকার মাঝে ইত্তেফাকই সবচেয়ে নির্ভুল এবং নিরপেক্ষ সংবাদ সবার আগে প্রকাশ করত। মা এখন পর্যন্ত ছোটবেলার কথা বলতে গেলেই, 'দাদাভাই' নামটা খুব স্মরণ করেন। ইত্তেফাকের সাথে আমারও পরিচয় একদম ছোট্টোবেলা থেকে। সবেমাত্র কিন্ডারগার্টেনে পড়ি, সে সময়ই শুক্রবার এলে ছুটে যেতাম নানুর বাসায়, কচি-কাঁচার আসরের জন্য। আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বড় হওয়ার সাথে সাথে ইত্তেফাকও যেন বড় হতে লাগলো, আমরা যখন অফলাইন ছেড়ে অনলাইনে বেশি সক্রিয় হলাম, ইত্তেফাকও তখন ছাপাখানার পাশাপাশি প্রবেশ করল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ইত্তেফাকেও আসলো লাইফস্টাইল ও টেক পাতা এবং তার সাথে যোগ হল প্রজন্ম আর ক্যাম্পাসের মত তরুণ কেন্দ্রিক পাতা। পুরনো ঐতিহ্য বজায় রেখে ইত্তেফাকের এই আধুনিক হওয়ার যাত্রাটা আসলেই খুব প্রশংসনীয়।
—সাদিয়া তাসমিয়া
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

আমরা একটা দারুণ সময় পার করছি। কেন বলছি দারুণ সময়? আমরা দু’টি যুগের মেলবন্ধন প্রত্যক্ষ করেছি চোখের সামনেই। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদনসহ প্রায় সবকিছুই চিরচেনা ‘অফলাইন’ মাধ্যম থেকে ‘অনলাইন’ মাধ্যমের দিকে ধাবিত হয়েছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে ইত্তেফাকেও। বাঙালি ও বাংলাদেশিদের ইতিহাসের নানা ঘটনার সাক্ষী এই পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণ হয়েছে, ফলে মুহূর্তেই কোনো খবর পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে।
ইত্তেফাকে বয়স্কদের পাশাপাশি তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, ইত্তেফাককে নতুন প্রজন্মের জন্য সাজানো হচ্ছে— ঠিক যেন দুই প্রজন্মের মেলবন্ধনেরই প্রতিচ্ছবি। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ইত্তেফাকের এই অগ্রগতি অব্যাহত থাকুক—এই কামনা।
—ইমরান হোসেন
শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 



আমাদের প্রজন্ম অনেক বৈচিত্র্যময়। আমরা যেমন দেখেছি একসময়ের প্রযুক্তিহীন বাংলাদেশ, তেমনি দেখছি হাজারটা নিত্যনতুন প্রযুক্তির এই একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে - আবির্ভাব হয়েছে কত নিত্যনতুন পত্রিকার। কিন্তু ১৯৫৩ সালে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ইত্তেফাক এখনো স্বমহিমায় উদ্ভাসিত।
যেই পত্রিকাটার বয়স আমার দেশটার চেয়েও বেশি, যেই পত্রিকাটা আমার প্রিয় দেশটার সংগ্রাম ও স্বাধীনতার গল্পগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেই পত্রিকাটার প্রতি ভালোবাসা সত্যিই প্রকাশ করার মতো নয়। সময় গড়িয়েছে, ইত্তেফাক পেরিয়েছে ৬৮টি গৌরবোজ্জ্বল বছর। অফলাইন থেকে বিস্তৃত হয়ে এসেছে অনলাইনে, যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন পাতা, নতুন নতুন গল্প।
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গল্পের কারিগর এই পত্রিকাটা এখনো রোজ ভোরে পুরো বাংলাদেশের গল্প ছাপায়। সাধারণ মানুষের গল্প, প্রযুক্তির গল্প, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে গল্প, খেলাধুলা কিংবা তরুণ প্রজন্মের গল্প। ইত্তেফাকের হাত ধরে বদলেছে কত হাজারটা গল্পের রং। বদলেছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট। দেশের আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা সম্ভবনাময় তরুণ প্রজন্মের গল্পগুলো ইত্তেফাকের হাত ধরেই পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। এখনো তো স্বাধীন বাংলাদেশের হাজার বছরের গল্প লিখা বাকি! কয়েকটা প্রজন্ম ধরে ভরসার প্রতীক হয়ে টিকে থাকা প্রিয় ইত্তেফাক আরো হাজার বছর ধরে বাংলাদেশের বুকে আলো ছড়াবে- এটাই প্রত্যাশা।
—মো. আরিফ হাসান
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন