ইত্তেফাক আমার প্রিয় পত্রিকার মধ্যে অন্যতম একটি। দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, এতিহ্যের সঙ্গে ইত্তেফাক সম্পৃক্ত। এখনো ইত্তেফাক সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সততা, নিষ্ঠা বজায় রেখে আসছে—এটাই আসলে অনেক বড় কিছু।
ইত্তেফাক পরিবারের সবার জন্য আমার শুভ কামনা। আর আমি এই মুহূর্তে দেশের বাইরে লন্ডনে আছি। আমার মেয়ে তানি এবং তার দুই সন্তানের সঙ্গে আমার সময় কাটছে। এখানে বিজয় দিবসের আগে একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুত্বের ৫০ বছর উপলক্ষ্যে মৈত্রী দিবস উদযাপিত হয়েছে লন্ডনে।
লন্ডনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও ভারতের রাষ্ট্রদূতের যৌথ উদ্যোগে লন্ডনের হোটেল ম্যারিয়টে বিশেষ এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। খুব সীমিতসংখ্যক বিশিষ্টজনই এই অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানেই আমি শিবদাস ব্যানার্জির লেখা ও ভূপেন হাজারিকার সুর করা ও গাওয়া ‘গঙ্গা আমার মা’ গানটি প্রথম পরিবেশন করি। পরবর্তীকালে আমার গাওয়া জনপ্রিয় গান ‘দামা দাম মাস্কালান্দার’ গানটি পরিবেশন করি। উপস্থিত সবাই বেশ মুগ্ধ হয়েছিলেন। শুধু এই দুটি গানই করার জন্য আমাকে বিশেষভাবে বলা হয়েছিল। তাই এই দুটি গানই পরিবেশন করেছি। দুটো গান শুনেই সবাই মুগ্ধ হয়েছেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বের ৫০ বছর উপলক্ষ্যে এই আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমিও ভীষণ সম্মানিত বোধ করেছি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং ভারতের রাষ্ট্রদূত দুজনের প্রতিই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ধন্যবাদ এই আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে। করোনা মহামারির কারণে গত দেড় বছর খুব বেশি জরুরি কাজের বাইরে আমি একদমই বাসা থেকেই বের হইনি। দুবার বের হয়েছিলাম কোভিড-১৯-র টিকা দেওয়ার জন্য। আরেকবার আরেকটি জরুরি কাজে বের হয়েছিলাম।
এছাড়া দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করার জন্য বের হয়েছিলাম। এছাড়া আর বের হইনি। কারণ, আমার কাছে মনে হয়েছে আমার বাইরে যাওয়ার চেয়ে ঘরে থাকাটাই বেশি নিরাপদ। যে কারণে বাসাতেই ছিলাম। তবে মাঝে আলমগীর সাহেবের করোনা হওয়ায় একটু উদ্বিগ্ন ছিলাম। আল্লাহর রহমতে এখন তিনি বেশ ভালো আছেন, সুস্থ আছেন। আলহামদুলিল্লাহ। ঘরে বসে আসলে নানান ধরনের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকি। কখনো গানের সুর করি, কখনো গান শুনি, টিভি দেখি, বই পড়ি। সিনেমা দেখারও অভ্যাস রয়েছে আমাদের দুজনেরই।
মাঝে মাঝে আমার মেয়ের সঙ্গে কথা বলি, এটাতো আসলে সেভাবে বলার কিছু নেই। সত্যি বলতে কী আমাদের দেশে কিন্তু মেধাবী অনেক শিল্পী আছেন। কিন্তু তাদেরকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। তাদেরকে কাজে লাগানো হচ্ছে না বলেই তাদের মেধার বিকাশ ঘটছে না। তার পরও কেউ কেউ আছেন নিজেদের মেধা বিকাশের জন্য নিজের মতো করেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সাধুবাদ জানাতেই হয়। তবে আমি বিশ্বাস করি যেসব মেধাবী শিল্পী আছেন, তারা ভালো সুযোগ পেলে নিজেদের মেধা প্রকাশ করতে পারবেন।
একজন ভালো ইনভেস্টর প্রয়োজন। আবার এটাও সত্যি যে, এই প্রজন্মের শিল্পীদের মৌলিক গানের খুব অভাব। যে কারণে তাদের নির্দিষ্ট কয়েকটি গানের বাইরে আমাদের গানগুলোই সাধারণত গেয়ে থাকেন। এটা খারাপ বলছি না আমি। কিন্তু তার পরও নিজেদের মৌলিক গানের সংখ্যা বাড়াতে হবে। নিজেদের যথাযথভাবে তৈরি করেই মৌলিক গানের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
আমি রুনা লায়লা, আমি একজন গায়িকা। এর বাইরে আমি কিছুদিন আগে থেকে সুর করছি। সুরকার হিসেবে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতিও পেয়েছি। দেশের অনেক শিল্পী যেমন আমার সুরে গান গেয়েছেন, ঠিক তেমনি দেশের বাইরেরও অনেক প্রতিথযশা শিল্পী আমার সুরে গান গেয়েছেন।
আমি এখনো গান শেখার চেষ্টা করি। কোনো ওস্তাদ বা পণ্ডিত পর্যায়ের আমি কেউ নই যে, কোনো প্রতিষ্ঠান করে আমি গান শেখাব। বরং এটা হতে পারে, সরকারি পর্যায়ে কোনো উদ্যোগ নিয়ে কোনো গানের প্রতিষ্ঠান করা হলে তার সঙ্গে আমি কোনো-না-কোনোভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারি। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে ইউসুফ, ইমরান, ন্যান্সি, কনা, লুইপা, হৈমন্তী, ঝিলিক, কোনাল ভালো করছে। তারা সত্যিই খু-উ-ব ভালো গায়। নিজেদের প্রতি আরো যত্নশীল হলে তারা আরো ভালো করবে বলে আমার বিশ্বাস। এই প্রজন্মের যারা সুর করছেন তাদের সুর করা অনেকেরই গান আমার শোনা হয় না। তবে বাপ্পা মজুমদার খু-উ-ব ভালো করছে। তার সুর আমাকে মুগ্ধ করে।
যারা ভালো করছেন অর্থাৎ আগেই বলেছি আমি তাদের নাম, তাদেরকে নিয়েই কাজ করতে চাই। আগামীদিনে আরো নতুন কিছু প্রজেক্ট আছে। হয়তো যাদের নাম বলেছি তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ থাকবেন। সংগীত জগতকে ঘিরে আমার মাঝে কোনোই অপূর্ণতা নেই। এক জীবনে আল্লাহর অশেষ রহমতে সত্যিই অনেক কিছুই পেয়েছি আমি। মনে-প্রাণে মানুষের ভালোবাসা, দোয়ায় আমি পরিপূর্ণ। এখানে আমার অপূর্ণ কিছু নেই। আমি মনে করি এখন আমার আসলে দেওয়ার সময়। যত দিন বাঁচি আমাদের দেশের সংগীতাঙ্গনকে ভালো কিছু দিয়ে যেতে চাই। একটি কথা প্রায়ই শুনতে হয় যে, আমি আর কখনো অভিনয় করব কি না। না, আর অভিনয় করা সম্ভব নয়। তবে সুর করার ইচ্ছে আছে। অনেক ভালো ভালো কিছু সুর সৃষ্টি করে যেতে চাই।
দর্শকের কাছে আলমগীর সাহেব সবার প্রিয় একজন নায়ক। কিন্তু বাড়িতে বা ঘরে তো তিনি আমার স্বামী। সত্যি বলতে কী তিনি একজন ইউনিক মানুষ। একজন ভীষণ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষ। তাকে আমি সবসময়ই ভীষণ শ্রদ্ধার চোখে দেখি। ভীষণ সম্মান করি। তিনি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, আমার চলার পথের সঙ্গী, আমার জীবন সাথী। গানের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। তিনি প্রতিদিনই অনেক গান শুনেন। গান নিয়ে আমার সঙ্গে নানান ধরনের আলোচনা করেন। আবার এমনও দেখা গেছে, হয়তো আমার ঘুম ঘুম চোখ, তিনি পাশে থেকে প্রশ্ন করছেন আমি ঘুমিয়ে পড়েছি কি না...।
যখন বলি, না ঘুমাইনি। তখন আমাকে পালটা প্রশ্ন করেন, আচ্ছা—এই গানটা কী শুনেছো? আমি তখন হয়তো সেই গানের দুই লাইন গেয়ে শুনিয়ে দেই। আমি বাংলাদেশের মেয়ে, এটাই আমার কাছে অনেক গর্বের বিষয়। আমার মাতৃভাষা বাংলা—এটাও আমার জন্য অনেক গর্বের বিষয়। সেই আমিই যখন বিদেশের মাটিতে স্টেজ শোর জন্য পা রাখি বা মঞ্চে ওঠার আগে যখন উপস্থাপক আমার নাম ঘোষণা করেন তখন আমি বলে দেই যেন, এভাবে বলেন, ‘রুনা লায়লা ফ্রম বাংলাদেশ’। বাংলাদেশকে বিশ্বে আমার কারণে আমার গানের কারণে যতটা পরিচিতি করে তোলা যায় সেটাতো আমারই গর্বের বিষয়। আবার দেশের বাইরে যখন বাংলা ভাষাভাষি মানুষ-জন যখন বাংলাদেশের গান নিয়ে কথা বলেন তখন আসলে ভালোলাগা আরো বেড়ে যায়।
ধ্রুব মিউজিক স্টেশন থেকে আমার সুর করা নতুনদের মধ্যে লুইপা ও হৈমন্তীর গান গত বছর আমার জন্মদিনে প্রকাশিত হয়েছিল। একটি গান শ্রদ্ধেয় গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা এবং অন্যটি কবির বকুলের। দুটি গান প্রকাশ হওয়ার পর আমি আরো বেশকিছু সুর করেছি নতুনদের জন্য। সে কাজে হাত দিতে একটু সময় লেগে যাবে। এর আগে তো আলমগীর সাহেবের সিনেমা ‘একটি সিনেমার গল্প’তে সুর করেছিলাম। গানটি ছিল গল্পকথার ঐ কল্পলোকে জানি’। গানটি লেখা গাজী মাজহারুল আনোয়ারের এবং গাওয়া আঁখি আলমগীরের। এর পর আর আসলে সিনেমায় গান করা নিয়ে ভাবার অবকাশ পাইনি। তবে হঠাত্ করে হয়তো করা হয়েও যেতে পারে। সবই আসলে নির্ভর করছে সময়ের ওপর।
লেখক: সংগীতশিল্পী, অনুলিখন: অভি মঈনুদ্দীন
উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর সিলেট জেলায়। ১৯৬৬ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘হাম দোনো’তে গান করার মধ্য দিয়ে তার যাত্রা শুরু। তার অসংখ্য অ্যালবাম রয়েছে। অসংখ্য দেশি ও বিদেশি পুরস্কারে ভূষিত রুনা লায়লা কেবল বাংলাদেশেই নয়, এবং বাংলা ভাষাতেই নয়, উর্দু ও হিন্দি গানের শ্রোতাদের কাছেও একজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী।
