আমরা কে? কোথা হইতে আসিয়াছি? বিজ্ঞান বলিয়া থাকে, এই বিশ্ব সৃষ্টি হইয়াছিল এক মহাবিস্ফোরণের ভিতর দিয়া, ইংরেজিতে যাহাকে বলা হয় বিগ ব্যাং। ঘটনাটি ঘটিয়াছিল আনুমানিক ১ হাজার ৩৮০ কোটি বত্সর আগে। হ্যাঁ, সংখ্যায় ভুল নাই, ১ হাজার ৩৮০ কোটি বত্সর। এই সৌরজগতের যতখানি বয়স, মহাবিশ্ব সৃষ্টির পর সৌরজগত্ আরো তিন বার জন্ম লইতে পারিত। বিজ্ঞানের এই সকল বিষয় রূপকথার মতো মনে হইতে পারে। রূপকথা তো নিজেকে সংশোধন করে না, উহাতে ফ্যান্টাসিই শেষ কথা; কিন্তু বিজ্ঞান প্রতিনিয়তই নিজেকে সংশোধিত ও হালনাগাদ করে, নচেৎ উহা আর বিজ্ঞান থাকে না। তিন দশক পূর্বে মহাবিশ্বের রহস্য বুঝিতে নাসা মহাকাশে পাঠাইয়াছিল হাব্ল স্পেস টেলিস্কোপ। ঐ টেলিস্কোপ এখনো দাপটের সহিত কাজ করিয়া চলিতেছে।
তবে ব্রহ্মাণ্ডের ১ হাজার ২০০ কোটি বৎসরের অধিক ইতিহাস খুঁড়িয়া দেখিবার ক্ষমতা নাই হাব্ল টেলিস্কোপের। সেই কারণে জেমস ওয়েব দুরবিনকে মহাকাশে পাঠাইবার প্রয়োজন পড়ে বিজ্ঞানীদের। জেমস ওয়েব ছিলেন নাসার স্বর্ণযুগের প্রধান, যেই যুগের অ্যাপোলো কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, যাহার ফলে মানুষ প্রথম চাঁদের মাটিতে পা রাখিতে পারে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ব্যয় ধরা হইয়াছিল ১০ হইতে ২০ কোটি ডলার। কী বিস্ময়! সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত ১ হাজার কোটি ডলার ছাড়াইয়া গিয়াছে। আমেরিকান মহাকাশ সংস্থা নাসা ইহা তৈরির অর্থসাহায্য গ্রহণ করিয়াছে কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির নিকট হইতে। মোট ১৪টা দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই মুহূর্তে অধীর অপেক্ষায় রহিয়াছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের পারফরম্যান্স দেখিতে। তাহারা জানিতে চাহেন, ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণে ১ হাজার ৩৮০ কোটি বৎসর পূর্বে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পর এখন মহাকাশে যেই সকল ছায়াপথ, গ্রহ-তারার সৃষ্টিরহস্য। চার সপ্তাহ পর জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ পৌঁছাইবে ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে। সেইখান হইতে এই টেলিস্কোপ যেই তথ্য ও ছবি পাঠাইবে তাহা বিশ্লেষণ করিয়া বিজ্ঞানীরা বুঝিতে চেষ্টা করিবেন ‘বিগ ব্যাং’-এর মাত্র ১০ কোটি বত্সর পরে প্রথম নক্ষত্রগুলোর আলো কেমন ছিল! উৎক্ষেপণের পর দ্বিতীয় সপ্তাহে টেলিস্কোপের সুবিশাল আয়না খুলিয়া যাইবে। তাহার ছয় মাস পর হইতে ব্রহ্মাণ্ডকে খুঁড়িয়া দেখিবার কাজে নামিবে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। নিঃসন্দেহে ইহা মানব জাতির জন্য অনেক বড় অর্জন।
তবে প্রদীপের তলায় অন্ধকারও থাকে। মানুষের একদিকে যেমন এত বড় বড় অর্জন, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী অশান্ত আর ভয়ের বাতাবরণ দিনদিন বৃদ্ধি পাইতেছে। রক্তক্ষয়ী নানা সংঘাতে বহু মানুষের প্রাণ ঝরিতেছে। এখনো ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ অসহায় জীবন যাপন করিতেছে। ভূরাজনীতি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে পরাশক্তিগুলির মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়িতেছে। পৃথিবীর মাটিতে যখন এই ধরনের যুদ্ধ ও অশান্তি প্রশমিত হইতেছে না, তখন এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ মহাকাশেও ছড়াইয়া পড়িতেছে। বলা যায়, পৃথিবীর যুদ্ধের বিস্তৃত হইতেছে পৃথিবীর বাহিরেও। মহাকাশের এমন যুদ্ধের দিকে ঝুঁকিতেছে বর্তমান বিশ্বে একে অপরের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যারোস্পেস করপোরেশন বত্সরখানিক পূর্বে বলিয়াছে, পৃথিবীর বাহিরে তথা মহাকাশেও যুদ্ধ আসন্ন। আমরা এমন একটা পথে অগ্রসর হইতেছি, যেইখানে ‘স্টার ওয়ার’ বা তারায় তারায় যুদ্ধ কোনো সিনেমার গল্প থাকিবে না। এইদিকে এইবারের বড়দিনে পোপ দুঃখ করিয়া বলিয়াছেন যে, বিশ্বব্যাপী আমরা সংঘাত, সংকট, ভিন্নমত বৃদ্ধি পাইতে দেখিতেছি। ইহার কোনো শেষ নাই বলিয়াই মনে হইতেছে। কারণ, এখন আর আমরা এইগুলি খেয়াল করি না বলিলেই চলে। এই সকলে আমরা এতটাই অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি যে, বড় বড় সকল ট্র্যাজেডি নীরবেই পাশ কাটাইয়া চলিয়া যাইতেছি। সুতরাং প্রশ্ন জাগিতেছে, মহাকাশে অদম্য কৌতূহল মিটাইবার বিপরীতে পৃথিবীতে শান্তির অমরাবতী কি অধরাই থাকিয়া যাইবে?
