বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

তরুণদের চোখে বিদায়ী বছর

ক্যালেন্ডারের পাতায় কেটে গেলো আরও একটি বছর। দেখতে দেখতে সময় হয়ে এলো ২০২১ কে বিদায় দেবার। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধশত বর্ষপূর্তির পাশাপাশি, পৃথিবীতে করোনার স্থবিরতার এক বছর পরে আবার চাঞ্চল্য ফিরে পাওয়ার মতো অনেক আনন্দময় ঘটনা যেমন ঘটেছে ২০২১ এ, তেমনি দিয়ে গেছে অনেক বিষাদ। ইত্তেফাক অনলাইনের সঙ্গে আলাপে এই প্রজন্মের কয়েকজন তরুণ বছরের বিদায়বেলায় তাদের স্মৃতি আর অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। গ্রন্থনা করেছেন সাদিয়া তাসমিয়া মোঃ আরিফ হাসান

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:০৬

২০২০ এর পরে ২০২১ ছিল আরেকটি অনিশ্চয়তাপূর্ণ বছর। আমার ধারণা আমাদের এইচএসসি ’২০ ব্যাচের প্রত্যেকের জন্যই এই সালটা সারাজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করব। সেই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হয়েই, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তত করেছি এই বছরের অনেকটা সময়। কিন্তু করোনার কারণে পরীক্ষা বারবারই পিছিয়ে যাচ্ছিল আর ধীরে ধীরে বিষণ্ণ হয়ে পড়ছিলাম। এক সময় মনে হচ্ছিল, এই বিষণ্ণতার হয়তো কোনো শেষ নেই। সময় যতো যাচ্ছিল, বিষণ্ণতাও ততোই বাড়ছিল আর তার সঙ্গে তো ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ছিলই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০২১ আমাকে নিরাশ করেনি। ছোটবেলা থেকে পালন করা স্বপ্ন পূরণের দিকে আরেক পা এগিয়ে গিয়েছি এই বছরের হাত ধরেই। ২০২১ যেমন অনিশ্চয়তা দিয়েছে, তেমনি দিয়েছে অদম্য আত্মবিশ্বাস। ২০২১ শিখিয়েছে, ধৈর্য্য ধরে চেষ্টা করলে, একসময় সফলতা আসবেই। আগামী বছরেও এমন অনেক কিছু শেখার অপেক্ষায় আছি।
সামিরা তাবাসসুম তালুকদার, শিক্ষার্থী, শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ, টাঙ্গাইল

 

দুই হাজার একুশ- বিদায়ী এ বছরটি আমার জন্য ছিল শিক্ষণীয় এবং পথনির্দেশক। থমকে যাওয়া অ্যাকাডেমিক পড়াশুনায় এ বছরেই আসে গতিময়তা। দেখতে দেখতেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় পাঁচটি বছর কাটিয়ে দিয়ে স্নাতক সম্পন্ন হবার দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছি বছরান্তে। শুরু থেকেই প্রবন্ধ, উপন্যাস-প্রভৃতি পাঠের মাধ্যমে ও গ্রন্থ অনুবাদ কাজে সাহিত্যরস আহরণের পাশাপাশি নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি। অ্যানিমেটেড ভিডিও বানানোর মাধ্যমে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিকট পড়াশোনাকে সহজ করার চেষ্টা করেছি। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবার পরেই ভ্রমণপিপাসু আমি ঘুরে বেড়িয়েছি দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস, সাম্প্রতিক আন্তঃদেশীয় সম্পর্ক, কূটনীতিক বিষয়াবলি আগে দুর্বোধ্য মনে হলেও এখন নিয়মিত চর্চা চলে এগুলো নিয়েই। নতুন বছরও আসুক জ্ঞান, সম্প্রীতি, মুক্তচর্চা ও সুসম্পর্কের সুবাতাস নিয়ে। বিদায় একুশ, বাইশ তোমায় স্বাগতম! 
সজিব দত্ত, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর, এডুহাইভ

 

২০২০ এর মার্চ থেকে প্রায় দেড় বছরের মত সময় ঘরে বসা। আশেপাশের অনেক পরিবারকেই ভেঙে পড়তে দেখেছি। পুরো পৃথিবীকে স্থবির হতে দেখার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা তো আছেই! তারপরও জীবনকে গতিশীল রাখতে লড়াই করে গিয়েছি। চেষ্টা করেছি নিজের খেয়াল রাখতে। নিজের এবং পরিবারের সবার যত্ন নিতে। ঘরে বসে থাকলেও নিজেকে ভার্চুয়াল জগতের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছি, করেছি স্কিল ডেভেলপমেন্ট এর মত নানা কাজ।
বছরের প্রায় শেষ পর্যায়ে আবার সবকিছু আগের গতিতে ফিরে আসতে শুরু করে। এই পর্যায়ে যথেষ্ট হিমশিম খেতে হচ্ছে আবার যান্ত্রিক জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে।
আসন্ন বছরের জন্য অনেক প্রত্যাশা। জীবন যাতে আর স্থবির হয়ে না পড়ে সেই কামনাই করছি। তবে এই বছর নিজেকে আরও ভিন্নভাবে উপলব্ধি করেছি। আমাদের এই জীবন কতোটা মূল্যবান এবং বাস্তবতা কতোটা বৈচিত্র্যময় তা জানতে পেরেছি। আরেকটি অসাধারণ বছরের অপেক্ষায় আছি।
সাবরিনা হাসান রাখি, শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

২০২০ সালের মত  বিশ্বের প্রতিটি মানুষ ২০২১ কেও মনে রাখবে, মহামারি করোনার জন্য। আমার মতো যারা তরুণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ২০২১ ছিলো একইসাথে আশীর্বাদস্বরূপ ও বিষাদময়। সম্পূর্ণ নতুন কিছু বিষয়ের সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে হয়েছে। অনলাইন ক্লাস, পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশনের সাথে অন্যভস্ত আমি নতুন করে শিখেছি প্রযুক্তির নতুন সব ব্যবহার৷ রপ্ত করেছি অনলাইন এডুকেশন এর খুটিনাটি। করোনা মহামারিতে পাওয়া দীর্ঘ ছুটি কাজে লাগিয়েছি বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপমেন্টে৷ পড়েছি সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে লেখা বই, অনলাইন ইন্টার্নশিপ করে অর্জন করেছি সম্পূর্ণ এক অভিজ্ঞতা, অনলাইন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে করেছি নিজের আত্মপ্রকাশ। তবে দীর্ঘসময় ঘরবন্দী সময় পার করার কারণে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি৷ পত্রিকার পাতায় প্রায় প্রতিদিনই চোখে পড়ত অনেক তরুণের আত্মহত্যার ঘটনা, সংসারের হাল ধরা যুবকের চাকরি হারানোর করুণ কাহিনি কিংবা অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা থেকে সম্পূর্ণ বিছিন্ন হওয়ার খবর৷ এজন্য ঘরবন্দী সময়ে নিজেকে মানসিক ভাবে সুস্থ রাখার জন্য বাসার ছাদে শরীরচর্চা করেছি, পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটিয়েছি, নিজেকে নতুন কাজে ব্যস্ত রেখেছি। লকডাউন থেকে মুক্তি পেয়েই দেখা করেছি দীর্ঘদিন দেখা না পাওয়া নিজের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সাথে, সেই অসাধারণ অনুভূতির কথা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব না। করোনা আমাদেরকে আরও বেশি হাইজিন মেইনটেইন করা শিখিয়েছে৷ আগত বছরে সব বিষাদকে দূরীভূত করে নিউ নরমাল পৃথিবীতে নতুনভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আশা ব্যক্ত করছি৷
মোঃ আশিকুর রহমান, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

আমাদের জীবনের প্রতি মুহূর্তই আসলে সবসময়ই 'সমান সময়কাল ধরে' অতিবাহিত হয়; তবুও ভালো দিনগুলো আমাদের কাছে মনে হয় বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গিয়েছে এবং খারাপ কিংবা কষ্টের সময়গুলো যেন শেষই হচ্ছে না। ২০২১ সাল ছিল করোনা মহামারীর সেই আলোকময়তার সময়, যখন দেশের সর্বস্তরের মানুষের অনেকাংশই ভ্যাকসিনেশনের সুযোগ পেয়ে চলছে! জীবনের নানা স্বাভাবিক কার্যক্রম অনেকটা স্বাভাবিক হওয়া শুরু করেছে; আবার হয়নি। মোটাদাগে বললে এ বছরটা 'নিউ নরমাল' জীবনে আমাদের অভ্যস্ত করায় দৃঢ় ছিল। তবুও এত মন্দের ভালো একটিই; আজও সুস্থ আছি, এখনো অনেক আপনজনের পাশে থাকার সৌভাগ্যেই বেঁচে আছি। 
২০২০ সালে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলাম। আমার স্নাতক শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল গতবছরই। তবে মহামারীর কারণে ফাইনাল হয়নি। এ সময়টায় বহু মানুষ তাদের প্রিয় মানুষদের হারিয়েছেন, অনেকে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা হারানোর মতো নানা নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন কিংবা এখনো প্রতিনিয়ত হচ্ছেন। নারীর প্রতি সহিংসতা, বেকারত্ব, বাল্যবিবাহের মতো নানা কঠিন সামাজিকব্যাধিও বেড়েছে। 
তবু আমি আশার আলো খুঁজতে চাই। তাই ২০২১ এ আমি চেষ্টা করেছি প্রযুক্তির সাহায্যে নানা সামাজিক অভিশাপকে আশীর্বাদে পরিণত করার কাজে ব্যস্ত থাকায়। নানা যুবসংগঠন মিলে মানসিক স্বাস্থ্য, জলবায়ু সুবিচার নিশ্চিতকরণ ইত্যাদির জন্য উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সাথে গোলটেবিল আলোচনা করা থেকে শুরু করে অনলাইনে স্থানীয়, জাতীয় এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে নানা ক্যাম্পেইনের আলোকে প্রান্তিকদের চাওয়া-পাওয়া তুলে ধরায় সচেষ্ট ছিলাম। 
আহ্বান জানাতে চাই—আমরা সকলে যেন কেবল আমাদের নেতিবাচক অভিজ্ঞতায় আটকে না থেকে বরং ইতিবাচকতার সাথে নতুন বছরকে বরণ করে নিই।
রেনেকা আহমেদ অন্তু, ইয়ুথ অ্যাক্টিভিস্ট

 

 
২০২১ সাল ছিল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। ৭ কোটি থেকে ১৬ কোটি মানুষের ১৬ কোটি স্বপ্নের দেশে পদার্পণের বছর। স্বভাবতই ২০২১ নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা, আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্যান্য সব বছরের তুলনায় বেশি। ২০২০ সালে করোনা মহামারীতে থেমে যাওয়া স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরা ছিল একুশের ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। ভ্যাক্সিন আবিষ্কার ও দ্রুত ভ্যাক্সিনেশনের আওতায় মৃত্যুর অমানিশা কেটে গেছে অনেকটা। আমরা ফিরতে পেরেছি আমাদের মাঝে, ক্লাসে, ক্যাম্পাসে, ফিরতে পেরেছি প্রাণের মাঝে।
কোভিড-১৯ এর প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও থেমে ছিলনা সরকারের মেগা প্রজেক্টগুলো। বেড়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়। বেড়েছে কৃষি উৎপাদনও। গৃহহীনরা পেয়েছে মুজিব শতবর্ষের উপহারস্বরুপ স্থায়ী বাসস্থান।  কিন্তু অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নই একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের চিত্র হয়না। 
অর্থনৈতিক মুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ধনী-গরিবের বৈষম্য। মহামারীর সময়ে বেড়েছে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা। দীর্ঘায়িত হয়েছে সড়কে মৃত্যুর মিছিল, কর্মসংস্থানের অভাব, বেড়েছে মানুষের মাঝে নিষ্ঠুরতা।  বিভিন্ন যৌক্তিক ঘটনা, আন্দোলনে দেখা গেছে মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, অসচেতনতা ও প্রবল  উদাসীনতা।
নির্দিষ্ট কোনো একটি বছরে একটি দেশের প্রত্যাশার সবটুকুর প্রতিফলন হওয়া সম্ভব না। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে আমাদের দাবিটুকু বেশি ছিল। হয়তো কোনো একসময়ে, হতে পারে ২০২২ এই আমরা ছুঁতে পারবো আমাদের কাঙ্খিত স্বপ্নকে।
মোঃ শাহিন রানা, শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
 

ইত্তেফাক/এসটিএম