এক সময় নিকলীর হাওর-বাঁওড়ে অনেক দেশি পাখি দেখা যেত। কিন্তু এলাকায় স্হাপনা ও বসতবাড়ি গড়ে ওঠায় কমেছে দেশীয় পাখির আশ্রয়ের ঠিকানা। আবার কীটনাশকযুক্ত ফসল খেয়েও মারা যাচ্ছে এসব পাখি। ফলে নিকলীর হাওরে কমছে দেশি পাখির বিচরণ।
স্হানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামের মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে ঝোপ-জঙ্গল কাটছে। সবার বসতবাড়ি টিনের বদলে দালান হচ্ছে। ফলে পাখিরা বাসস্হান হারিয়ে ছুটছে অন্যত্র। পাখির কিচিরমিচির ডাকে এখন আর ঘুম ভাঙে না স্হানীয়দের। গ্রামের প্রবীণরা বলেন, আগেও মাঠঘাট, ক্ষেত-খামারে বিচিত্র পাখির বিচরণ ছিল। পাখিরা সে সময় ঝাঁকে ঝাঁকে খাদ্য অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকত। তখন ফসলের মাঠে পাখি বসার দৃশ্য সচরাচর দেখা গেলেও এখন তা পাওয়া যায় না। অতীতে গ্রাম এলাকায় ব্যাপকহারে টুনটুনি, চিল, পানকৌড়ি, ডাহুক, বালি হাঁস, কোকিল, বক, শালিক, ঘুঘু, দোয়েল, বাবুই, কাকসহ বিভিন্ন পাখির দেখা মিলত। বর্তমানে জাতীয় পাখি দোয়েল, কাঠঠোকরা, কোকিল, ডাহুক, বাবুই, ঘুঘু, বাওয়াই, শালিক, টুনটুনি, মাছরাঙা, টুইটেরা, গোমড়া ও প্যাঁচাসহ অনেক পাখি আর তেমন দেখা যায় না। ফলে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই চেনে না এসব পাখি।
সদর উপজেলার তৈইলাহাটি গ্রামের বাসিন্দা ৬৮ বছরের বিল্লাল হোসেন বলেন, আমার বয়স যখন ১০ তখন গ্রামে কত রঙের পাখি ছিল তা বলে শেষ করতে পারব না। ঘরের চালে পাখি বাসা বাঁধত। পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙত। অথচ এখন আর সেই পাখি নেই।
বানিয়া হাটি গ্রামের বাসিন্দা শুক্কুর মাহমুদ বলেন, আগে মাঠে ফসল ফলানোর সময় চারদিকে পাখি বসে থাকত। কিন্তু এখন মাঠ আছে, ফসল আছে, গ্রাম আছে অথচ সেই পাখি নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গৃহবধূ বলেন, আগে যখন পুকুর থেকে পানি আনতাম তখন পুকুরের চারপাশে কত পাখি থাকত, পাখিরা কিচিরমিচির করত। অথচ এখন পাখিই তেমন দেখা যায় না।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আসিফ ইমতিয়াজ মনির বলেন, গ্রামের চারদিকে ঘনবসতির কারণে পাখি এখন আশ্রয়স্হল হারাচ্ছে। শুধু তাই নয়, কীটনাশকযুক্ত ফসল খেয়ে অনেক পাখি মারা যাচ্ছে। পাখি রক্ষার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাহলেই হয়তো আবারও পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাবে।
নিকলী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার রফিকুল ইসলাম বলেন, নিকলীর হাওরে পানকৌড়ি, ভূতিহাঁস, পিয়ংহাঁস, খয়রাবগা, লেঞ্জাহাঁস, নেউপিপি, সরালি, রাজসরালি, চখাচখি, পাতি মাছরাঙা, পাকড়া মাছরাঙা, মরিচা ভূতিহাঁস, সাধারণ ভূতিহাঁস, শোভেলার, পাতিহাঁস, ডাহুক, বেগুনি কালেম, গাঙচিল, বালিহাঁস, ডুবুরি, বক, সারসসহ দেশিবিদেশি পাখি রয়েছে। এর মধ্যে ৯৮ প্রজাতির পরিযায়ী, ১২১ প্রজাতির দেশি ও ২২ প্রজাতির হাঁসজাত পাখি আছে। কিন্তু বর্তমানে এসব পাখির বেশির ভাগই বিলুপ্ত প্রায়।
তিনি আরো বলেন, অতিথি পাখি প্রতি বছর ডিসেম্বরের শুরুতে আসত। হাওরে জলকেলি আর দল বেঁধে গাছের ডালে সঙ্গিনী নিয়ে উড়াউড়ি করত। অথচ কয়েক বছর ধরে হাওরে পাখিই আসে না। তিনি বলেন, যদি পাখি শিকারিরা কোনো উত্পাত না করত তবে হয়তো নিকলীর হাওরে নিরাপদ আশ্রয় ভেবে বেশি বেশি পাখি আসত।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) প্রীতিলতা বর্মন ইত্তেফাককে বলেন, নিকলীর হাওরে অতিথি পাখি যাতে কেউ শিকার না করতে পারে সেজন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্টদের হাওর তদারকি করার নির্দেশ দেওয়া আছে। পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্হা নেওয়া হবে।
