এ প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক যে, ধরার কোথায় নেই মূল্যস্ফীতি? হ্যাঁ, এটি ঠিকই সর্বত্র বিদ্যমান। তবে এর রকমফেরের পাশাপাশি সহনীয় ও অসহনীয়তার বিষয় রয়েছে। কোনো দেশের মুদ্রাস্ফীতি বা মূল্যস্ফীতি খবরের শিরোনাম হয় তখনই, যখন তা ঐ দেশের জনগণের সহ্যের সীমা অতিক্রান্ত হয়। প্রমাণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরাই যাক। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও সম্পদশালী রাষ্ট্রটিতে হালের মূল্যস্ফীতি রয়েছে গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। মার্কিনিরা সর্বশেষ পর্যায়ে হলিডে-ডিনারের প্রধানতম পণ্যদ্রব্য কেনার পর বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারছে। কিন্তু এতে তারা তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। অন্য দিকে তুরস্কের কথা ধরুন, মুদ্রাস্ফীতি সেখানে এতটাই তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে যে, আমেরিকানদের মতো চূড়ান্ত বিল পে করার সময় পর্যন্ত যাওয়ারই সুযোগ পাচ্ছে না। অনেকেই একেবারে নিত্যপ্রয়োজনীয় বহুকিছু না কিনেই বাড়ির পথ ধরছে।
তুরস্কে লাল মাংস এখন রূপ নিয়েছে বিলাসদ্রব্যের পর্যায়ে। ইস্তাম্বুলের একটি মুদি দোকানে অতি সম্প্রতি এক প্যাকেট ডিমের দাম সাত দিনের ব্যবধানে বেড়ে গিয়েছে ৬০ শতাংশ। বেশির ভাগ পরিবার তাদের পারিবারিক বাজেট আঁটোসাঁটো করছে বাধ্য হয়ে। অনেকেই কমিয়ে দিয়েছে প্রিয় সন্তানদের হাতখরচ। আবার কেউ কেউ পরিবারের খরচ সামলাতে গিয়ে খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিচ্ছেন। তুরস্কের মূল্যস্ফীতিবিষয়ক সত্যিকারের পরিস্হিতি বোঝার জন্য উপরে ব্যবহূত বাক্যগুলোই যথেষ্ট। স্হানীয় মুদ্রার এই অবমূল্যায়নে তুরস্কের জীবনযাপন হয়ে পড়েছে অনেক ব্যয়বহুল। যে কারণে পরিবারের আয় অনুযায়ী গৃহিণীদের বাজেট সাজাতে গিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছে; সঞ্চয়ের চিন্তাভাবনা তো দূরের কথা। তুরস্কের সরকারি উপাত্ত জানান দিচ্ছে, গত বছর মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২১ শতাংশ। কিন্তু এ বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত লিরা (তুরস্কের জাতীয় মুদ্রা) মান হারিয়েছে অর্ধেকেরও বেশি। সে হিসেবে ১৩ লিরায় কিনতে হচ্ছে ১ মার্কিন ডলার। যার ফলে মুদিদ্রব্যের দোকানগুলোয় গিয়ে আমজনতার নাভিশ্বাস ছুটছে।
কলেজের ছাত্রী মন্েতায়ার বয়স বিশের কোঠায়। তিনি তার শেষ নামটি মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করতে রাজি হননি সরকারের টার্গেট বনে যাওয়ার ভয়ে। জীবন চালাতে গিয়ে তিনি স্হানীয় একটি বারে খণ্ডকালীন চাকরি খঁুজে নিয়েছেন। তাতেও তার পড়াশোনার খরচ মিটে না বলে গত মাসে ফ্ল্যাটের অব্যবহূত ও অতিরিক্ত একটি বেডরুম ঝাড়পোছ করে পর্যটকদের কাছে ভাড়া দেওয়া শুরু করেন। তবে এতে যে তিনি খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন, এমন নয়, ‘আমি সত্যিই এতে চিন্িতত। যখনই আমার কাছে কেউ আসে তখনই খুব ভয়ে থাকি। অপরিচিত একজন লোকের সঙ্গে একই নিচে থাকতে অভ্যস্ত নই বলেই প্রচণ্ড ভয় কাজ করে আমার মনে। তবে এটি মেনে নেওয়া ছাড়া আমার সামনে কোনো রাস্তা নেই। শুধু মাথার ওপর ছাদ ঠিক রাখার জন্যেই তিনি এ কাজটি করছেন না। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার পেছনেই বাড়তি আয়ের প্রায় পুরোটা খরচ করেন। কারণ সুপার মার্কেটে গিয়ে ঝুড়ি ভরতে গেলে আগের চেয়ে দ্বিগুণ অর্থ গুণতে হয় এখন।
সারা ইস্তাম্বুলে মুদি দোকানদার ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে প্রায় একই চিত্র উঠে আসে। যে যাই বলুক না কেনো, দেশের প্রধান অর্থনীতিবিদরা মনে করেন মূল্যস্ফীতি সরকার ঘোষিত ২১ দশমিক ৩ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। দেশের অর্থনৈতিক বোদ্ধাদের বেশ কয়েকটি দল মূল্যস্ফীতির প্রযুক্তিগত পরিমাপ নিয়ে। তাদের মূল্যায়নে এই হার প্রায় ৬০ শতাংশ। এটি সমাজের ওপর বিস্তৃত পরিসরের এক বোঝাস্বরূপ। ২০০৬ থেকে ২০০১১ সাল পর্যন্ত টার্কিশ সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করা দুর্মনত্ ইলমাজ সমস্যা সমাধানের সহজ ও দ্রুত কোনো পথ আপাতত দেখছেন না। তিনি বর্তমানে দেশের বিরোধী দলের একজন বড় মাপের নেতা।
স্বাভাবিকভাবে, এ ধরনের মুদ্রাস্ফীতি সামাল দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু টার্কিশ সেন্ট্রাল ব্যাংক ঐ ধরনের কোনো কাজতো করেইনি, উপরন্তু গত চার মাসে সুদের হার কেবল কমিয়েছেই। এর একমাত্র কারণ প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর বিশাল প্রভাব। বলতে গেলে তার সম্মতি ছাড়া ঐ প্রতিষ্ঠানে নতুন কোনো সিদ্ধান্তই নেওয়া যায় না। অপ্রথাগত এবং অবিশ্বাস্যরূপে প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস করেন সুদের নিম্ন হার নতুন চাকরি সৃষ্টি ও দ্রব্যমূল্য নামিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। মাত্র কয়েক দিন আগে সুদের হার কর্তনের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়া সত্ত্বেও তুরস্কের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে সরাসরিই বলে দেন যে, তার মুসলিম বিশ্বাস ঋণের ওপর সুদ দেয়া ও নেওয়াকে সমর্থন করে না, যেটিই তার মুদ্রানীতিকে চালিত করে। আরো জানিয়ে দেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীরা অন্য কিছু আশা করতে পারে না। ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যেতেই অঙ্গীকারবদ্ধ আমি।
মার্কেট প্লেইস অনুসরণে

