সলিল সমাধি হওয়ার আগে

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:৩৪

একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। সেই কান্না অনেক সময় ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে সমগ্র জাতিকে শোকাহত করে। আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হওয়া, পানিতে ডুবে সলিল সমাধি হওয়া, গাড়ি দুর্ঘটনায় দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়া, বহুতল ভবনের নিচে চাপা পড়ে জীবন্ত সমাধিতে পরিণত হওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষ লাশ শনাক্ত করতে না পেরে গণকবরে সমাহিত হওয়া—এ যেন এ জাতির নিত্যনৈমিত্তিক নিয়তি।

‘সেভ দ্য রোড’ গত ২৪ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জানায়, গেল বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতু্যবরণ করেন ৫৩৭০ জন। আহত হয়েছেন ৭০,২২২ জন। এই দুর্ঘটনার ৪৪ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩০ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা, ২০ শতাংশ সড়কপথের বেহাল দশার কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনা ও ৬ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে সংগঠিত হয়েছে।

এছাড়া ফিটনেস বিহীন গাড়ি, রুটপারমিট না-থাকা এবং ড্রাইভারের লাইসেন্স না-থাকার মতো কমন সমস্যা তো আছেই। সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে জেগে ওঠা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ত্রুটিগুলো। ট্রাফিকব্যবস্হার অব্যবস্হাপনাও দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী, যা আমাদের ছাত্রদের আন্দোলনের সময় দৃষ্টিগোচর হয়েছে। নৌপথেও মাঝে মাঝে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে বিশেষ করে লঞ্চডুবি তার মধ্যে অন্যতম। ২০২১ সালে নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭১২টি, নিহত ২৩০ জন, আহত ৪৪৬ জন।

সর্বশেষ গত ২৩ ডিসেম্বর ৪০০ যাত্রী নিয়ে এমভি-১০ সদরঘাট থেকে ছেড়ে যায়, চাঁদপুর ও বরিশাল টার্মিনালে থামে এবং যাত্রী ওঠানামা করে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে পৌঁছলে রাত ৩টার সময় আগুন ধরে যায়। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ৪১ জনের বেশি যাত্রীর মৃতু্য হয়। ৮০ জনেরও বেশি দগ্ধ হয়েছেন। দুর্ঘটনার সময় অনেক যাত্রী আগুনের ভয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বেঁচে গেলেও নিখোঁজ রয়েছেন শতাধিক যাত্রী। দুর্ঘটনার পর জানা যায়, লঞ্চটি নদীতে বেপরোয়াভাবে চলছিল, ভাড়ার জন্য নিরাপত্তাহীন, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে। লঞ্চটির ইঞ্জিনে ত্রুটি ছিল এবং সেখানে আগুন নেভানোর কোনো সরঞ্জাম ছিল না! ২০২১ সালে রেলপথ দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৩৮ জন এবং আহত হন ৩৭৮ জন। ক্রসিংয়ে রেল দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। বগি বা লাইনচু্যতি যেন স্বাভাবিক ঘটনা!

শিল্পকারখানায় আগুনে পুড়ে কয়লা হওয়া শ্রমিকদের নিয়তি। কারখানাতে কাজের পরিবেশ না-থাকা, অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্হা না-থাকা, বের হওয়ার সিঁড়ি না-থাকা এক কথায় মালিকপক্ষের অতিরিক্ত মুনাফার লোভে সব নিয়ম ভঙ্গ করায় এসব দুর্ঘটনা। বেসরকারি সংস্হা ‘সেইফটি অ্যান্ড রাইটসে’র হিসেবে গত দশ বছরে পোশাক খাতের বাইরে শিল্পকারখানায় ৪৫৩টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং দুর্ঘটনায় ৬৯৭ জন শ্রমিক মারা গেছেন।

প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলেই শুরু হয় বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা, মিডিয়াতে ব্যাপক আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, দ্রুত মালিককে গ্রেপ্তার, বাস বা লঞ্চের বিভিন্ন ত্রুটি খুঁজে বের করা এবং তড়িঘড়ি করে তদন্ত কমিটি গঠন এবং সাতদিনের মধ্যে সুপারিশ; কিন্তু দেখা যায় সাত বছরেও সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না। নতুন করে ঘটে আরেকটি দুর্ঘটনা আর নতুন শোকে পুরাতন শোক ভুলে যায় সবাই—এভাবেই চলছে বছরের পর বছর যুগের পর যুগ! দুর্ঘটনা ঘটার আগে তদন্ত করে ব্যবস্হা নেওয়া হলে শ্রমিককে আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হতে হতো না। যাত্রীদের পানিতে ডুবে সলিল সমাধি অথবা রাস্তায় দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হতো না। গণকবরে সমাহিত হতে হতো না। ঢাকা।

ইত্তেফাক/বিএএফ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন