নতুন বছরে যেমন শিক্ষাঙ্গন চান তারা

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২২, ২১:৩৬

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনা মন্থর করে দিয়েছে মানুষের জীবন-যাপন। প্রাণ হারিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। এই ভাইরাসে মৃত্যুর পাশাপাশি যেমন ঘটেছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, তেমনি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থাও। বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষা। করোনার দাপট কমলেও নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন। 

করোনায় সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের শিক্ষব্যবস্থা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিলে গত বছরের ৮ মার্চ করোনা শনাক্ত হওয়ার পর ১৬ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয় সরকার। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরতে পারেনি। চলতি বছর ক্লাসে ফিরতে শুরু করেছে তারা। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব না হওয়ায় প্রথমবারের মতো পিএসসি, জেএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অটো পাস দেওয়া হয়। যদিও করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর গত বছরের এপ্রিল থেকেই ডিজিটাল মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ক্লাস শুরু হয়। এরপর বড় স্কুল-কলেজগুলো, পরে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও অনলাইনে ক্লাস শুরু করে। 

তবে গ্রামের শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট সংযোগ ও প্রয়োজন মতো ডিভাইস না থাকায় সঠিকভাবে ক্লাসে যোগদান করত পারেনি। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবনের ক্ষতি যেন পুষিয়ে নিতে পারে, সেজন্য সরকার নানামুখী ব্যবস্থা নিয়েছে। 

ইতোমধ্যে নম্বর-বিষয়-সিলেবাস কমিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা। গত বুধবার (২৯ ডিসেম্বর) এসএসসি পরীক্ষা ফল প্রকাশিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে হয়তো আগামী মার্চ মাসের পর স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হতে পারে। 

করোনার প্রাদুর্ভাবে সেশনজটে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ঠিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে না পেরে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি অনেক শিক্ষার্থী। সেজন্য বেকারত্বও বেড়েছে ব্যাপক হারে। এসব শঙ্কা-উদ্বেগ কাটিয়ে নতুন বছরে কেমন শিক্ষাঙ্গন দেখতে চান শিক্ষকরা? এই নিয়ে কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের মুখোমুখি হন এই প্রতিবেদক।

এসব বিষযে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। পশ্চিমা বিশ্বে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের প্রকোপ দেখা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি কিভাবে যাবে, সেটা পুরোপুরি নিশ্চিত নই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শিক্ষাপদ্ধতিতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া চলে এলেও হাইব্রিড পদ্ধতি চালু রাখতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে লেখাপড়া চলবে, আবার অনলাইনেও চালিয়ে যেতে হবে। অনলাইনে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হলে প্রান্তিক এলাকায় জনগোষ্ঠিকে যত ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করা যায়, অর্থাৎ তাদের ডিভাইস দেওয়া, তাদের ইন্টারনেট ডেটা সাপোর্ট দেওয়া, এগুলো করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেটা প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অবকাঠামোগত সংস্কার ও সম্প্রসারণের দরকার আছে। করোনা পরবর্তী সময়ে এটি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’  

এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘করোনার মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থাকে যদি আমরা অব্যাহত রাখতে চাই। উন্নতির দিকে নিতে চাই তাহলে-শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের যে বাজেট আছে, সেটি বহুগুন বৃদ্ধি করার প্রয়োজন আছে। বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি না করলে প্রাথমিক পর্যায়ে ভালো শিক্ষক আমরা আকৃষ্ট করতে পারবো না । আর প্রজাতন্ত্রের ভীত রচনা করে এই প্রাথমিক শিক্ষা।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, ২০২২ সালে বা পরবর্তী সময়ে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের যে বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার যে সংস্কার করে গেছেন, তার অবর্তমানে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষায় ফিরে যেতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘করোনা পুরোবিশ্বকে পালটে দিয়েছে। শিক্ষাঙ্গনও নানাভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। আমাদের দেশও তার বাইরে নয়। আমরাও নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে, বিশেষ করে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আমরা একটু হিসাব করে দেখলাম, আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যৌথ সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, এই পরিস্থিতি কিভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়, কার্যক্রম সক্রিয় রাখা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘খুব আনন্দের সঙ্গে লক্ষ করেছি, বাধা বিপত্তি, অনেক প্রতিকূলতা, অনেক অনভিজ্ঞতা ও অনেক ঘাটতি থাকার পরও প্রতিটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর হঠাৎ প্রস্তুতি ছাড়াই সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সেই বিষয়গুলো ঠেস দেওয়া সম্ভব হয়েছে।’ 

এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে সাত মাসের মতো একটা ঘাটতি আছে। কোথাও কোয়ালিটির সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করা লাগেনি। এটা সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির একটা বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নানা প্রতিকূলতার মাধ্যমেও এটা করতে পেরেছে। আমাদের লস রিকোভারি প্রজেক্ট আছে।’ তিনি বলেন, ‘অনলাইনে অনেকগুলো কার্যক্রম সমাপ্ত হয়েছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা যে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে, এটা বিশাল একটা অর্জন। এই শুভ অর্জন সামনের দিক শক্তিশালী করবে। আশা করছি করোনায় শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা পুষিয়ে যাবে এব দ্রুত ঘাটতিগুলো কেটে যাবে।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হক বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ছিল। অর্থাৎ লকডাউনসহ নানা রকম সমস্যায় আমাদের শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধের মতো হয়ে যায়। আমরা ফিজিক্যালি ক্লাস নিতে পারিনি। অনলাইনে ক্লাস নিয়ে শেষ করে, পরীক্ষাগুলো এখন প্রায় শেষ। আশা করি নতুন বছরে এই ধরনের পরিস্থিতি আর থাকবে না। করোনামুক্ত পরিবেশে এখন যেভাবে চলছি, এর চেয়ে ভালো পরিবেশ আশা করছি। যেন শিক্ষার্থীরা সময়মতো পড়াশোনা করতে পারে, সময়মতো ক্লাস শেষ করে, এরপর পরীক্ষাগুলো শেষ করে স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা চাই, গত বছরে যে সমস্যাগুলো ছিল, সেটি যেন আর না থাকে।’ 

ড. ইমদাদুল হক বলেন, ‘সুষ্ঠু পরিবেশে আমরা যেন শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারি, সেই প্রত্যাশা করি। করোনার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা কিভাবে পুষিয়ে নেওয়া যায়, সেটা চেষ্টা করবো।’ তিনি বলেন, ‘আমরা শিগগিরই জাগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে, ডিনস কমিটি ও চেয়ারম্যানদের মিটিংয়ে চেষ্টা করবো কোনোভাবে সময়টা কিছুটা কমিয়ে আনতে পারি কি না। করোনায় সেশনজট যেটা হলো, সেটা যাতে রিকোভার করতে পারি।’

নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গবেষণা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. রকিবুল হাসান বলেন, ‘ভয়াবহ একটি সময় অতিক্রম করে আমরা নতুন বছরে আশার আলো দেখতে চাই। সেই আলোতে করোনায় বিধ্বস্ত রূপ দূর হয়ে যাক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্র স্বাভাবিক রূপে  ফিরে আসুক, নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনায়  দৃঢ় প্রত্যয়ে নতুন বছরের অভিযাত্রা ঘুটুক।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা-স্নেহ ও দায়িত্বশীল আচরণ খুব প্রয়োজন। ক্ষুদ্র স্বার্থে, ব্যক্তি লোভ-লালসায় কোনো শিক্ষকের বিবেক বিক্রি না হোক। শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করে নিজেদের দেশপ্রেমিক আদর্শিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলুক।’

এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যেন নিজের দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করুক। প্রাথমিক শ্রেণি থেকে উচ্চশ্রেণি; সর্বপর্যায়ের শিক্ষা পাঠ্যক্রমে এ ব্যাপারটি গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘‘নতুন বছরে সবচেয়ে জরুরি, ইউজিসি প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ ও ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ নামক যে দুটি কোর্স চালু করার বাধ্যবাধকতা দিয়েছে, তা যেন এ বছরেই সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়। তাহলে নতুন প্রজন্ম তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে খানিকটা হলেও জানতে পারবে।’’

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুদমিলা মাহবুব বলেন, ‘নতুন বছরে সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশ আশা করছি। করোনা তো আমরা থামাতে পারবো না। তাই আমাদের থেমে গেলে চলবে না। এজন্য ভ্যাকসিনেশনের দিকে নজর দিতে হবে। ভ্যাকসিনেশনের জন্য যেসব ইনিশিয়েটিভ নেওয়া দরকার, সেগুলো নিতে হবে।’

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সিনিয়র লেকচারার আন্তা আফসানা বলেন, ‘করোনায় ২০২০ ও ২০২১ সাল পুরোটাই আমাদের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। নতুন বছরে আমি মনে করি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সশরীরে ক্লাস ও পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘পড়াশোনা একটা কনসেনট্রেশনের বিষয়, কিন্তু দীর্ঘ সময় অনলাইন ক্লাসে এই কনসেন্ট্রেশন অনেকের আসে না সেভাবে। ফিজিক্যাল ক্লাসে শিক্ষার্থীদের এটেনশন ও অ্যাকটিভিটি ধরে রাখতে সুবিধা হয়। আশা করছি, নতুন বছরে সবাই শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠুভাবে ফিরে আসবে। ’

ইত্তেফাক/এনই