লাল নীল দীপাবলি

খুশবন্ত সিংয়ের ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’

দাঙ্গা-হিংসা আর ভালোবাসার দলিল

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২২, ১৯:১৭

খুশবন্ত সিং-এর প্রথম এবং সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভেঙে গঠিত হলো পাকিস্তান ও ভারত। ধর্মান্ধ ক্ষমতালোভী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী কীরকম জঘন্য রক্তের খেলায় মেতে উঠেছিল—এ উপন্যাসে তার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। পাকিস্তানে মরে হিন্দু আর শিখ। অপরদিকে ভারতে মরে মুসলমান। ট্রেন ভর্তি লাশ আসে ভারতে আবার ফেরত যায় রক্তের চিহ্ন নিয়ে। এরই মধ্যে শান্তি বজায় রেখে বিভিন্ন জাতি মুসলিম হিন্দু ও শিখ একসঙ্গে বসবাস করে ভারতের এক প্রত্যন্ত গ্রামে যার নাম মানো মাজরা। 

ভারতের সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত এ গ্রামে শান্তিতে বসবাস করে হিন্দু মুসলিম ও শিখ একসঙ্গে। জুগ্গাত সিং প্রেমে পড়ে মুসলিম তাঁতি ইমাম বক্সের কন্যা নুরুনের। উপন্যাসের পরিণতিতে জুগ্গাত সিং নিজের জীবনের বিনিময়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকারীদের হাত থেকে পাকিস্তানগামী ট্রেনের যাত্রীদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল যে ট্রেনে ছিল তার প্রেমিকা নুরুন। সমগ্র উত্তর ভারতে যখন অস্ত্রের ঝনঝনানি, সন্ত্রাস আর পালিয়ে বেড়ানো তখন সীমান্তের কিছু গ্রামে তখনো শান্তি বিরাজ করছিল। হয়তো বিচ্ছিন্ন এবং প্রত্যন্ত হওয়ার কারণে এটা সম্ভব হয়েছিল। 

এমনি একটি গ্রাম মানো মাজরা যা সুতলেজ নদীর তীরে অবস্থিত। ভারতের সীমান্তবর্তী এই গ্রামে তিন ধর্মের লোক বাস করছিল শান্তিতে। সন্ধ্যা হলেই হিন্দুরা উলুধ্বনি দেয়, মুসলিম দেয় আজান আর শিখ যায় প্রার্থনায়। গ্রামের শিখ যুবক জুগ্গাত সিং মসজিদের মুয়াজ্জিনের কন্যা নুরুনের প্রেমে মজে ডাকাতি ছেড়ে দেয়। মানো মাজরার রেল স্টেশনে বেশি ট্রেন না থামলেও ট্রেনিং গ্রামটির রুটিন বিশেষ। সকালে ট্রেনের হুইসেল শুনে আজান বা পূজা বা প্রার্থনা শুরু হয়। রাতের ট্রেনের শব্দ শুনে ঘুমাতে যায় মানো মাজরা গ্রামের লোকজন। একদিন সব নিয়ম পালটে যায়। একদিন পাকিস্তান থেকে আসে লাশভর্তি এক ভুতুড়ে ট্রেন। হাজার হাজার শরণার্থীর লাশ। তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে উসকে দিতে আসে ম্যাজিস্ট্রেট হুকুম চাঁদ। তার সঙ্গে তেলবাজিতে মেতে ওঠে সাব ইন্সপেক্টর। হুকুম চাঁদ বাইজি হাসিনার সঙ্গে মেতে ওঠে রঙ্গলীলায়। মানো মাজরায় লাগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। বাড়িছাড়া হয় মুসলমান। মুসলমান উদ্বাস্তু ভর্তি ট্রেন যাবে পাকিস্তানে। ট্রেনের মানুষগুলোকে খুন করার পরিকল্পনা নেয় কিছু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকারী। তখন জুগ্গাত সিং নিজের জীবনের বিনিময়ে বাঁচিয়ে দেয় পাকিস্তানগামী ট্রেনের মানুষগুলোকে। সেই ট্রেন চলে যায় নির্বিঘ্নে পাকিস্তানে। সে ট্রেনে ছিল জুগ্গাতের প্রেমিকা নুরুন। হিন্দু দাঙ্গাকারীরা গুলি করে হত্যা করে জুগ্গাত সিংকে। জুগ্গতের মৃত্যু আর নুরুনের হারিয়ে যাবার মাধ্যমে এই উপন্যাসের পরিসমাপ্তি ঘটে।

দেশভাগের পর ঘটে যাওয়া হত্যা, খুন, ধর্ষণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার এক অসাধারণ দলিল ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি