কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সেই লাইন ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা।’ বিশ্ব কবির মতো আমিও আমার দেশের প্রতি কৃতজ্ঞচিত্তে চিরঋণী। এই ঋণের সূচনা হয়েছে মাতৃগর্ভ থেকেই। মায়ের জঠরে তিলতিল করে বেড়ে ওঠার সময় পেয়েছিলাম আমার দেশমাতৃকার বায়ুবাহিত অক্সিজেন। মাতৃগর্ভে বেড়ে উঠেছি মায়ের সঞ্জীবনী শক্তির নির্যাস আস্বাদনে, যা আমার মা পেয়েছিলেন এ দেশের মাটিতে উত্পাদিত খাদ্যশস্য থেকে। স্কুলে পড়েছি বিনা পয়সায়, এমনকি মাধ্যমিক স্কুলে পড়ার সময় ৫ টাকা বেতনের মধ্যেই সিঙ্গারা বা গজার মতো মজার টিফিন দেওয়া হতো আমাদেরকে। সব সময় মনে পড়ে এদেশের পারিবারিক বন্ধনে ভাইবোন, মা-বাবা কীভাবে আমাদের জীবনের নানান সংকটে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমি গর্বিত এদেশে জন্মগ্রহণ করে। এমন একটি সুন্দর দেশের জন্য নববর্ষের শুরুতে কিছু শুভ প্রত্যাশা করতেই পারি।
নতুন বছর মানেই নতুন প্রাণের স্পন্দন, নতুন প্রত্যাশা, নতুন সম্ভাবনা। গেল বছরের সব কিছুকে পেছনে ফেলে নতুন বছরে অমিত সম্ভাবনার পথে শুধুই এগিয়ে চলা। এই বছরের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, সারা পৃথিবী হোক করোনামুক্ত। মা ষোল বছর হলো গত হয়েছেন। দেশকে মায়ের আসনেই অধিষ্ঠিত করেছি। এদেশকে আমি দেখি সম্ভাবনার সমুজ্জ্বল ক্ষেত্র হিসেবে। এই সম্ভাবনা বিকাশে নতুন বছরের প্রাক্কালে সবার কাছে আমার প্রত্যাশা হলো আমাদের সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার নেপথ্যে দেশের যে অবদান তা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করা। আমি বিশ্বাস করি, দেশের প্রতি কৃতজ্ঞ মানুষ কখনো জ্ঞাতসারে দেশের ক্ষতি করতে পারেন না। তাদের হাত ধরেই দেশ এগিয়ে চলে দুর্বার গতিতে। নতুন বছরের প্রাক্কালে আমরা হবো ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত। বিশ্বের চারদিকে দৃষ্টি প্রসারিত করি, দেখব ভোগবাদী যে কোনো দেশ বা জাতিরই পতন ঘটেছে। কোনো সৃষ্টির পেছনে রয়েছে কারো না কারো নিঃস্বার্থ অবদান ও আত্মত্যাগ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার পঞ্চান্ন বছরের জীবনে বারো বছরের বেশি সময় অন্তরীণ থেকেছেন কারাগারে। তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে এদেশের নির্যাতিত ও শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি। তিনি যদি তত্কালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা করতেন বা লোভ ও ভোগের হাতছানিতে নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলতেন তাহলে আমরা স্বাধীন দেশ পেতাম না।
২০২১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। গত ৫০ বছরের পথ-পরিক্রমায় অনেক গৌরবময় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পৃথিবীর ১০৪টি দেশের মধ্যে আয়তনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান একানব্বইতম।
এমন একটি স্বল্পআয়তনের ক্ষুদ্র দেশ স্বাধীনতার ৫০ বছরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে পৃথিবীর বুকে শীর্ষ দশে অবস্থান করছে। যেমন : ইলিশ উত্পাদনে প্রথম, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয়, চাল উত্পাদনে তৃতীয়, ছাগল উত্পাদনে চতুর্থ, আম উত্পাদনে সপ্তম, আউটসোর্সিং-এ অষ্টম, আলু উত্পাদনে সপ্তম, সবজি উত্পাদনে তৃতীয়, বাইসাইকেল রপ্তানিতে অষ্টম, মৌসুমী ফল উত্পাদনে দশম, পাট রপ্তানিতে প্রথম, মাছ উত্পাদনে তৃতীয়, কাঁঠাল উত্পাদনে তৃতীয়, পেয়ারা উত্পাদনে অষ্টম, ওয়ানডে ক্রিকেটে সপ্তম। এছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রে স্বাধীনতার ৫০ বছরে রয়েছে প্রভূত অগ্রগতি। বাজেটের আকার হয়েছে ২০২১ সালে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬ শত ৮১ কোটি টাকা, জিডিপির আকার ২৮ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে, জিডিপির বৃদ্ধি করোনাকালীন সময়ে ৬.১ অর্জিত হয়েছে, মাথাপিছু আয় ২০২১ সালে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৫৫৩ মার্কিন ডলার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে, রপ্তানি আয় ২০২১ সালে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (সেবা খাতসহ), রেমিট্যান্স আয় হয়েছে ২০২১ সালে ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৫০ বছর আগে সদ্যস্বাধীন বংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশের বেশি এখন তা ২১ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। এ ছাড়াও চলমান রয়েছে বৃহত্ মেগা প্রকল্পসমূহ। নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন হচ্ছে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজ চলমান, তৃতীয় সমুদ্রবন্দরের (পায়রা বন্দরের) কাজ চলমান, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের কাজও দ্রুগতিতে এগিয়ে চলেছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৩.২ বছর, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ উেক্ষপণের মাধ্যমে স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবতা। এই স্বপ্ন অর্জনের পেছনে যার অবদান তিনি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি পিতার মতোই ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত ও নির্মোহ রাষ্ট্রনায়ক। তাই নতুন বছরের প্রত্যাশা থাকবে সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনা ধারণ এবং বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা।
বাংলাদেশ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির যুগে প্রবেশ করেছে। চতুর্থ ও তত্পরবর্তী শিল্পবিপ্লবের অগ্রসৈনিক হওয়ার মূল শক্তি অঙ্কের পারদর্শিতা। প্রোগ্রামিং পারদর্শিতায় ১ থেকে ১০ পর্যন্ত দেশের নামগুলি উল্লেখ করছি- চীন, রাশিয়া, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, হাঙ্গেরী, তাইওয়ান, জাপান, ফ্রান্স, চেক রিপাবলিক এবং ইতালি। এদের প্রোগ্রামাররা বিশ্ব সেরা। খোঁজ নিয়ে দেখুন তাদের প্রোগ্রামিং উত্কর্ষতার শেকড়ের শক্তি অঙ্ক। শুধু চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নয় যে কোনো শিল্পে উত্কর্ষ সাধনের মূল কাঁচামাল হলো গণিত। এছাড়া গবেষণাকে যদি আমরা শরীর হিসেবে কল্পনা করি তাহলে এর হূদপিণ্ড হচ্ছে অংক। আমার নতুন বছরের প্রত্যাশা হবে জাতি হিসেবে যেন আমরা গণিতের জাদুকরী শক্তিকে অনুধাবন করতে পারি এবং এর উত্কর্ষ সাধনে সর্বস্তরে মনোযোগী হই। দেশে উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতির পরিমাণও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন গবেষণাধর্মী সংস্থার। নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখি নানান অনিয়মের অভিযোগ। নিয়োগে অনিয়ম দূর করতে না পারলে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ রুগ্ণ ও অসত্ হয়ে পড়বে। ফলে তাদের দ্বারা উন্নয়নমূলক কোনো পরিকল্পনাই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে না। সরকারি নিয়োগ, ভর্তি পরীক্ষা ও পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও টাকা লেনদেনে শাস্তি হওয়া উচিত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে—এমন প্রত্যাশাই থাকবে নতুন বছরের শুরুতে।
বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ করতে পারলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং দেশের বাইরে অর্থ পাচার রোধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নেবে সরকার, নতুন বছরে এমন প্রত্যাশা আমার, আপনার, সবার। সবার সহযোগিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগে নতুন বছর হয়ে উঠুক আমাদের জন্য কল্যাণকর। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক এই কামনা করি প্রতিক্ষণে, প্রতিমুহূর্তে।
লেখক :উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
