মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের মালিক কর্মচারীরাই যখন মাদকাসক্ত!

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২২, ০২:৪১

নিরিবিলি পরিবেশ, বাইরে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সাইনবোর্ড। অনেকেই মাদকাসক্তি থেকে মুক্তির জন্য আসতেন সেখানে। কিন্তু ভেতরের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। ভেতরে রোগীদের ওপর চালানো হতো নির্যাতন। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের আড়ালে মাদক ব্যবসা, রোগীদের শারীরিক নির্যাতন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় ভর্তি রেখে অর্থ আদায় এবং অনৈতিক কার্যক্রম চলত গাজীপুর সদরের ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে। শুধু তা-ই নয়, পুনর্বাসন কেন্দ্র হলেও প্রতিষ্ঠানটির মালিক থেকে কর্মচারী সবাই নিজেরাই মাদকাসক্ত।

ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে পুনর্বাসন কেন্দ্রের মালিক নাজনিন ফিরোজা বাঁধনসহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার ও একজন চলচ্চিত্র অভিনেতাসহ ২৮ জনকে উদ্ধারের পর এ তথ্য জানিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

র‌্যাব বলছে, অন্য মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে কৌশলে নিরিবিলি চিকিৎসার কথা বলে ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে রোগী ভাগিয়ে আনা, রোগীদের আটকে রেখে নির্যাতন করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করাই ছিল মালিক নাজনিন ফিরোজা বাঁধনের মূল ব্যবসা। যারাই প্রতিবাদ করত তাদেরই নির্যাতন করত বাঁধনের স্বামী সিপন ও তার গুণ্ডা বাহিনী। গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর বছিলা র‌্যাব-২ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, গত ১ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সমিতির’ পক্ষ থেকে র‌্যাব-২ এর কাছে অভিযোগ করা হয় যে, একজন চিত্রনায়ক দীর্ঘদিন তাদের কার্যক্রমে অনুপস্থিত রয়েছেন। ঐ চিত্রনায়ককে গাজীপুর সদরের ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে আটক রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে।

প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব সদর দফতর ও র‌্যাব-২ এর গোয়েন্দা দল অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য গাজীপুর সদরের ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরে ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে র‌্যাবের অভিযানে মালিকসহ আটক পাঁচ জনের নামে বুধবার সন্ধ্যায় সদর মেট্রো থানায় র‌্যাবের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। র‌্যাব-১-এর সুবেদার ওমর আলী মামলাটি করেন। সদর থানার ওসি (তদন্ত) রাফিউল ইসলাম রাফি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মামলার আসামিরা হলো—ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের মালিক লালমনিরহাট জেলার মৃত জহির হোসেনের মেয়ে নাজনিন ফিরোজা বাঁধন, গাজীপুর জেলার নাজিম উদ্দিনের পুত্র মনোয়ার হোসেন ওরফে সিপন, একই জেলার আবুল খানের পুত্র মো. রায়হান খান, টাঙ্গাইল জেলার মৃত দিখন্দ্র মোহন শাহের পুত্র দিপংকর শাহ ওরফে দিপু ও মৃত আনোয়ার হোসেনের পুত্র জাকির হোসেন আনন্দ। এরা ঐ কেন্দ্রের কর্মচারী। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪২০ পিস ইয়াবা, লাঠি, স্টিলের পাইপ, হাতকড়া, রশি, গামছা, খেলনা পিস্তল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার পর তাত্ক্ষণিকভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন।

এদিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত বাঁধন র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছেন, ২০০৯ সালে ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রটি অনুমোদনহীনভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৩-২০১৪ সালে সাময়িক অনুমোদন পান। প্রতি রোগীর কাছ থেকে মাসিক চার্জ হিসাবে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করতেন। নিরাময় কেন্দ্রে দুই জন চিকিৎসক থাকার কথা বললেও কোনো চিকিৎসক ছিল না।

ইত্তেফাক/এমএএম