চাকরির পরীক্ষা বিকেন্দ্রীকরণ প্রসঙ্গে 

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:৪৫

দেশে প্রতিনিয়ত বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ-তরুণী চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। এদের বড় একটি অংশ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। অর্থাৎ বেকারদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষিত বেকার।

যাদের বয়স ৩০ বছরের মধ্যে। তারা সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালান। কিন্তু অধিকাংশ চাকরির পরীক্ষা রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ সমস্ত বেকারদের কাছে এখন তা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেকার ছেলেরা কষ্টেসৃষ্টে ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে এলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে তা খুবই কষ্টসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রাজধানীর বাইরে হচ্ছে। মানুষ এখন রাজধানীমুখী না হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে চাকরির পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে। বর্তমানে সফলভাবে নিকটস্থ বিভাগীয় শহরে শিক্ষার্থী কিংবা পরীক্ষার্থীরা বিভিন্ন পরীক্ষা দিচ্ছেন। এত কিছুর পরেও বেকারদের জন্য তেমন সু-খবর নেই। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে, শত প্রতিকূলতা ছিন্ন করে চাকরির পরীক্ষা দিতে তাকে যেতে হচ্ছে রাজধানী ঢাকায়।

সরকারি চাকরির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) বিসিএসের প্রিলিমিনারি এবং লিখিত পরীক্ষাপ্রার্থীদের নিকটস্থ বিভাগীয় শহরে নিয়ে থাকলেও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক চাকরির ক্ষেত্রে সে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা তেমন সম্ভব হয়নি। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেকারদের শারীরিক, মানসিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়। আবার সদ্যস্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাশ করা এক জন বেকারের পক্ষে ঢাকায় গিয়ে বসবাস করাও কঠিন ব্যাপার। এজন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে এক অঞ্চল থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে ঢাকায় গিয়ে বসবাস করার ক্ষেত্রে বেকারদেরকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে চাকরি শূন্য হাতে পূর্বের স্থানে ফিরে যেতে হয়। সম্প্রতি পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বেকারদের জন্য ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভালো প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে সময়মতো পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। দীর্ঘসময় যাত্রার কারণে অনেকে পরীক্ষায় খারাপও করেন। আবার রাজধানী ঢাকায় গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন স্থানে খুঁজে বের করতে হয় পরীক্ষার কেন্দ্র। এত কিছু করতে গিয়ে এক জন বেকারকে পাড়ি দিতে হয় সমুদ্র সমান দূরত্ব। অন্তত সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে যেগুলোতে প্রতিযোগীর সংখ্যা বেশি সেগুলো নিকটস্থ বিভাগীয় শহরে হোক এমনটাই প্রত্যাশা করেন চাকরি প্রার্থীরা। এ সমস্ত চাকরির প্রিলিমিনারি এবং লিখিত পরীক্ষা নিকটস্থ বিভাগীয় শহরে নিয়ে মৌখিক পরীক্ষাগুলো ঢাকায় নিলে বেকারদের ভোগান্তি লাঘব হবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সবার তেমন কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়াতে দিনশেষে হতাশা ভর করে বেকারদের পিঠে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে বেকারত্বের হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ‘ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক : ট্রেন্ড অন ২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে যুব বেকারত্বের হার ১১.৬ শতাংশ। আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, করোনা ভাইরাস সংকটে বিশ্বে প্রতি ছয় জনের একজন বেকার হয়েছে আর বাংলাদেশের প্রতি চার জন যুবকের মধ্যে একজন কর্মহীন বা বেকার রয়েছে (২৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ)। বর্তমানে এসব বেকার অধিকাংশ সরকারি চাকরির পেছনে ছুটে। কিন্তু বেকাররা চাকরির বাজারে প্রবেশ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও পরীক্ষার কেন্দ্র বা শহর নিয়ে পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। রাজধানী ঢাকায় গিয়ে সব পরীক্ষা দেওয়ার এই ভোগান্তি এখন মহীরুহ আকার ধারণ করেছে।

ব্যস্ততম নগরী ঢাকা থেকে চাকরির পরীক্ষা বিভাগীয় শহরমুখী হলে এসমস্ত বেকাররা কিছুটা স্বস্তি পেত। সময়, অর্থ, নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয় বিবেচনা করে চাকরি প্রার্থীদের আকুল আবেদন পরীক্ষাকেন্দ্র যেন নিকটস্থ বিভাগীয় শহরে হয়। এমন সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দিন গোনে হাজারো বেকার। অবিলম্বে চাকরির পরীক্ষার ক্ষেত্রে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত আসুক, এটাই সবার প্রত্যাশা। নতুবা বেকারদের অবস্থা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হবে।

লেখক :শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ 

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন