বাংলাদেশ ২০২২ সালের গোঁড়ায় কোথায় দাঁড়িয়ে—এটা বুঝতে এখন পৃথিবীর অন্যত্র দাঁড়িয়ে থেকেও পুরোপুরি নির্ভর করা যায়। সত্তরের দশকের গোঁড়ায় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের শেষে যখন বাংলাদেশের জন্ম হয়, সেদিন অনেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—এটা হবে একটি নিশ্চিত ব্যর্থ রাষ্ট্র। আমেরিকার তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর একটু আগ বাড়িয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশ তো একটি ‘বাস্কেট কেস’। তবে আজ মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে গোটা বিশ্ব বাংলাদেশকে নিয়ে ঠিক উলটোটাই বলছে।
পাকিস্তানের অংশ পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সেই সময়ের অবস্থান এবং বর্তমান বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের তুলনা করলে বিস্ময়ের বিষয়টি সবার চোখেই ধরা পড়বে। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তান শতকরা ৭০ ভাগ বেশি সম্পন্ন ছিল। আর আজ সেই পাল্লাটা ঠিক যেন উলটে গিয়েছে। একদিন যে ভূখণ্ড ছিল পাকিস্তানের হতদরিদ্র ও ব্যাধিজর্জরিত এক অঞ্চল, আজ তা অর্থনীতির মোট আয়তন এবং আপেক্ষিক বিচারে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ এখন আনুমানিক ৪৫ ভাগ বেশি সম্পন্ন। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৫৫৪ মার্কিন ডলার, আর পাকিস্তানের আয় মাত্র ১ হাজার ৫৪৩ মার্কিন ডলার। মাথাপিছু আয়ে বাংলাদেশ ভারতকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থবাজারে বাংলাদেশি বড় উদ্যোগীর পরিচিতি ক্রমশ বাড়ছে। পোশাক রপ্তানির পাশাপাশি ওষুধ, বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং এবং অর্থলগ্নি প্রযুক্তির মতো নানা ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অগ্রগতি দৃশ্যমান ।
গত বছরটা তার পরও হাসির বোঝা নিয়ে আসতে পারেনি আমাদের কাছে। আমরা গল্প বলেছি—মৃত্যুর গল্প। তার আরম্ভ ছিল বেশ ধোঁয়াটে, বিস্তারও ছিল অপ্রতিরোধ্য। মানুষ যত উন্নতিই করুক, যত সুখেই থাকুক—মৃত্যুর কাছে সে বড় বেশি অপ্রস্তুত, নিঃসঙ্গ ও নিঃস্ব। প্রায় পুরোটা বছর জুড়েই এর একটা সামগ্রিক বিস্তার ঘটেছে। দমবন্ধ করে আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আলো ও আঁধারের মধ্যেই চিন্তা ও যাবতীয় যা ভাব, তার আদান-প্রদান তাকে সেরে নিতে হলো কার্পণ্যে, একটিমাত্র শব্দে—যে শব্দটি হয়ে দাঁড়িয়েছিল গত বছরের জীবনের স্তব্ধতার ভাষা—‘অতিমারি’। তাই ২০২১ সালটি যেন আমাদের কাছে ধরা দিয়েছিল সব প্রত্যাশা ছাপিয়ে নতুন এক আর্তনাদে—‘আমরা যেন বেঁচে থাকি এ বছর; আমরা যেন ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারি।’ সকালে ঘুম থেকে জেগেই জেনেছি, আমাদের কারো কারো চাকরি চলে গিয়েছে, জমানো সম্পদ শেষ হয়ে গিয়েছে। তার পরও আমরা বেঁচে আছি এখনো। এত কিছুর পরও আমরা সেই আনন্দটুকু একেবারে লেপটে নিতে ভুলিনি।
নতুন বছর ২০২২ ভোর নিয়ে এসেছে—এখনো তা বলার সুযোগ হয়নি। তবুও আশা করছি, ২০২২ একটি ভোরের দিকেই ছুটছে; একটি মুখোশহীন পৃথিবীর দিকেই ছুটছে। এই আশাবাদ নিয়েই আমরা বাঁচতে চাই। এই আশাবাদ দিয়েই বাংলাদেশের ২০২২ সাল আসুক, এমনটা ভাবতে চাই। আশাবাদ করতে চাই, অতি মারি থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে যাবে। পৃথিবীর অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টি ফিরবে বাংলাদেশের প্রতি, উন্নয়নের সূত্রে প্রশংসা আসবে—‘বাংলাদেশ ইজ এ টাইগার ফোর্স’। খাদ্যনিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্তি, রপ্তানি বৃদ্ধি, অর্থনীতিতে নারীর আরও অংশগ্রহণ—এ সবই নিয়ে আসবে বাংলাদেশের জন্য ২০২২ সাল। এর পর আর পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা নয়, বরং অসাম্প্রদায়িক, ঐক্য, দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, সামাজিক সহিষ্ণুতা এবং গত ৫০ বছরের অর্জন বাংলাদেশকে আরো একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে—এ আলোই যেন দান করছে ২০২২-এর সকালটি। বাংলাদেশ অর্জন করবে মানবিকতা, সহমর্মিতা, আত্মবিশ্বাস আর ক্ষমতার সংস্কৃতি। তবে সেই শুরুর লগ্নে একটুখানি সাবধানতার বাণীও উচ্চারণ করতে চাই। ২০২২ সেই শিক্ষাই দিক, যেখানে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজের রূপের মোহে কেউ যেন পাগল হয়ে না যায়। কল্পনায় কেউ যেন নিজেকে বিরাট কোনো কেউকেটা বলে মনে না করে; অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ যেন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্হায় প্রবেশ করতে পারে। রাষ্ট্র এবং মানুষ বেরিয়ে আসুক শঠতা আর প্রতারণার প্রবণতা থেকে। তাত্ক্ষণিক ঝোঁকের বশে রাষ্ট্র যেন বড় কোনো ঝুঁকি না নিয়ে বসে; মানুষ যেন বেরিয়ে আসে অসামাজিক ও বেআইনি কাজ থেকে। পরিবর্তে ধারণ করে নেয় সহানুভূতি আর সহমর্মিতার মানবিক সংস্কৃতি। দেশ ফিরে আসুক নির্বাচনের প্রতিযোগিতায় আর সুস্থ রাজনীতিতে। দেশ বেরিয়ে আসুক সব ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণতা আর স্বৈরতান্ত্রিক ধ্যানধারণা থেকে।
আলো এবং অন্ধকার, দীপ্তি ও তমসা—এ নিয়েই জগত্সংসার, এ নিয়েই মানুষের চরিত্রবৃত্তি। বাংলাদেশও এ থেকে আলাদা নয়। বছরের শুরুতেই রাষ্ট্রব্যবস্হা এবং রাষ্ট্রের মানুষের উজ্জ্বল দিকগুলোর সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার দিকগুলোকেও চিনে নেওয়া প্রয়োজন। তাই বছরের শুরুতেই এই সতর্কতার বাণী। বাংলাদেশের গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়ে সব কর্তৃত্ববাদের অবসান ঘটাক, বাংলাদেশ দুর্নীতি দূরে রাখার চেষ্টায় ও মানবাধিকার নিশ্চিতে সমর্থক পদক্ষেপ গ্রহণ করুক, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবিকাশ ঘটুক, নির্বাচনে স্বচ্ছতা ফিরে আসুক, বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে প্রহরায় ফিরে আসুক ইত্যাদি অনেকগুলো প্রত্যাশাই আমরা করতে চাই ২০২২ সালের এই সকালে। আমরা সব শুভ আর মঙ্গল ভবিষতের আশায় উন্নত আশাবাদ রাখতে চাই, যেন সমাজ সংস্কারের পরিসরটি কোনো পক্ষ ভুল করে আস্ত খুইয়ে না বসে।
লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা
