বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

 ইসলামে দান-সদকার তাত্পর্য

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২২, ১১:২৭

দান-সদকা করলে মনে শান্তি আসে। দানের কারণে নানান বালামুসিবত থেকে মহান রব আমাদের হেফাজত করেন। দান করলে ধনসম্পদ বেড়ে যায়, কমে না। তাই দানের হাত প্রসারিত করলে আমাদের ও প্রতিবেশী গরিব-দুঃখীসহ অনেকের উপকার হয়। মহান রব বলেন, ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান-সদকা করো, তবে তা কতই না উত্তম। আর যদি গোপনে ফকির-মিসকিনকে দান করে দাও, তবে আরও বেশি উত্তম। আর তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সুরা :বাকারা, আয়াত :২৭১)

ইসলামি পরিভাষায় দান করাকেই সদকা বলা হয়। সদকা শব্দটি এসেছে আরবি ‘সিদকুন’ থেকে। অর্থ :সত্যতা, যথার্থতা। পরিভাষায় সদকা বলা হয়, একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করার লক্ষ্যে স্বীয় সম্পদ ব্যয় করা। সদকা দুই প্রকার। (১) সাধারণ সদকা (২) সদকায়ে জারিয়া। গরিব দুঃখীকে টাকাপয়সা দান করা, ভালো ব্যবহার করা সাধারণ সদকার অন্তভু‌র্ক্ত। আর সদকায়ে জারিয়া বলা হয় ঐ সব সত্কর্ম, যেগুলোর কল্যাণকারিতা স্থায়ী হয়। এর মধ্যে সর্বাগ্রে হচ্ছে দিনি এলেম শিক্ষা দান, দিনি বইপুস্তক রচনা ও প্রকাশ করে সর্বসাধারণের মধ্যে এলেম পৌঁছানো। কারণ, দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে মানবসন্তানের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর বিষয় হচ্ছে, আল্লাহর সঙ্গে, তার বিধিবিধানের সঙ্গে এবং রাসুলের সঙ্গে পরিচিতি লাভ। এক ব্যক্তি অন্যকে যদি দিনি এলেম শিক্ষা দেন তবে সে ব্যক্তি নিজে আমল করবে এবং প্রত্যক্ষভাবেই হোক বা পরোক্ষভাবেই হোক পরবর্তী কাউকে না কাউকে শিক্ষা দেবে। এভাবে কেয়ামত পর্যন্ত এ সৎ কাজের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।

হজরত মুহম্মদ (স.) ঐ ব্যক্তিকে সর্বাপেক্ষা বড় দাতারূপে আখ্যায়িত করেছেন, যিনি পবিত্র কোরআন সুন্নাহর এলেম অন্যদের শিক্ষা দেন। তার পরের স্থান মসজিদ, এতিমখানা, মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট, সেতু, পুকুর প্রভৃতি গণকল্যাণমূলক খাতে দান করা। এসবের দ্বারা অনেক বেশি লোক উপকৃত হন এবং উপকারটুকু দীর্ঘদিন স্হায়ী হয়।

হজরত আবু হুরায়রাহ (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রসুল পাক (স.) বলেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি মৃতু্যবরণ করে, তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ব্যতীত, সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান অথবা সত্কর্মশীল সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম শরিফ, হাদিস নম্বর-১৬৩১) ইমাম আন-নববি (রহ.) এই হাদিসখানার ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, ‘সদকায়ে জারিয়া হলো ওয়াকফ।’ (শরহে মুসলিম -১১/৮৫)।

অসংখ্য আয়াতে দান-সদকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘তারা আপনার কাছে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে? (আল্লাহ বলেন,) জানিয়ে দিন, যা তোমাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত।’ (সুরা বাকারা :আয়াত ২১৯)

মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-খয়রাত বরবাদ করো না সে ব্যক্তির মতো যে নিজের ধনসম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না।...’ (সুরা :বাকারা, আয়াত ২৬৪) এছাড়া সুরা আঘ্যারিয়াতের ১৯ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই তোমাদের সম্পদে নিঃস্ব ও অসহায়দের অধিকার রয়েছে। অর্থাত্ আমরা যা দান করি, কোরআনের দৃষ্টিতে তা দয়া নয়; তা অসহায়দের অধিকার বা হক্কুল ইবাদ। আপনি যখন দান করেন, তখন আপনি সৃষ্টির অধিকারকেই সম্মান করেন। তখন স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করবেন।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘এবং তাদের সম্পদে নির্দিষ্ট হক রয়েছে। ভিক্ষুক এবং বঞ্চিত (অভাবী অথচ লজ্জায় কারো কাছে হাত পাতে না) সবার হক রয়েছে।’ (সুরা :মাআরেজ, আয়াত :২৪-২৫) পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ পাক আরও ইরশাদ করেন, ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করে তার উদাহরণ হচ্ছে সেই বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শিষ জন্মায়। আর প্রতিটি শিষে ১০০টি করে দানা থাকে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অতিরিক্ত দান করেন। আল্লাহ সুপ্রশস্ত সুবিজ্ঞ।’ (সুরা :বাকারা, আয়াত :২৬১)

অসংখ্য হাদিসেও দান-সদকার ফজিলত তুলে ধরা হয়েছে। গোপনে দান করার ব্যাপারে হাদিসে অধিক ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। গোপনে দানকারী কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া লাভ করবে, নবি (স.) বলেন, ‘কিয়ামত দিবসে সাত শ্রেণির মানুষ আরশের নিচে ছায়া লাভ করবে। তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হচ্ছে, ‘এক ব্যক্তি এত গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত কী দান করে বাম হাত জানতেই পারে না।’ (বুখারি ও মুসলিম)

দান-সদকা গুনাহ মাফ করে ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচায়। নবি (স.) বলেন, ‘হে কাব বিন উজরা! নামাজ (আল্লাহর) নৈকট্য দানকারী, রোজা ঢালস্বরূপ এবং দান-সদকা গুনাহ মিটিয়ে ফেলে, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে ফেলে।’ (আবু ইয়ালা, সনদ সহিহ) রসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘খেজুরের একটি অংশ দান করে হলেও তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করো।’ (বুখারি ও মুসলিম)

কাদের দান করা যাবে—এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে তাদের তালিকা দেওয়া হয়েছে। যথা, ‘জাকাত হলো কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্য এবং মুসাফিরদের জন্য—এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা :তাওবা, আয়াত :৬০) এ আয়াত দ্বারা ফকিহগণ মোট আট শ্রেণির লোকদের দান করার কথা বলেছেন।

(১) গরিব। যার সম্পদ আছে কিন্তু নেসাব পরিমাণ মালের মালিক নয়। (২) মিসকিন। যার একদমই কোনো সম্পদ নেই। (৩) ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য শরিয়ত-নির্দিষ্ট জাকাত আদায়কারী আমেল। এটা ইসলামি রাষ্ট্রপ্রধান দ্বারা নিযুক্ত হতে হবে। নিজে নিজে মনে করে নিলে হবে না। (জাওয়াহিরুল ফিক্বহ-৬/৬৯

(৪) নব মুসলিমদের ইসলামের প্রতি মোহাব্বত বাড়ানোর জন্য উত্সাহমূলক জাকাত প্রদান। এ বিধানটি রহিত হয়ে গেছে। তাই বর্তমানে কোনো ধনী নওমুসলিমকে জাকাত প্রদান জায়েজ নয়। (হিদায়া-১/১৮৪, মাআরিফুল কোরআন-৪/১৭১, তাফসিরে মাযহারি-৪/২৩৫) (৫) দাসমুক্তির জন্য। যেহেতু বর্তমানে দাসপ্রথা নেই। তাই এ খাতটি বাকি নেই। (৬) ঋণগ্রস্তের জন্য।

(৭) ফি সাবিলিল্লাহ। তথা আল্লাহর রাস্তায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য। এখন প্রশ্ন হলো আল্লাহর রাস্তায় কারা আছে? ফুক্বাহায়ে কেরাম বলেন, এতে রয়েছেন জিহাদরত মুজাহিদরা। তাদের জিহাদের অস্ত্র ও পাথেয় ক্রয় করার জন্য জাকাতের টাকা গ্রহণ করবে। হজের সফরে থাকা দরিদ্র ব্যক্তির জন্য। ইলমে দিন অর্জনকারী দরিদ্র ব্যক্তির জন্য। (আদ দুররুল মুখতার-৩৪৩, হিদায়া-১/১৮৫, রূহুল মাআনি-৬/৩১৩) (৮) সফররত ব্যক্তিকে। যার টাকাপয়সা আছে বাড়িতে। কোনো সফর অবস্থায় অসহায়। তাকে জাকাতের টাকা দেওয়া জায়েজ।

মহান আল্লাহ আমাদের এ আলোচনার ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখক : ইমাম, মসজিদ আল আনাস (রা.), জিজান, সৌদি আর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা আজ

শাওয়াল মাসের আমলসমূহ

বেসরকারিভাবে হজ পালনে খরচ পড়বে যত

সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের খরচ বাড়লো লাখ টাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক সন্ধ্যায় 

ঈদ কবে, জানা যাবে রবিবার

আজ রমজানের শেষ জুমা

সদাকাতুল ফিতর পবিত্র রমজান মাসের অন্যতম ইবাদত