বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ফ্রানৎস কাফকার মেটামরফোসিস 

জীবন কি ‘পোকা’ হয়ে ওঠারই নাম? 

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৮:৪৪

মানুষ নিছক একা, একমাত্র নিজে ছাড়া তার কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী নেই। যে-জীবনকে আমরা ‘জয়শ্রী’ বলে জানি, সে জীবন হয়তো কেবল মানুষ থেকে ‘কীটপতঙ্গ’ বা ‘পোকা’ কিংবা ‘পোকার মতো’ হয়ে ওঠার রূপান্তরেরই নাম! 

‘মেটামরফোসিস’ বা ‘রূপান্তর’ পড়ার আগেও ফ্রানত্স কাফকার কিছু ছোটগল্প পড়া হয়েছে। কিন্তু রূপান্তর আমায় ভয়ঙ্করভাবে তলিয়ে দিয়েছে কাফকাতে। রূপান্তরের প্রথম খণ্ড রাতে পড়ে শেষ করেছিলাম। শেষ করেছিলাম বললে ভুল হবে। যেহেতু সম্পূর্ণ রাতই আমি এই গল্পের নায়ক গ্রেগর সামসার অনুভূতির জাল থেকে এক সেকেন্ডের জন্যও বেরোতে পারিনি, সেহেতু একে ‘শেষ করেছিলাম’ বললে নিছক ভুলই হবে। গল্পের শুরুটা সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত বাস্তবতা থেকে অনেক দূরবর্তী প্রেক্ষাপটে তৈরি হলেও এ-গল্পে সবাস্তব কল্পনার ঘটনাজারিত বাস্তবধারার চিত্রায়ণ গল্পটিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অদ্ভুত কোনো স্বপ্নের কাঠগড়ায়। রিয়ালিস্ট আবহের মধ্যে ছুড়ে দেয় এক এক্সপ্রেশনিস্ট বোমা।

গল্পের প্রধান চরিত্র গ্রেগর সামসা একজন ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান। শত প্রতিকূলতার মাঝেও সে একদিনের জন্যও কাজে অনুপস্হিত থাকেনি। দায়িত্বশীল সন্তানও বটে, সংসারের সবার সকল প্রয়োজন একাই পালন করে এসেছে অত্যন্ত মমতাসহকারে। একদিন গ্রেগর ঘুম ভাঙার পরে নিজেকে অসংখ্য পা-বিশিষ্ট সম্পূর্ণ এক পতঙ্গ বা পোকা রূপে আবিষ্কার করে। এবং তার এই রূপান্তর হওয়াকে কেন্দ্র করে ঘটে-যাওয়া নানা ঘটনার প্রবাহই এই ‘মেটামরফোসিস’ বা ‘রূপান্তর’।

গ্রেগর সামসার এই রূপান্তরে অফিসের প্রধান কেরানি থেকে শুরু করে বাড়ির পরিচারিকার বিবর্তন পাঠকের মনে ভাবনার এক বিশাল ক্যানভাস উন্মোচিত করে। সংসারের অধীশ্বরের স্হানে বসে থাকা মানুষটাকে মুহূর্তে নামিয়ে দেয় ডাস্টবিনের চেয়েও নিম্নবর্গে। সকলের বোঝা বহনকারী নিঃস্বার্থ মানুষটি সবার কাছে হয়ে যায় দুর্গন্ধযুক্ত বোঝা। তার বাবা-মা গ্রেগরের এই পতঙ্গ-রূপ মেনে নিতে পারেননি। প্রথম দিকে ছোট বোন খুব সমীহের সঙ্গে তার পরিচর্যা করলেও পরবর্তী পর্যায়ে গ্রেগরকে তাদের পরিবারের সদস্য মানতেও অস্বীকার করে। সম্ভমপূর্ণ সম্পর্ক ছিল যে বাবার সঙ্গে, তিনিই তাকে আঘাত করেন এবং গ্রেগর মৃত্যু কামনা করে। অথচ এমন অবস্হায়ও গ্রেগর স্বপ্ন দেখে চলে সুস্হজীবনে ফিরে আসার, বাবা-মাকে আরো ভালো রাখার, বোনকে একটা গানের ইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, পতঙ্গের মতো জীবন পাওয়ায় শরীরে-শরীরে গ্রেগর পতঙ্গ বা পোকায় রূপান্তরিত হলেও অনুভূতিতে সে গ্রেগরই রয়ে যায়। পরিবারের সবাই যখন গ্রেগর থেকে মুক্তি প্রার্থনা করে, তখনো সে তাদের কষ্ট-অপমান উপলব্ধি করে দুঃখিত হয়। গ্রেগর বুঝতে পারে, সে এখন আর পরিবারের কেউ নয়। সে একটা কীট ছাড়া কিচ্ছুটি নয়। নিজেকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে নিজেকে বিচ্ছিন্নতার হাতে সঁপে দেয় প্রেগর এবং গ্রহণ করে মৃত্যুকে।

এমন সু-মানসিকতার মানুষগুলো সমাজের কাছে আসলেই পোকার মতো তুচ্ছ ভিন্ন কিছুই নয়। শরীরে না হলেও পুঁজিবাদ, সমাজ ও স্বার্থবাদী জীবনাচারের কাছে ব্যবহার হতে হতে একান্তেই পোকা হয়ে যায় এরা। আর এটাই প্রমাণ করে যে মানুষ নিছক একা, একমাত্র নিজে ছাড়া তার কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী নেই। যে-জীবনকে আমরা ‘জয়শ্রী’ বলে জানি, সে জীবন হয়তো কেবল মানুষ থেকে ‘কীটপতঙ্গ’ বা ‘পোকা’ কিংবা ‘পোকার মতো’ হয়ে ওঠার রূপান্তরেরই নাম!

গল্পের শুরুটা কল্পনানির্ভর হলেও ঘটনার পরিক্রমা চিরন্তন বাস্তবতার স্হানে অধিষ্ঠিত করেছে ‘মেটামরফোসিস’ বা ‘রূপান্তর’-এর চিত্রপট। কাফকা এক অলীক দুনিয়া থেকে নিরেট বাস্তবে নামিয়ে এনেছেন গল্পের প্রতিটি চরিত্রকে। বের করে এনেছেন বাস্তব থেকে বাস্তবকে। গল্পের প্রতি মোড়ে তাই পাঠক পান পরিতৃপ্তির ঘ্রাণ।

 

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

ওভার ট্রাম্পড

আঁধারের হাত ধরে

হুমায়ুন আজাদের সমাজদর্শন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আজ কবিগুরুর জন্মদিন

অসমাপ্ত প্রণয় 

সম্রাট আকবর তানপুরা কাঁধে নিয়ে চললেন তানসেনের গুরুগৃহে 

অমলার যুদ্ধ