বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ফাদার দ্যতিয়েন যেভাবে হয়ে ওঠেন বাঙালির আত্মজন 

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৯:০৪

বাংলাভাষার জন্য আমাদের একজন ‘ফাদার পল দ্যতিয়েন’ আছেন! তাঁর লেখাপত্র যত পাঠ করা যায় ততই বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ে আমাদের বাঙালি-মনে। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং গর্বের ব্যাপার যে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ঊনবিংশ শতক থেকে এখন পর্যন্ত অনেক ভিনদেশি মনীষী নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। এক্ষেত্রে উইলিয়াম কেরি থেকে শুরু করে হানা ক্যাথেরিন ম্যুলেন্স, মার্টিন কেম্পশেন, এলভিয়েতা ওয়াল্টার, হানা রুথ থমসন, উইলিয়াম র‍্যাদিচে, কাজু ও আজুমার নাম আমরা গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করতে পারি। এঁদের সঙ্গে বিশ্বে যে কজন বিদেশি বাংলাভাষা চর্চা করে বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ফাদার দ্যতিয়েন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

ভাষাপ্রীতির গভীরতা কোন পর্যায়ে গেলে ভিনদেশি একজনের পক্ষে এভাবে বাংলায় গদ্যরচনা সম্ভব তা ফাদার দ্যতিয়েনের বইগুলো থেকে অনুধাবন সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার প্রান্তিক গ্রামাঞ্চল ‘বাসন্তী’তে শিক্ষকতার মাধ্যমে এই ভাষার ভিতরে তাঁর প্রবেশ। সেখানকার জীবনযাত্রা, আতিথেয়তা, কথ্য ভাষারীতির বিভিন্ন বিষয় ও দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় ঘটনা তিনি তাঁর গ্রন্থে উপস্হাপন করেছেন। দীর্ঘ সাতাশ বছর ভারতবাসে দিনলিপির আদলে অনেক বাংলা প্রবন্ধ ও রম্য রচনা তিনি সৃষ্টি করেছেন, যেগুলো হাস্যরসে জারিত বাঙালি জীবনের আখ্যান। শিল্পসম্মত অভিনব রীতিতে ছন্দোবদ্ধ গদ্যে সৃষ্ট রচনাগুলোতে আছে নির্মল রসবোধ, ব্যাপক সহানুভূতি, গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং তুচ্ছ ও সামান্য বিষয়েও তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ভাবনা।

বেলজিয়ামের নাগরিক ফাদার দ্যতিয়েনের পুরো নাম ফাদার পল দ্যতিয়েন। জেজুইট সম্প্রদায়ের এই সন্ন্যাসীর মাতৃভাষা ফরাসি। সন্ন্যাসব্রত নিয়ে ১৯৪৯ সালে তিনি কলকাতায় আসেন। এ দেশের মানুষ ও সমাজব্যবস্হার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তিনি সংস্কৃত ও বাংলা ভাষা শিখেছিলেন। এরপর পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুরে বসবাসের সুবাদে এই ভাষা চর্চার সূত্রপাত ঘটে। বিশ্বভারতী ও কলকাতায় তা উত্কর্ষ পায়। এভাবে বেলজিয়ামের ফরাসিভাষী মানুষটি নিজের ভেতর অনুভব করেন বাংলার প্রতি প্রবল আকর্ষণ। বাংলার স্বতন্ত্র ধ্বনি, ইতিহাস এবং সমাজজীবনকে আবিষ্কার করে বাংলাতেই লিখতে শুরু করেন তিনি। তাঁর স্বকীয়তায় বাংলা সাহিত্যে সংযোজিত হয়েছে রম্যরচনা ‘ডায়েরির ছেঁড়া পাতা’ (১৯৭১), ‘রোজনামচা’ (১৯৭৩), ‘আটপৌরে দিনপঞ্জি’ (২০১৩), ‘লালপেড়ে গল্পাবলি’ (২০১৫) ও ‘সাদাসিধে খসড়া’ (২০১৭), অনুবাদ সাহিত্য ‘ছোট্ট রাজকুমার’ (১৯৭০) ও ‘খ্রিষ্টানুকরণ’ (১৯৭১), সম্পাদিত গ্রম্হ ‘উইলিয়াম কেরির ইতিহাসমালা’ (১৯৭২) ও সংকলন গ্রন্থ ‘গদ্যপরম্পরা’ (১৯৭৭)। ‘গদ্যপরম্পরা’ চার শ পঁচাশি জন বিশিষ্ট বাঙালি লেখকের নির্বাচিত গদ্য সংকলন। বাংলাভাষার গদ্যসাহিত্যের আদি যুগ থেকে বিশ শতকের সত্তরের দশক পর্যন্ত বিশিষ্ট গদ্যশিল্পীদের প্রতিনিধিত্বমূলক শ্রেষ্ঠ গদ্য নির্বাচন করেছেন সম্পাদক ফাদার দ্যতিয়েন। ফলে বাংলাভাষায় গদ্য বিবর্তনের ধারা এর মাধ্যমে অনুধাবন করা যায়। 

ফাদার দ্যতিয়েনের বাংলা সাহিত্যচর্চার প্রারম্ভিক পরিচয়বাহী গ্রন্থ ‘ডায়েরির ছেঁড়া পাতা’ দেশ পত্রিকায় প্রেরণ করলে সাগরময় ঘোষ মন্তব্য করেন- You have opened a new vista in Bengali literature.

১৯৭২ সালে তিনি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশে আসেন। এদেশে ভ্রমণের ইতিবৃত্ত ও বাংলাদেশের সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ তিনি ধারাবাহিকভাবে ডায়েরির আদলে রচনা করেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে ঐ রোজনামচার রচনাগুলো কলকাতার অমৃত সাপ্তাহিকে প্রকাশিত হয়। রোজনামচা গ্রন্থটির ধরন ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন প্রকৃতির। তাঁর রচিত অন্যান্য গ্রন্থের ভাষা, উপস্হাপিত সংস্কৃতি, শব্দচয়ন, বাক্যের ধরনে তত্কালীন সময়ের ভারতবর্ষের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু রোজনামচার অবয়বে ফুটে উঠেছে সমগ্র বাংলাদেশ। 

বাঙালির আত্মজন ফাদার দ্যতিয়েন। এ দেশের প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তাই তিনি পেয়েছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির শেকড়ের সন্ধান। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন তিনি। পড়েছেন প্রচুর। বঙ্কিম থেকে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারা অবধি ছিল তাঁর বিচরণ। তাই তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যোগসূত্র অনুসন্ধানের মাধ্যমে অনুপম ছন্দে গদ্যের অপূর্ব গাঁথুনিতে বাংলা রচনা করেছেন। ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবর বেলজিয়ামে বাংলাভাষার এই অকৃত্রিম বন্ধু ৯২ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ গানটি বাজানো হয়েছিল তাঁর অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী। এ থেকেই বোঝা যায় ফাদার দ্যতিয়েন বাংলাকে কতটা ভালোবাসতেন। বাংলা ভাষাসাহিত্যে তাঁর অবদান বাঙালি জাতি কখনো ভুলবে না।

 

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

ওভার ট্রাম্পড

আঁধারের হাত ধরে

হুমায়ুন আজাদের সমাজদর্শন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আজ কবিগুরুর জন্মদিন

অসমাপ্ত প্রণয় 

সম্রাট আকবর তানপুরা কাঁধে নিয়ে চললেন তানসেনের গুরুগৃহে 

অমলার যুদ্ধ