করোনার প্রকোপ কমতে থাকায় ২০২১ সালে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা বেড়েছে। আশা করা যায় বর্তমান বছরও এই ধারা অব্যাহত থাকবে এবং তেল বাজারে নতুন রেকর্ড তৈরি হবে। যদিও বর্তমানে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে আনতে পরিবেশবাদীরা আওয়াজ তুলছে এবং তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন দেশ এই উদ্যোগেও শামিল হচ্ছে। চলতি বছর জ্বালানি তেল ব্যবহার বাড়ার অন্যতম কারণ ভ্রমণ। করোনা কমে আসায় আকাশ পথে ভ্রমণ বাড়াবে। তাছাড়া বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের পরিধিও প্রসারিত হবে।
আশা করা হচ্ছে ২০২২ সালে অশোধিত তেলের চাহিদা দৈনিক ৯৯.৫৩ মিলিয়ন ব্যারলে পৌঁছাতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির তথ্য অনুসারে ২০২১ সালে তেল সরবরাহ দৈনিক ৯৬.২ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছে ছিল। করোনার প্রকোপ দেখা দেওয়ার আগে ২০১৯ সালে যা ছিল দৈনিক ৯৯.৫৫ মিলিয়ন ব্যারেল। এর ফলে স্বাভাবিকভাবে ওপেক দেশগুলো ও যুক্তরাষ্ট্রের শেল শিল্পের ওপর চাপ পড়বে। গত প্রায় দুই বছর প্রধান তেল উত্পাদকরা সরবরাহ নিয়ে এতটা চাপে ছিল না। সরবরাহের জন্য নতুন উত্স খুঁজতে ব্যস্ত এখন তেল উৎপাদন দেশগুলো। চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে না পারলে তেলের দাম বাড়বে। দাম বেড়ে গেলে তার প্রতিক্রিয়ায় এক সময় চাহিদা পড়ে যাবে। সেটি তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের উদ্বেগের কারণ হবে।
২০২১ সালের শুরুতে ব্যারেলপ্রতি ব্রেন্ট অশোধিত তেলের দর ছিল ৫২ ডলার কিন্তু বছরের শেষের দিকে সেটি ৮৬ ডলারে পৌঁছে। বছর জুড়ে তেলের দর ক্রমাগত বেড়েছে। এই ধারা চলতি বছরও যে অব্যাহত থাকবে তা সহজেই অনুমেয়। তবে ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষকরা মনে করেন চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ খুব বেশি বাড়বে না। চলতি বছর তেলের দাম গড়পড়তা ৮৫ ডলারের ধারেকাছে থাকবে। কারণ বিকল্প উৎস বা মজুত তেমন একটা নেই। এ কারণে তেলের সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে বাড়বে না। তাছাড়া ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট দেখা দেওয়ার পর অনেক দেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ইউরোপের একাধিক দেশে করোনা বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। বছরের পরের দিকে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়টি মাথায় রাখলে সারা বছর তেলের বাজার যে তেজী থাকবেই সেটা জোর দিয়ে বলা যায় না। গোল্ডম্যান স্যাকসের এনার্জি রিসার্চের প্রধান ডামিয়েন কুরভালিন মনে করেন, ২০২২ সালের প্রথম কোয়ার্টারে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বেশি হবে না। বছরের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে এবং নভেম্বরে তেলের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
২০২১ সালে তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারকদের বিস্মিত করার পাশাপাশি জ্বালানি ভোক্তা দেশগুলোর উৎকণ্ঠাও বাড়িয়েছে। কারণ বছরের শুরু থেকে সরবরাহ ছিল কম। যে কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ওপেকসহ সব রপ্তানিকারকদের কয়েক মাস তেলে যোগান বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে এসেছেন। বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী মহামারি দেখা দেওয়ার পর তেলের চাহিদা কমে যাওয়ায় এই শিল্পে বিনিয়োগও কমে যায়। উত্পাদন বাড়াতে এদেশগুলোকে কিছুটা হিমশিম খেতে হয়।
মার্কিন শেল শিল্প এর আগে প্রয়োজনের সময় যেভাবে সক্রিয় হয় বাজারের বর্তমান অবস্থায় সেভাবে সাড়া দেয়নি। আগে চাহিদা অনুপাতে সরবরাহ বাড়িয়েছিল শেল কোম্পানিগুলো। ২০১৯ সালের শেষের দিকে তারা দৈনিক ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন করত কিন্তু ২১ সালের শেষ দিকে সেটি ছিল ১১.২ মিলিয়ন ব্যারেল। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) এ তথ্য দিয়েছে। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) পূর্বাভাষ অনুযায়ী চলতি বছর প্রথমার্ধে তেলের চাহিদা গত বছর একই সময়ের তুলনায় দৈনিক ১ লাখ ব্যারেল কম থাকবে। কারণ সংক্রমণ নতুন করে বাড়া ছাড়াও প্রচুর মানুষ এখনো টিকা নেয়নি। গবেষণা সংস্থা ফ্যাক্টস গ্লোবাল এনার্জি গ্রুপের (এফজিই) চেয়ারম্যান অব কনাসালট্যান্সি ফেরেদুন ফেশারাকি মনে করেন, ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ লোককে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা না গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটবে না। কারণ টিকা ছাড়া বিদেশে ভ্রমণের ছাড়পত্র মিলবে না। কাজেই এ বিষয়টিও তেলের চাহিদার ওপর প্রভাব রাখবে।
আমস্টার্ডাম-রটারডাম-অ্যান্টুয়ার্প ইউরোপের প্রধান জ্বালানি হাব। গত কয়েক মাসে সেখানে চাহিদা ও সরবরাহে খুব বেশি ওঠানামা করেনি। এশিয়ার বাজারে চাহিদা কিছুটা কমলেও সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল স্থিতিশীল। নিউইয়র্কভিত্তিক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ফিচ সলিউশনসের সিনিয়র তেল ও গ্যাস বিশ্লেষক পিটার লি মনে করেন চলতি বছর আরো পরের দিকে থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো এশিয়ার তেল বাজার চাঙা হবে। একই সঙ্গে চীন, জাপান ও ভারতের চাহিদাও ঊর্ধ্বমুখী হবে।
