ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার প্রতিটি গ্রামের মানুষ সামাজিকভাবে দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক ইউপি নির্বাচন ঘিরে এই বিভক্তি প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়। এতে বাড়ছে সংঘর্ষ। মানুষ খুন-জখম হচ্ছে। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনায় ছয় জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১০০ জন। পুলিশ এসব সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। শৈলকুপা উপজেলার প্রতিটি গ্রামে দুই বা তার অধিক সামাজিক দল আছে। প্রতিটি দলের একজন করে মাতুব্বর আছে। তাদের মধ্যে নানান স্বার্থ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে শত্রুতা চলে আসছে। এক দলের মাতুব্বর একজন প্রার্থীকে সমর্থন করলে, প্রতিপক্ষ দল অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করে। এতে সহিংসতা ও বিভেদ ছড়িয়ে পড়ে। উপজেলায় প্রায় বাড়িতে সংঘর্ষের সময় ব্যবহারের জন্য ঢাল, সড়কি, রামদা ও লাঠিসোঁটা মজুত আছে। এমনকি ইটপাটকেলও মজুত রাখা হয়। নির্বাচনের আগে পরে সহিংসতা বেড়ে যায়।
৩১ ডিসেম্বর রাতে সারুটিয়া ইউনিয়নের কাতলাগাড়ি বাজারে নৌকার প্রার্থী ও বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে হারান মন্ডল ও অখিল সরকার নামে দুই জন নিহত হয়। ১ জানুয়ারি ভাটবাড়িয়া গ্রামে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের ছুরিকাঘাতে জসিম উদ্দিন নামে এক জন নিহত ও মিলন নামে অপর একজন আহত হয়। ২৩ ডিসেম্বর একই ইউনিয়নের কাতলাগাড়ি বাজারের নৈশপ্রহরী বৃদ্ধ আব্দুর রহিমকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয় প্রতিপক্ষ দলের লোকজন। ১৫ দিন রাজশাহী মেডেক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন থাকার পর ৮ জানুয়ারি তিনি মারা যান। ৮ জানুয়ারি দুপুরে বগুড়া ইউনিয়নে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় কল্লোল খন্দকার নামে একজনকে প্রতিপক্ষ দলের লোকজন পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে। এর আগে শৈলকপা পৌরসভায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কবিরপুরের স্বপন শেখকে প্রতিপক্ষ গ্রুপের লোকেরা কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। পরে তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিত্সাধীন অবস্হায় মারা যান। নিহত ছয় জনই আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক বলে জানা যায়। ৮ জানুয়ারি শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্হ্য কমপ্লেক্সে নিহত কল্লোলের ভাই লিটন খন্দকার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, তার ভাইকে হত্যা করেছে গ্রামের প্রতিপক্ষ দলের লোকেরা।
এছাড়াও নির্বাচনের আগে পরে সারুটিয়া, আবাইপুর, দুধসর, উমেদপুর ও মির্জাপুর ইউনিয়নে সহিংসতা হয়েছে। এতে প্রায় ১০০ বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট আনুযায়ী আহত হয়েছে অন্তত ১০০ জন। ২০টি মোটরসাইকেল পোড়ানো হয়েছে। এখনো সারুটিয়া ইউনিয়নে বিভিন্ন গ্রামে রাতে লুটপাটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনেক পুরুষ লোক বাড়ি ছাড়া। শৈলকুপা শহরের ভ্যানচালক মানিক মন্ডল ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, এসব খুন জখম করা ভালো কাজ না। কৃষ্ণনগর গ্রামের হতদরিদ্র রাবেয়া খাতুন বলেন, তার স্বামী ও একমাত্র ছেলে কিছু দিন আগে মারা গেছে। কোনো দল করেন না। স্বামী পরিত্যক্ত মেয়েকে নিয়ে থাকেন। নির্বাচনের আগে এক দিন রাতে হঠাত্ করে গ্রামের অন্যদের সঙ্গে তার বাড়িতেও হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। হামলাকারীরা লুটপাট করে। তারা তাদের আয়ের একমাত্র সম্বল সেলাই মেশিনটিও নিয়ে যায়। শৈলকুপা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক আবেদ আলি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামে গ্রামে মাতুব্বরদের দলাদলিতে মানুষ হতাহত হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল হিসাবে আওয়ামী লীগের নেতাদের এসব সহিংসতা বন্ধ করা উচিত। আর বিভিন্ন দল থেকে অনুপ্রবেশকারী দলে ঢুকে বেশি ক্ষতি করছে। রবিবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় শৈলকুপার আইনশৃঙ্খলার ব্যাপরে বিশদ আলোচনা হয়। সেখানে যে কোনোভাবে সহিংসতা বন্ধের সিদ্ধান্ত হয় বলে কমিটির একজন সদস্য জানান। ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, শৈলকুপায় সহিংসতা থামাতে আইনের কঠোর প্রয়োগ করা হচ্ছে। অশান্িত সৃষ্টিকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। পাশাপাশি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করে সহিংসতা থামাতে মোটিভেশন করা হচ্ছে।
