নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকারের সমর্থকদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। অপর দিকে নির্বাচকে ঘিরে নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডে উৎসব মুখর পরিবেশে কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকরা প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নাসিকের মেয়র পদে ৭জন প্রার্থী থাকলেও মূলত আলোচনায় আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকারের হাতি। নির্বাচন পরিচালনায় গঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রতিদিনের মত গতকাল মঙ্গলবারও নাসিকের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার প্রচারণা চালিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে গঠিত ২৭টি ওয়ার্ডে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি আলাদা আলাদা ভাবে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। শামীম ওসমান গত সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক ভাবে নৌকা মার্কার পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিলেও এখনো ঘুরে ফিরে সেই শামীম ওসমানকে নিয়েই চলছে আলোচনা।
যদিও তার অনুসারীদের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী মঙ্গলবার সকালে ১২নং ওয়ার্ড ও বিকালে ১৭নং ওয়ার্ড ছাড়াও সিদ্ধিরগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় নির্বাচনী প্রচারকালে নৌকার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে মন্তব্য করে বলেন, প্রচারণায় কে নামলো আর কে নামলো না তা দেখার সময় নেই। তবে সংসদ সদস্য হিসাবে শামীম ওসমান প্রচারণায় নামলে আচরণবিধি ভঙ্গ হতে পারে। নির্বাচনী মাঠে তার প্রতিদ্বন্দ্বি এবং তিনি সমান সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে মন্তব্য করে বলেন, প্রশাসন এখনো নিরপেক্ষ বলে আমার বিশ্বাস। দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে জনগণই আমার শক্তি। অপর দিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার তার সমর্থকদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হয়রানি করছে মন্তব্য করে বলেন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে বসে প্রয়োজনে নির্বাচনী প্রচারণা চালাব। নাসিকের মেয়র পদে নৌকা আর হাতির পাশাপাশি হাতপাখা ও দেয়ালঘড়ির প্রার্থীদের প্রচারণায় দেখা গেলেও অন্য তিন প্রার্থী মাঠেই নামেনি।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে যাতে অনুষ্ঠিত হয় এ জন্য ১৪জন ম্যাজিস্টেটকে নির্বাচনি এলাকায় নিয়োগ দিয়েছেন নির্বাচন কমিশন। এরা ১৪ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ৫দিন নাসিক নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্ব পালন করবেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকায় দলীয় কার্যালয়ে এক প্রেসব্রিফিংয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী অ্যাড. তৈমূর আলম খন্দকারের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবিসহ সাড়া দেশে গ্রেফতারকৃত বিএনপি নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি করেন। এ সময় রুহুল কবির রিজভী বলেন, সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন আরেকটি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছে সরকার।
নির্বাচনের আর মাত্র ৩দিন বাকি। ১৬ জানুয়ারি নাসিকের ভোট গ্রহণ। এরই মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের কর্মী সমর্থকদের বাড়ি বাড়ি পুলিশের হয়রানিকে সাধারণ ভোটাররা ভিন্ন চোখে দেখছে। যদিও পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বলেছেন, তারা কোন অভিযান চালাননি। নির্বাচনের জন্য হুমকি হতে পারে এমনসব জায়গায় পুলিশ তল্লাশি করছে। যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে তাদেরই গ্রেফতার করা হয়েছে।
সেলিনা হায়াৎ আইভীর নৌকার পক্ষে শামীম ওসমানের অনুসারীরা কাজ করছে এমন দাবি করে শামীম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের ঘাটি। এখানে নৌকার জন্য কাজ করব এটাই স্বাভাবিক। তিনিসহ তার অনুসারীরা মাঠে আছেন বলে শামীম ওসমান জানান। আইভীর পক্ষে নৌকায় ভোট প্রার্থনা করে গতকাল মঙ্গলবার রাতে সনাতনপাল লেন এলাকায় ব্যসায়ীরা উঠান বৈঠকের আয়োজন করে। নারায়ণগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আইভীর নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে গতকাল দুপুরে শহরে প্রচার প্রচারণা চালান।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নৌকা প্রতীক দেওয়ায় যে ক্ষোভ দানা বেধেছিলো স্থানীয় বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীদের মাঝে, দলীয় স্বার্থে, নেত্রীর (শেখ হাসিনা) সম্মানে সকল ক্ষোভ-দুঃখ ভুলে নৌকার পক্ষে নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছেন এমপি শামীম ওসমান। তিনি বলেন, প্রার্থী কলাগাছ না আম গাছ সেদিকে দেখার দরকার নাই। বঙ্গবন্ধুর নৌকা, শেখ হাসিনার নৌকা, স্বাধীণতার নৌকা কেউ ডোবাতে পারবেনা। আজ থেকে মাঠে নামলাম। শামীম ওসমানের এই ঘোষণার পর গোটা নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। দীর্ঘদিনের রাগ-অভিমান ভুলে নেতার নির্দেশে মাঠে নেমে পড়েছে সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা।
যুবলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী বলেন, নেতা বলেছেন নেত্রী (শেখ হাসিনা) নৌকা দিয়েছেন এটাই বড় কথা। কাকে দিয়েছেন, কে কি বলছে সেটা দেখার সময় নাই। বঙ্গবন্ধুকে যার মাধ্যমে চিনেছি, শেখ হাসিনাকে যার মাধ্যমে জেনেছি, সেই শামীম ওসমান বলেছেন ব্যাস আর কোন কোন কথা নাই। সোমবার থেকে নৌকার পক্ষে নারায়ণগঞ্জে জাগরণ শুরু হয়ে গেছে। এই জাগরণ ১৬ জানুয়ারি জয়ের মালা উপহার দেবে আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে। কোন অপশক্তি নৌকার জয়কে রুখতে পাবেনা।
আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী গতকাল দিনভর প্রচারণাকালে বলেন, আমি বলি নাই শামীম ওসমান আমার সঙ্গে নেই। আমি সব সময় বলেছি আমার সাথে জনতা আছে। দল যেহেতু আমাকে নমিনেশন দিয়েছে সেক্ষেত্রে দল আমার সাথেই আছে। দলের ভিতর থেকে কে আসল কে আসল না সেটা আমার দেখার বিষয় না। সেটা দলই দেখবে। আমার আস্থা জনগণের প্রতি।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তৈমূরের কর্মীদের বাসায় তল্লাশি ও গ্রেফতারের অভিযোগ প্রশ্নে আইভী বলেন, আমি প্রচারণায় ব্যস্ত এসব জানি না। উনি তো বলেছে অবৈধ অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার করা হোক। বলেছেন পরিবেশটা যেনো সুষ্ঠু থাকে, আমিও বলি পরিবেশটা যেনো সুষ্ঠ থাকে। চাইনা নারায়ণগঞ্জে এমন কোন সমস্যা হোক। আমার নেতাকর্মীরা ভোট চাচ্ছে এমনকি উনার নেতাকর্মীরাও ভোট চাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রত্যেকটা প্রার্থীর ভিতরে শঙ্কা থাকে, আমি তো এর বাইরে কেউ না। আমি চাইবো নারায়ণগঞ্জের পরিবেশ যেনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ থাকে। প্রশাসন যেনো সজাগ থাকে। আমার ভোটাররা যেনো সুষ্ঠভাবে ভোট দিতে পারে। নারায়ণগঞ্জে এর আগেও সুষ্ঠুভাবে ভোট হয়েছে। আশা করছি এবারও হবে। আইভী বলেন, আমার আস্থা সব সময় আমার জনগণ। উনি (শামীম ওসমান) কীভবে মাঠে থাকবেন, উনি একজন সংসদ সদস্য। আচরণবিধি লঙ্ঘন হবে তারা মাঠে থাকলে। আমি আবারও গণমাধ্যমের কাছে বলি আমার আস্থা সব সময় জনগণের প্রতি, আমার নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। এর বাইরে আর কিছু বলতে চাই না।
অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, আমরা মামলা খেয়ে খেয়ে এবং গ্রেপ্তার হয়ে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেছি। এতদিন জনগণ প্রার্থী পায়নি আমরা রাজীও হইনি। এখন আমরা রাজী হয়েছি, জনগণ মনের মত প্রার্থী পেয়েছে। যে প্রার্থী সবসময় জনতার থাকবে। তিনি বলেন, কালকে এসপি অফিসে গিয়েছিলাম তাকে পাইনি। আজকে গিয়ে বলবো আমার কাছে আর কোন বিকল্প নেই। প্রয়োজনে আপনার অফিসের সামনে বসে পড়বো। এখান থেকেই আমি আমার নির্বাচন পরিচালনা করবো। আমি শঙ্কিত হব না কেন? নেতাকর্মীদের বাড়িতে যখন পুলিশ হামলা করে। এজেন্টকে যখন পুলিশ ধরে নিয়ে যায় হেফাজতের মামলায়, তখনতে শঙ্কা সৃষ্টি হবেই। ভাই বোন এক হয়ে গেলে ভালই হত। মিডিয়ার কল্যাণে এসব কথাবার্তা শুধু নারায়ণগঞ্জের মানুষ শোনে না, বিশ্বব্যাপী মানুষ শোনে। বাইরে কোথাও গেলেই নারায়ণগঞ্জের ব্যাপারে অনেক কথা উঠে যায়।
এছাড়া স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার শহরের মিশনপাড়া এলাকায় এক প্রেসব্রিফিংয়ে বলেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় নেতা নারায়ণগঞ্জে শোডাউনে এসে বলেছেন, তৈমুর ঘুঘু দেখেছে, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেনি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমাকে রেজাল্ট দেখাবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। এই ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই আমি ঘুঘু এবং ঘুঘুর ফাঁদ দেখা শুরু করেছি। নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি ওয়ার্ড দুপুরের পর থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রচার প্রচারণায় সরগম থাকছে। এমনকি পাড়া মহল্লাগুলিতে নৌকা এবং হাতির প্রচারণায় আলাদা আলাদা ভাবে আইভী ও তৈমূরের সমর্থকরা প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
