প্রায় ২৭ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশ্বের নবম বৃহৎ দেশ কাজাখস্তান। এর সীমান্ত রয়েছে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে। আকারে পশ্চিম ইউরোপের সমান হলেও বিশাল এই দেশটির জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি ৯০ লাখ। মধ্য এশিয়ার দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের অংশে থাকার সময়ে ১৯৮৪ সালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন নুর-সুলতান নজরবায়েভ। ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজাখস্তান শাসন করেন তিনি। এরপর ২০১৯ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন নজরবায়েভ। তবে ওই বছরেই আকস্মিক এক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন নজরবায়েভের পছন্দের প্রার্থী কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ।
সংঘাতের সূত্রপাত
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর জের ধরে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি দেশটির ঝানাওজেন শহরে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়। সে দিন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ঘটে। এরপরই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। শুরু হয় সংঘাত। সবচেয়ে বেশি সংঘাত সৃষ্টি হয় দেশটির বৃহত্তম শহর আলমাটিতে। এতে বাধ্য হয়ে দেশটির সরকারের পতন ঘটে। গত ৫ জানুয়ারি আলমাটির বিমানবন্দরে তাণ্ডব চালায় বিক্ষোভকারীরা। জোর করে ঢুকে পড়ে সরকারি ভবনে ও শহরের প্রধান প্রশাসনিক ভবনে আগুন দেয়। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে, দেশটির প্রধান তিন শহরে তাণ্ডব চালায় বিক্ষোভকারীরা। বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ৭ জানুয়ারি দেশটির প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ জারি করে জরুরি অবস্থা, পাশাপাশি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে দেশটিতে সেনা পাঠাতে অনুরোধ জানান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ জানুয়ারি কাজাখে প্রায় আড়াই হাজার সেনা পাঠায় রাশিয়া। একইসঙ্গে কাজাখ প্রেসিডেন্ট বিক্ষোভকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয় নিরাপত্তা বাহিনীদের। এরপর গত ১০ জানুয়ারি কাজাখ প্রেসিডেন্ট ভাষণে বলেন তার দেশের পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল।
ক্ষয়ক্ষতি
প্রায় সাত দিন ধরে চলা সংঘাতে অন্তত ১৬৪ জন নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। এছাড়া বিক্ষোভে আটক করা হয়েছে অন্তত আট হাজার বিক্ষোভকারীকে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে প্রায় ১৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে। শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকে হামলা চালিয়ে লুটপাট করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৪০০ গাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
সংঘাতের নেপথ্যে
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর জেরে বিক্ষোভের শুরু হলেও দেশটির জনগণের ক্ষোভ অন্য জায়গায়। দেশটিতে তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা নজরবায়েভ ও তার অনুসারী নতুন প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভের ওপর দেশটির জনগণের প্রচণ্ড ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এই বিক্ষোভ।
২০১৯ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেও নজরবায়েভ পর্দার আড়ালে ছিলেন ব্যাপক ক্ষমতাধর। বিক্ষোভের জেরে গত ৫ জানুয়ারি নুরসুলতান নজরবায়েভকে দেশটির নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী দেশটির সাবেক ৮১ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। ভাঙচুর চালাতে চেষ্টা চালায় তার ব্রোঞ্জ মূর্তিতে।
ধারণা করা হচ্ছে, দেশটির অর্থনীতির বেশিরভাগই নজরবায়েভের পরিবার নিয়ন্ত্রণ করে। অভিযোগ, সরকারি ও শিল্পের প্রধান পদগুলোতে নজরবায়েভ তার পরিবারের সদস্যদের এবং আত্মীয়দের নিয়োগ দিয়েছে। এছাড়া কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা হতো সংবাদমাধ্যম।
নজারবায়েভের তিন দশকের শাসনামলে শুধুমাত্র অল্প কিছু মানুষ সুবিধা পেয়েছেন, বিদেশে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। দেশটির ধনিক শ্রেণি দুই দশক ধরে লন্ডন ও ইংল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে শত শত কোটি মার্কিন ডলারের সম্পদ কিনেছেন। নজারবায়েভ তার শাসনামলে দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনীতিতে ব্যাপক সংস্কার নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দেন। অভিযোগ, সংস্কারের তেমন কিছুই হয়নি।
এছাড়া আর্থিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি প্রতিবেদন অনুসারে, মাত্র ১৬২ জন কাজাখস্তানের অর্ধেক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করেন।
দেশটির জনগণের মধ্যে এখন প্রশ্ন উঠেছে, গত ৩০ বছরে সরকার আমাদের জন্য কী করেছে?
এদিকে বিশ্লেষকেরা বলছেন, কাজাখস্তানে আসলে নির্বাচন-ভিত্তিক গণতন্ত্র নেই, কারণ বহু দশক ধরে সে দেশে ভিন্নমত তৈরি হলে সেটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা হতো। স্থানীয়ভাবে ব্যাপক দুর্নীতি, অসমতা ও কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এই সংঘাতকে উসকে দিয়েছে। সূত্র: বিবিসি, গার্ডিয়ান, আল জাজিরা, সিএনএন।

