বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

অন্যের সিলেবাসে চলার দাসত্ব ও আত্মহত্যার দর্শন 

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ১৬:০০

মানুষ জীবন পায় মাত্র একবার। অতএব সে তার জীবনকে কীভাবে ব্যবহার করবে সেটা সম্পূর্ণ তার ব্যাপার। কিন্তু কতখানি নিজের ইচ্ছাধীন চলতে পারে? মানুষ একা হলেও একা না। তার থাকে বাবা-মা-স্বামী-স্ত্রী-সন্তান। মানে, তাকে ঘিরে থাকে আরো অনেকগুলো মুখ।

ফলে মানুষ নিজের ইচ্ছায় আত্মহত্যা করলে আর কিছু জীবনকে সেই আত্মহত্যার মাশুল দিতে হয়। কিন্তু তাও কিছু মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? উনিশ ও বিশ শতকের আত্মহত্যা সম্পর্কিত দার্শনিক চিন্তার জিজ্ঞাসাক্ষেত্র, অনেকক্ষেত্রেই আত্মহত্যা করা হলো মুক্তিইচ্ছা পালনের স্বাধীনতা, এই দৃষ্টিভঙ্গিকেও ছাড়িয়ে গেছে। এ সময়ের চিন্তায়, আত্মহত্যা কেন করব? এটা কোনো প্রশ্ন নয়, আত্মহত্যা কেন করব না? এটিই প্রশ্ন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দে প্লেটো তাঁর ‘ক্রাইসিস অব ফ্রেন্ডশিপ’ বইতে প্রশ্ন করেন—মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? উত্তর হলো—সহায়হীন হয়ে পড়লে।

—সহায়ক তবে কে?

প্লেটোর উত্তর—বন্ধু। মানে বন্ধুহীন মানুষ আত্মহত্যা করে। কিন্তু প্লেটোর দৃষ্টিতে বন্ধু কারা? একটা উদাহরণ দিই।

—বন্ধু কে?

—অসুস্থ মানুষ ও চিকিত্সক বন্ধু।

—কেন?

—অসুখ।

—কেন? অসুখ কেন হবে বন্ধুত্বের সেতু?

—কারণ, বিপদে বন্ধুর পরিচয়। রোগীকে রোগমুক্ত করেন ডাক্তার। তাই।

—তাহলে অসুখ মানে খারাপ। বিপদ। বিপদ দিয়ে শুরু হয় বন্ধুত্ব?

—সে তো বটেই।

—তবে স্বাস্থ্য কী?

—স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য যা কিছু উপকারী সেও বন্ধু।

—স্বাস্থ্য ভালো রাখে সুইমিং, জগিং, ওষুধ। সেসবও তবে বন্ধু?

—কেন নয়? তারাও বন্ধু।

—তাহলে আমার স্বাস্থ্য যদি ভালো থাকে তবে তো সুইমিং, জগিং, ওষুধ বা অসুখ বন্ধু নয়?

—না তখন অসুখ তোমার এনিমি। তোমার বন্ধু স্বাস্থ্য।

—এর মানে বন্ধুত্বও পরিবর্তনশীল?

—অবশ্যই।

এরকম ডায়ালগের ভেতর দিয়ে উত্তর খুঁজেছেন প্লেটো। পরে অবশ্য আত্মহত্যা বিষয়ে বিশদও বলেছেন। বন্ধুত্বের দুটি তত্ত্ব আছে। একটি হলো উপযোগিতাভিত্তিক, অন্যটি আনন্দভিত্তিক। এই উপযোগিতা ও আনন্দের সম্পর্ক শেষ হলেই মানুষের জাগে মরিবার সাধ। অবশ্য সমাজবিজ্ঞানী বা মনোবিজ্ঞানীদের রয়েছে আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডার্কহাইম তাঁর এক বিখ্যাত গবেষণায় আত্মহত্যাকারীদের কয়েক ভাগে ভাগ করেছেন। পরার্থবাদী, যাদের সামাজিক সম্পৃক্ততা খুব বেশি। আত্মপরিচয়হীন, যারা সামাজিক রীতিনীতির ধার ধারে না। আত্মশ্লাঘায় পূর্ণ ব্যক্তি (ইগোস্টিক), যারা সবসময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সামাজিকতা পরিহার করে নিজের সবকিছু নিয়ে অহংবোধে ভোগে। অদৃষ্টবাদী, যারা সব সময় অদৃষ্টের ওপর নির্ভর করে এবং খুব কঠোরভাবে সামাজিক নিয়মকানুন মেনে চলে এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে ক্ষুব্ধ হয়। বিশ্বখ্যাত মনোবিশ্লেষক-মনোচিকিত্সক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের বিবেচনায় মানুষের মধ্যে অবচেতনে থাকে ‘মৃত্যুপ্রবৃত্তি’।

কিন্তু এসব দর্শনাতীত কিছু চরিত্রও তো রয়েছে। যেমন যার বন্ধু আছে, যশ আছে, অর্থ আছে মানে জাগতিক সবই আছে, তেমন মানুষ তবে আত্মহত্যা করেন কেন? এখানে মনোবিজ্ঞানের কাজ। যাকে তাদের ভাষায় বলা হয় ‘এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম’। আর খুঁজতে থাকেন নিউরোলজি, হরমোন ও জেনেটিকে সমাধান। চিকিত্সাবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, মানব মস্তিষ্কের সেরিব্রোস্পাইনাল তরলের মধ্যে ‘৫-হাইড্রোক্সি ইনডোল অ্যাসেটিক অ্যাসিড’ নামের একটি রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ কমে গেলে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। আত্মহত্যা করার জন্য প্রথমে বিক্ষিপ্তভাবে মনের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা আসে। এরপর বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলো বারবার আসতে থাকে। ব্যক্তি এই চিন্তা থেকে সহজে মুক্ত হতে পারে না। আত্মহত্যার চিন্তা তার স্বাভাবিক কাজকর্মের ওপর প্রভাব ফেলে এবং তার আত্মহননের ইচ্ছা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। সে কখনো আবেগতাড়িত হয়ে, আবার কখনো পরিকল্পিকভাবে মৃত্যুচেষ্টা করে। সফল না হলে তার মধ্যে আবার বিক্ষিপ্তভাবে আত্মহত্যার চিন্তা আসতে থাকে। এই চক্রটি বারবার হতে পারে।

আত্মহত্যাবিরোধী দর্শনও রয়েছে। জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর প্রভাবশালী প্রবন্ধ ‘স্বাধীনতা প্রসঙ্গে’তে আত্মহত্যা প্রতিরোধের সপক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন। তাঁর বিবেচনায়, যেহেতু স্বাধীনতার পূর্বশর্তই হচ্ছে একজন ব্যক্তির মুক্তইচ্ছা ধারণ করা ও সে অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, সেহেতু যে ধরনের মুক্তইচ্ছা সেই ব্যক্তিকে পরবর্তীকালে অন্য যে কোনো বিষয়ে মুক্তইচ্ছা চরিতার্থ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে, সে ধরনের মুক্তইচ্ছাকে প্রতিহত করা উচিত। একই যুক্তিতে স্বেচ্ছায় দাসত্ববরণকেও প্রতিরোধ করা উচিত বলে মিল মনে করেন।

হবস তাঁর ‘লেভিথান’ নামক বইতে জানান, নিজের জীবন ধ্বংসকারী যে কোনো ক্রিয়াই প্রকৃতিকভাবে নিষিদ্ধ। এই প্রাকৃতিক নিয়ম ভঙ্গ করা অযৌক্তিক এবং অনৈতিক। মানুষের জন্য যৌক্তিক হলো সে মৃত্যুকে ভয় পাবে এবং সে সুখের প্রত্যাশায় থাকবে।

আবার উলটো ধারণাও রয়েছে। গোথ এবং শোপেনহাওয়ার আত্মহত্যাকে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বস্তি হিসেবে দেখেছেন। দার্শনিক ও মনস্তত্ত্ববিদ থমাস জাস্জের মতে, আত্মহত্যার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর একটি। যদি স্বাধীনতার মানে হয় নিজস্বতার মালিকানা, নিজের জীবন ও শরীরের উপর মালিকানা, তবে একজন মানুষের নিজের জীবন ত্যাগ করার অধিকার তার সবচেয়ে বড় মৌলিক অধিকারগুলোর একটি। যদি অন্য কেউ একজন মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য বাধ্য করে, তবে মানুষটি তার নিজের জীবনের মালিক নয়, তার জীবন অন্যের কাছে বন্দি।

ডেভিড হিউম-এর মৃত্যুর পর আত্মহত্যা বিষয়ে তাঁর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধে হিউম আত্মহত্যার কর্মকে ঈশ্বরকে অপমান করার একটি প্রচেষ্টা বলে অভিমত দিয়েছেন। এজন্যই কি আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আত্মহত্যার কয়েকদিন আগে বলেছিলেন, ‘আমার জন্ম হয়েছে অন্যের ইচ্ছায়। মৃত্যুটা তো যে কোনো সময় নিজের হাতেই ঘটাতে পারি। এখানে ঈশ্বর বা আর কারো হাত নেই।’ হিউম স্বীকার করেছেন যে, কখনো কখনো আত্মহত্যা-স্পৃহা জাগতে পারে, তবে সম্ভবপর অন্য সকল উপায় বিবেচনা করার আগে আত্মহত্যার চিন্তা বিবেচনা করা হাস্যকর।

কার্ল মার্কসের ‘এলিয়েশন’ ভাবনাটি পরিবেশ অনুযায়ী মানুষের মানসিক সুস্থতা বোঝার ক্ষেত্রে বেশ কার্যকর। যেমন—অসুস্থ পরিবেশে বা সমাজে সুস্থ থাকাটাই অস্বাভাবিকতা। ফলে সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবার চিন্তা যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয় তবে সেটি অবশ্যই হয়ে উঠবে স্বাতন্ত্র্যবাদী সত্তার কারণে। ধরুন, আপনি সব দিক থেকেই নিজেকে মিসফিট ভাবছেন। সমাজ-পরিবারের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটি আলগা। রাষ্ট্রের সঙ্গে, এমনকি পেশার সঙ্গেও। সবখানেতেই মিসফিট ভাবছেন। কেন ভাবছেন? প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। এই হচ্ছে আপনার অক্ষমতা, এই তো ভাবছেন! কিন্তু নিজের ব্যক্তিসত্তাকে সামাজিক সত্তায় রিলেট করুন, এবার দেখুন শুধু আপনি না, সবাই-ই এই অসুস্থ দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। ফলে আপনি কাদের কাছে নিজেকে মিসফিট ভাবছেন—যেখানে তারা বরং আপনার চেয়ে কম সংবেদনশীল বলেই, কম সুস্থ বলেই এ গোটা ব্যবস্থাকে সুস্থ ভেবে দিব্যি কাজ করে যাচ্ছেন—তাদের কাছে। মানে সামাজিক-রাষ্ট্রিক সত্তার সঙ্গে ব্যক্তিক সত্তাকে রিলেট করে দেখলে ‘অক্ষমতা’কে ‘সক্ষমতার চরিত্র’ দেওয়া যায়।

শুরুতে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আপনি কতখানি নিজের ইচ্ছাধীন চলতে পারেন? আপনি যে রাষ্ট্রে বা সমাজেই জন্মান বা বসবাস করেন না কেন, আপনার জন্য কিছু সিলেবাস তৈরি হয়ে আছে। যেমন, রাষ্ট্র ‘তার মতো’ই আপনাকে গড়ে তুলতে চাইবে। তার বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান আছে, এর মধ্যে একটি অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও নিশ্চয়ই সিলেবাস আছে। সেই সিলেবাসেই পড়তে হবে আপনাকে। পেশার জগতে প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানগুলোর সিলেবাসেই আপনাকে কাজ করতে হবে। এভাবে এবার মেলাতে থাকেন, দেখতে পাবেন দিনের পর দিন প্রতিদিন কীভাবে প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রের কিংবা সম্প্রদায়ের ইচ্ছায় আপনি চালিত হচ্ছেন। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা তো আপনার শরীর আর আপনার শরীর রাখেনি। কিনে নিয়েছে। ধরুন, অসুস্থ হলেন। হাসপাতালে গেলেন। সেখানে বহুজাতিক পুঁজির দৌরাত্ম্যে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর ওষুধের খপ্পরে পড়ছেন। ভালো ওষুধই যে খাচ্ছেন—এর নিশ্চয়তা কোথায়? এর মানে এরকম সমাজব্যবস্থায় আপনি আপনার ইচ্ছাধীন নন। তাহলে কীভাবে নিজের শরীরকে মেরে ফেলার কথা ভাবছেন? অর্থাত্ আত্মহত্যা।

বিষয়টি জটিল। অনেক কুহক এখানে। সেসব কুহকের খোঁজ আর একদিন নেওয়া যাবে। সে পর্যন্ত ভালো থাকতে চেষ্টা করুন; নিজের ইচ্ছাধীন তো চলতে পারবেন না, তবে নিজের মতো করে চিন্তাভাবনা করতে কেউ তো আটকাচ্ছে না।

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

রাজনীতির মহাকবির বয়ান

‘তুমি তো লয়ের পুতুল!’ 

অস্তাচলে বাংলা থ্রিলারের নবাবি সূর্য 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অভিনয় 

কবিতা

মঈন ও তার বাইসাইকেল 

‘তোমরা নতুন লেখক তৈরি করো না বাপু’