বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

‘তোমরা নতুন লেখক তৈরি করো না বাপু’

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ১৬:১২

তরুণ বয়সে কমলকুমার মজুমদার (১৬ নভেম্বর ১৯১৪—৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯) তাঁর তিন বন্ধু বরেন বসু, নীরদ মজুমদার আর নরেন্দ্রনাথ মল্লিককে নিয়ে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পত্রিকাটির নাম রাখেন—‘উষ্ণীষ’। 

পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই প্রকাশ হয়েছিল কমলকুমারের বিখ্যাত গল্প ‘লালজুতো’। এই পত্রিকার জন্য শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে লেখা চাইতে গিয়েছিলেন তরুণ কমলকুমার ও তাঁর লেখক বন্ধুরা।

শরত্চন্দ্র তখন বড় এক অসুখের চিকিত্সার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে গ্রামের বাড়ি সামতাবেড়ে যাবার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেসময় এক সকালে শরত্চন্দ্র আরামকেদারায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন আর গড়গড়াতে মৃদু টান দিচ্ছেন, এমন সময় কমলকুমাররা তাঁর কাছে এসে উপস্হিত। শরত্চন্দ্র কমলকুমারদের কথা ধৈর্য ধরে শুনলেন। তবে ‘উষ্ণীষ’-এর জন্য লেখা চাইতেই বললেন, তাঁর শরীর অসুস্হ, তাঁর দ্বারা এখন পত্রিকায় লেখা সম্ভব হবে না। 

তিনি তরুণ কমলকুমারকে বলেন, ‘তোমরা নতুন লেখক তৈরি করো না বাপু! আর আমাদের কথা বাদ দাও, আমরা তো মরে গেছি। আর কি আমাদের দ্বারা পোষায়? কত দিন ধরে লিখছি বল দিকি? এটা তো মানো সব জিনিসের একটা মেয়াদ বলে জিনিস আছে? এখন এই এরা অনেকে বলে, আপনার আর বয়স কীইবা হয়েছে? আমি তাদের বলি...পাঁজি (পঞ্জিকা) দেখে কি বয়স ঠিক করা যায়, না তা হয়? এই যেমন রবিবাবু বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড়, তবু তিনি আমার চেয়ে ফিজিক্যালি স্ট্রং, যথেষ্ট তাঁর এনার্জি; লেখা আর আমাদের কাছে তোমরা আশা কোরো না, আমাদের মেয়াদ ফুরিয়েছে।’

এসব কথা শুনে ‘উষ্ণীষ’-এর তরুণ লেখকরা হতাশ। শরত্চন্দ্রের কথায় উঠে আসে পত্রিকার সম্পাদক ও লেখকের সম্পর্ক, লিখে টাকাপয়সা পাওয়ার প্রসঙ্গও। ভালো লেখা ছাপার জন্য পত্রিকাগুলো আর তাদের সম্পাদকেরা উদ্গ্রীব, কিন্তু শরত্চন্দ্রের মতে, লেখকদের দিকটাও দেখতে হবে—তারা যে পড়ে পড়ে শুধু লিখবে তার জন্যে রেমুনারেশন (সম্মানী) তো পাওয়া চাই। শরত্চন্দ্র এই প্রসঙ্গে বলেন তেমন লেখকের কথাও, যাঁর বা যাঁদের হয়তো টাকাপয়সার সে অর্থে প্রয়োজন নেই। তিনি অন্নদাশঙ্করের কথা উল্লেখ করেন—যিনি ঠিক শখে লেখেন তা নয়, লেখাটা কর্তব্য বলে মনে করেন বলে লেখেন। 

শরত্চন্দ্র বলেন, ‘তার টাকা না হলেও চলে, কিন্তু যারা লেখে তাদের তো পেট চালাতে হবে, এটা তোমাদের বোঝা দরকার...লেখকদের টাকা দাও, তোমরা ভালো ভালো লেখা পাবে।’ শরত্চন্দ্র কথা প্রসঙ্গে বলেন নরেন্দ্র দেবের কথাও। লেখকের কাছে এসেছিলেন তিনি, ছোটদের একটা বার্ষিকী প্রকাশ করা হচ্ছে, সেই পত্রিকাটি টাকা দেবে বলায় সেখানে নাকি লেখা দেওয়ার জন্য সাড়া পড়ে গিয়েছে!

‘উষ্ণীষ’-এর জন্য লেখা পাওয়া যায়নি বটে, কিন্তু ‘সাক্ষাত্কার—শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ শিরোনামে ‘উষ্ণীষ’-এর প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল এসব কথোপকথন।

সুবোধ চন্দ্র বিশ্বাস

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

রাজনীতির মহাকবির বয়ান

‘তুমি তো লয়ের পুতুল!’ 

অস্তাচলে বাংলা থ্রিলারের নবাবি সূর্য 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অভিনয় 

কবিতা

মঈন ও তার বাইসাইকেল 

অন্যের সিলেবাসে চলার দাসত্ব ও আত্মহত্যার দর্শন