মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মঈন ও তার বাইসাইকেল 

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ১৬:২৯

অনেকটা হৃদপিণ্ডের কাঁপুনির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাইকেলের প্যাডেল ঘোরাতে থাকে মঈন। নতুন কেনা ফিনিক্স বাইসাইকেল। এই শহরের লোকজন অবশ্য এটিকে ‘ফনিক্স’ নামেই চেনে। 

সেই সাইকেল পড়ন্ত বিকেলে উলটো দিক থেকে আসা চৈত্রের বাতাসকে অগ্রাহ্য করে বিজয়ীর বেশে এগিয়ে যেতে থাকে। শের-ই-বাংলা লাইব্রেরিকে বাঁয়ে রেখে, ঈদগাঁ পার হয়ে, আনসার ক্যাম্প অতিক্রম করে অনেকটা ঝড়ের গতিতে এগোতে থাকে মঈনের পঙ্খীরাজ। গন্তব্য জানা নেই, কিন্তু এই শহর ছেড়ে পালাতে হবে তাকে। সূর্যাস্তের ঠিক আগে, সন্ধ্যে নামার এই সময়টাতে মঈনের বাড়িতেই থাকার কথা। কিংবা ফেরার কথা। অথচ কাউকে কিছু না বলে সে ঘর ছেড়েছে। ঘর না ছেড়ে অবশ্য উপায় ছিল না তার। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ হয় আত্মহত্যা করে অথবা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। মঈন ভীতু প্রকৃতির মানুষ; কাজেই সে দ্বিতীয়টিকেই বেছে নিয়েছে।

এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আর চারদিন বাকি। স্কুলের ফার্স্ট বয় সে; সব ঠিক থাকলে ঢাকা বোর্ডে স্ট্যান্ড করার কথা তার। অথচ এইসব সম্ভাবনা আর ভালো রেজাল্টের হাতছানিকে পেছনে ফেলে সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পড়ার টেবিলের চারপাশকে তার ধেয়ে আসা অগ্নিকুণ্ডের মতো মনে হতে থাকে; বইগুলোকে ভারী পাথরখণ্ড। মঈন কাউকে বোঝাতে পারে না সে আসলে কীসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। জীবনের কোলাহল থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায় সে। কেন চায়? মানুষ কি চাইলেই জীবন থেকে পালাতে পারে? এ-ও কী সম্ভব? আজ সারাটা দিন তো সে অনন্ত মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করে চলেছে। 

দিনের বেলাটা যেমন তেমন, রাত ভয়াবহ। তার ধারণা, সন্ধ্যের পর কাজ থেকে বাড়ি ফিরে বাবা তার চোখের দিকে তাকালেই সব বুঝে ফেলবে। কিংবা রাতে খাবার টেবিলে মা কোনো এক অলৌকিক ক্ষমতাবলে জেনে যাবে তার ভেতরকার কালবৈশাখীর খবর। মঈন তার ভেতরের উথালপাতাল অবস্থা কাউকে বুঝতে দিতে চায় না। এই অদৃশ্য রক্তক্ষরণ, এই যন্ত্রণা, এই পাপবোধ—একান্তই তার নিজস্ব। মঈনের জীবনে এমন কিছু ঘটে গেছে যা সে কাউকে বলতে পারবে না। বাবা-মা তো নয়ই, ছোট বোন শারমিনকেও না। বন্ধু শিপলু, সজল কিংবা অনিমেষ—কাউকে না। কোনোমতে না হয় সবার চোখকে ফাঁকি দেওয়া গেল, কিন্তু বুকের ভেতরকার এই সুনামি, এই ভীষণ প্লাবন নিয়ে একটা দীর্ঘ রাত কী করে পার করবে সে?

বায়তুল আমান ব্রিজ পার হয়ে সারি সারি গাছের ভেতর দিয়ে ছুটে চলে মঈনের বাইসাইকেল। রাস্তার দুই পাশে অপরূপ জংলা সবুজের বিস্তার। সবুজ যে এতটা বিস্ময়কর হতে পারে সেটি তার কল্পনাতে ছিল না। ধানখেত, জলাশয়, হিজল-শিমুল-কৃষ্ণচূড়া পার হয়ে যেন এক নিবিড় অরণ্যের রহস্যময়তায় প্রবেশ করে মঈন। তার মনে হয়, জলরঙে আঁকা ছবির মতো, স্বপ্নের মতো এক গ্রামের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে সে। খানিক দূরে ডালপালা ছড়ানো আকাশছোঁয়া এক গাছের নিচে দাঁড়াতে ইচ্ছে হয় তার। কী আশ্চর্য! অনেক চেষ্টা করেও সে সাইকেল থামাতে পারে না। সাইকেলের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই তার। মঈন বুঝতে পারে, জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন চাইলেও থামা যায় না। কিছু একটা যেন তাড়া করে ফিরছে তাকে। ভয়? ব্যাকুলতা? আতঙ্ক? নাকি অন্য কোনো জীবনানন্দীয় বোধ? নাকি এই অনুভূতির কোনো নাম হয় না?

স্কুলের শিক্ষকরা তাকে ভালো ছেলে হিসেবেই জানে। মহল্লার মুরব্বিরাও। কিন্তু মঈন এখন রূপান্তরিত এক কিশোর। সে নষ্ট হয়ে গেছে। আসলেই কি মানুষ নষ্ট হয়? দুধ-দই-পায়েস, ফল কিংবা প্রচণ্ড গরমে ফ্রিজে না রাখা খাবার যেভাবে নষ্ট হয়? কোন পরিস্থিতিতে আমরা ধরে নেই একজন মানুষ নষ্ট হয়ে গেছে? খুন করলে? মঈন তো কাউকে খুন করেনি। তাহলে? ভালো না বেসেও কোনো নারীকে স্পর্শ করলে? কিংবা শরীরে প্রবেশ করলে? ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায় এসব কারা নির্ধারণ করে? ধর্মগ্রন্থ? সমাজ? রাষ্ট্র?

মঈনদের বাসার উলটোদিকের হলুদ রঙের বাড়িটা তার জগত্কে ওলটপালট করে দিয়েছে। বাড়ি? নাকি বাড়ির ছাদ? নাকি শেফালি খালা? তিরিশোর্ধ অপরূপ সুন্দরী এক নারী। বহু অর্থবোধক ইশারায় এই নারী একদিন তাকে ছাদে ডেকেছিল। এবং গল্পচ্ছলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই জড়িয়ে ধরেছিল। তাতে কী? কেউ কাউকে জড়িয়ে ধরলে তো মহাভারত অশুভ হয়ে যায় না! তাছাড়া ভদ্রমহিলাকে তো সে খালা ডাকে। খালা সম্পর্কের কাউকে কি চুমু খাওয়া যায়? তা-ও আবার ঠোঁটে?

সাইকেল ছুটে চলেছে। শেফালি খালার গায়ের ঘ্রাণ যেন মঈনের সারা শরীরে লেগে আছে। সেই ঘ্রাণ তাকে উড়ে আসা মেঘের মতো আচ্ছন্ন করে রাখে। মঈনের মনে হয়, সাইকেলের সামনের অংশে, তার দু’বাহুর মাঝখানে, শেফালি খালা নিবিড়ভাবে বসে আছে। সাইকেলটিকে তার মনে হয়, থমকে থাকা অপরাহ্নে প্রবল গতির আকাশযান কিংবা উড্ডীন গাঙচিল। শেফালি খালার স্পর্শে মঈনের সারা শরীর সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন চৈত্রের এই প্রখর দগ্ধ বিকেলেও শ্রাবণধারার অনুভব পায়। এই সুখানুভূতি কীভাবে প্রকাশ করতে হয় তা সে জানে না। 

সব কিছু কি আর ভাষায় প্রকাশ করা যায়! শেফালি খালার হাওয়ায় উড়তে থাকা চুল মঈনের চোখে, নাকে, ঠোঁটে ও চিবুকে এসে লাগে। সেই চুলের গন্ধ তার হৃদয় ও শরীরকে ভরে তোলে বিহ্বলতায়। সে একইসঙ্গে মুগ্ধ হয় এবং শূন্যতাবোধ করতে থাকে। সাইকেল চলতে থাকে। মঈন চোখ বন্ধ করে ফেলে। চোখ বন্ধ করেই সে দেখতে পায়, পশ্চিম আকাশে লাল গলতে শুরু করেছে। এ এক অদ্ভুত জাদুবাস্তবতা।

মায়াবী এই ভ্রমণ ছেড়ে বাড়ি ফেরার কথা একবারও মনে হয় না মঈনের। অদ্ভুত এই জাদুর সাইকেল তাকে নিয়ে হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার মতো শূন্যে মিলিয়ে যেতে চায় কিংবা দিগন্তে। সে কি আর কোনোদিন বাড়ি ফিরতে পারবে? যে ঘর আমরা ছেড়ে আসি সেই ঘরে কি আর ফেরা যায়? বাড়ি ফিরে মাকে সে কী বলবে? বাবাকে? শারমিনকে? কেন তাকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল? এই অদ্ভুত ভাংচুর অবস্থায় সে কীভাবে নাবিলার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? গলির একেবারে শেষের দোতলা বাড়ির ছাদে ঝকঝকে স্বপ্নাচ্ছন্ন যে মেয়েটি মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে; আর মঈনকে দেখলেই জুঁহি চাওলার মতো করে হাসে। 

নাবিলাকে মঈন পছন্দ করে; হয়তো নাবিলাও তাকে। কিন্তু সে কথা আজো বলা হয়নি। কীভাবে বলতে হয় তা-ও জানে না তারা। শুধুমাত্র কয়েক জোড়া হুমায়ূন আহমেদ আর সুনীলের ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’র আদান-প্রদান হয়েছে। কী আশ্চর্য! সাইকেল চালাতে চালাতেই মঈন নাবিলার কণ্ঠ শুনতে পায়। ঐন্দ্রজালিক মায়াবিনী এক কণ্ঠস্বর। সন্ধ্যের অপার রহস্যময়তাকে ভেদ করে নাবিলা মন্ত্রের মতো বলে ওঠে, ‘পালিয়ে যাও মঈন। তোমাকে পালাতে হবে!’

[লন্ডন]

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রস 

পরম্পরা 

বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্রের একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ

তামাশা 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কালো সূর্য

থাই মহাকাব্য রামাকীইন-কথা

পথের শেষ কোথায়? ঘৃণার শেষ কোথায়?

বাংলাদেশপ্রেমিক একজন কবি