বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

মানিকের লাল কাঁকড়া এবং একজন আফজাল হোসেন

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৪৮

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনকাহিনী নিয়ে লেখা আনজীর লিটনের কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হচ্ছে চলচ্চিত্র ‘মানিকের লাল কাঁকড়া।’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করছেন দেশবরেণ্য নির্মাতা-অভিনেতা আফজাল হোসেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই খবরে তার ভক্তরাও আকুল হয়ে আছেন। আফজাল হোসেনের সিনেমা বলে কথা!

মানিকগঞ্জের একটি পুরনো বনেদী বাড়িতে সেট ফেলা হয়েছে। খুব ভোরে ধানমন্ডি অবস্থিত আফজাল হোসেনের সৃজনশীল কারখানা ‘মাত্রা’ অফিসের সামনে কয়েকটি শুটিংয়ের গাড়ি এবং একটি গোটা বাস দাঁড়িয়ে। অবশ্য আফজাল হোসেনের কারিগরি প্রতিষ্ঠান মাত্রার সামনে ভোরবেলা এমন শুটিংয়ের গাড়ি দেখে অভ্যস্ত আশেপাশের টং দোকানিরাও। এটা তাদের কাছে মামুলি! ‘মাত্রা’ অফিসের নিচেই দীর্ঘদিন ধরে চা বিক্রি করেন এক বয়সী যুবক। তাকে আফজাল হোসেন প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘চিনি তো। বিখ্যাত ডাইরেক্টর। তয় আমার সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে লাভস্টোরিগুলাই দেখতে ভালো লাগে। ম্যালা দিন তারে দেখি না!’ বললাম, আজ তার সিনেমার শুটিং।

আমার কথা শেষ হতে না হতেই সে এক রকম অট্টহাসি দিয়েই বললো, ‘এ আর নতুন কী। উনি তো ডেইলিই সিনেমার শুটিং করে।’ সত্যিই তো তাই! বিজ্ঞাপন জগতের এই মহীরূহর ঐ ছোট লেন্থের কাজগুলোও তো একেকটি সিনেমা। আমরাই বরং ভুল বলি। ফাঁকা রাস্তা। গাড়ির বহর মানিকগঞ্জের শুটিংস্পটে আসার পর দেখি নির্মাতা আগেই এসে হাজির। ফ্রেম দেখছেন চিত্রগ্রাহকের সঙ্গে। কোথায় কোন সিকোয়েন্স নেবেন ঠিক করছেন। একাধিক চরিত্রাভিনেতা এসেছেন গাড়িতে। তারা সকলেই বাস থেকে নেমে মেকাপ ও ড্রেস পরে রেডি হতে লাগলেন। রিমু খন্দকার, শামা, সুজন, তানভীর সামদানিসহ একঝাঁক তরুণ-তরুণীর কাছে জানতে চাইলাম আফজাল হোসেনের সঙ্গে কাজ করার অনুভূতি। থিয়েটারকর্মী সুজন বললেন, ‘আমি বেশ কিছু কাজ করেছি তার নির্মাণে। ছোটকাকু সিরিজেও আমি ছিলাম। আসলে তার সঙ্গে কাজ করলে অনেককিছু শেখা যায়।’ রিমু খন্দকার বললেন, ‘প্রত্যেক নির্মাতারই আলাদা আলাদা স্টাইল থাকে। আর আফজাল ভাই হলেন তাদের আইকন। আমাকে শুধু বলেছেন আজ সেটে থাকতে। আমি কোনোকিছু জানতে না চেয়েই হাজির হয়ে গেছি।’ অভিনেত্রী শামা ফারজানা বললেন, ‘কিছু বিজ্ঞাপনের কাজ করেছি। একটা বড় ব্র্যান্ডের কাজ করেছিলাম। তবে তা প্রচার পায়নি। তাতে দুঃখও নেই! কারণ কী জানেন? আফজাল ভাইয়ের টিমে কাজ করলে নিজের পোর্টফোলিওটাও যে বড় হয়। একটা দারুণ অভিজ্ঞতা হয়।’ আফজাল হোসেনের নতুন চলচ্চিত্র ‘মানিকের লাল কাঁকড়া’ ছবির কলাকুশলীরা ব্যস্ত হয়ে গেলেন শুটিংয়ের জন্য। এদিকে ছবির মূল পাত্র-পাত্রী চিত্রনায়ক ফেরদৌস ও সোহানা সাবা এলেন খানিক দেরিতে। কারণ তাদের কাজ আরো খানিকটা বেলা গড়িয়েই শুরু হবে। সবার হাতেই স্ক্রিপ্ট দেওয়া হয়েছে। সহকারীকে জিজ্ঞেস করলাম, এখন কার শট নেওয়া হবে। এ কথা জানতে চাইতেই এক মজার তথ্য দিলেন। দেখুন, উনি মূলত কবি। ক্যামেরার কবি। তাই সবকিছু বসের মাথায় থাকে। আমরা তার নির্দেশ মেনে চলি মাত্র।’ খেয়াল করলাম, সত্যিই আনমনা আর অস্থির একজন পুরো শুটিং বাড়ির এপাশ থেকে ওপাশ হাঁটছেন। আর চিত্রগ্রাহককে নির্দেশ দিচ্ছেন। কখনো গ্রাউন্ডে ক্লোজ শটে, কখনো ছাদের ওপর থেকে টপ ভিউ। সেখানেও চিত্কার করে পারফর্মারদের বলছেন কোথায় দাঁড়াতে হবে। কী বলতে হবে।’

সারাদিন একাধিক সিকোয়েন্স শেষে সন্ধ্যার পর গান ধারণ করা হবে। ফেরদৌস একজন লেখকের চরিত্রে অভিনয় করছেন। আর সোহানা সাবা একজন বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পীর চরিত্রে। তাদের চরিত্র দুটির নাম মুহিত ও ঝর্ণা কাজী। সোহানা সাবা বললেন, ‘আফজাল ভাইয়ের যে কোনো নির্মাণেই আলাদা একটা বিশেষত্ব থাকে। দেশে কিছু নির্মাতার কাজ কোনোকিছু না দেখেই রাজি হওয়া যায়। তাদের একজন আফজাল হোসেন। এই ছবিটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র। দারুণ একটা গল্পের ভেতরে এক ধরণের মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। আর আফজাল ভাইয়ের সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো তিনি সকলের কাছ থেকে অভিনয়টা বের করিয়ে নিতে পারেন। তাই আমি সৌভাগ্যবান, এমন একটি কাজে সুযোগ পেয়েছি বলে।’ দুই বাংলার জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ফেরদৌস আফজাল হোসেনের একাধিক টিভিসি-নাটকসহ বিভিন্ন প্রডাকশনে কাজ করেছেন। সেটে একপাশে ড্রোন শট নেওয়া হচ্ছে। আরেক দিকে বিভিন্ন সংলাপের ধারণ চলছে। ফেরদৌস বললেন, ‘বাংলাদেশে এমন ফাইনেস্ট আর্টিস্ট আর আপনি কোথায় পাবেন। কী পারেন না তিনি! প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার নিজস্ব যে যত্ন, তা শেখার মতো! আজো ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে আমাদের পানসে লাগবে। ভালো লাগছে তার নির্মিত চলচ্চিত্রের অংশ হতে পেরে।’

লাঞ্চ ব্রেক শেষ করে আরো কিছু সিকোয়েন্স ধারণ করে একটি বৈঠকি আসরে বসে সোহানা সাবার লিপে একটি রবীন্দ্রসংগীত ধারণ করা হবে। আফজাল হোসেন বারবার মনিটর দেখছেন। আর উঠে এসে সাবাকে বলছেন কোথায়, কীভাবে দাঁড়াতে হবে। মানিকগঞ্জের চৌধুরী বাড়িটির বয়স একশ’ বছরের বেশি। ড. নওয়াজেশ আহমেদের এই বনেদী বাড়িটা খুব সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো। তার চেয়েও নান্দনিক হয়ে ওঠে যখন দেশের সবচেয়ে নান্দনিক নির্মাতা নিজের চলচ্চিত্রের ছবি আঁকতে থাকেন এমন একটি জায়গায়। রাত গড়িয়ে তখন দেড়টারও বেশি। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে, এপাশ ওপাশ হেঁটে নিজের ছবির শট বুঝিয়েছেন। আফজাল হোসেনের কাছে কিছু জানতে চাওয়ার প্রয়োজন মনে করলাম না। শুধু বললেন, ‘একেকটি কাজ, একেকটি শিল্প বিপ্লব। প্রতিটি মুহূর্তই এখানে আসলে মূল্যবান। একজন লাইটম্যানের মন খারাপ থাকলে তার আলোর প্রক্ষেপণেও প্রভাব পড়ে। তাই এই যে প্রায় একশ মানুষের ইউনিট, তাদের সমন্বিত ভালোবাসার নামটাই চলচ্চিত্র!

মাঝরাত। সকলে আবারো ঢাকায় ফেরার তাড়নায় যার যার আসন বুঝে নিচ্ছেন। পরদিন অন্য লোকেশন। অন্য সিকোয়েন্স। চলচ্চিত্রর নাম ‘মানিকের লাল কাঁকড়া’

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে শিরীন শিলা

পিয়ার ‘ছিটমহল’

দুমুখোদের থেকে সচেতন থাকতে বললেন ফেরদৌস

কী আছে কাঞ্চন-নিপুণ প্যানেলের ২২ দফা ইশতেহারে?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

হঠাৎ প্রকাশ্যে এসে কাঁদলেন পপি, করলেন গুরুতর অভিযোগ

আমাকে খুনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে: রিয়াজ

চলতি বছর শুধুই আল্লু অজু‌র্নের!

‘দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর মতো কাজ করতে চাই’