নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) আগামী ৫ বছরের জন্য কে হচ্ছেন নগরপিতা-এ প্রশ্নে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপকালে তারা আকারে ইঙ্গিতে বললেও খোলামেলা কোন প্রার্থীর পক্ষে কথা বলেননি।
আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর কর্মীরা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের কর্মীরা ছাড়া অন্য কেউ সরাসরি এ প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। তবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে শনিবার দিনভর আলাপকালে কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য প্রকাশ করেছেন।
এবারের নির্বাচন নাসিকের আগের দু’টি নির্বাচনের চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মুখ খুলে কিছু বলছে না। তবে নীরব ভোটারদের ভোট যে দিকে যাবে সেই প্রার্থীই আগামী ৫ বছর নগর ভবনে দায়িত্ব পালন করবেন এমনটাই বোঝা যাচ্ছে। তবে লক্ষণীয় এবার দুই প্রার্থীই একে অন্যকে আক্রমণ করলেও তা সংযত ভাষায় করছেন। কেউ কাউকে আঘাত করে কোন মন্তব্য করেননি।
আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর যেমন দলীয় ভোট নিয়ে শঙ্কা রয়েছে তেমনই স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকারের নেতাকর্মীদের ভোট নিয়েও শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একটি অংশ প্রকাশ্যেই হাতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এবারের নির্বাচনেও বরাবরের মত এখনো শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।
শনিবার নাসিকের সকল এলাকা ছিল অনেকটাই শান্ত ও নীরব। যে নগরীর অলিগলিতে শুক্রবার পর্যন্ত মিছিল মিটিং আর শ্লোগানে শ্লোগানে প্রার্থীর সমর্থকদের পদচারণায় মুখরিত ছিল সেই শহর এখন অনেকটাই যেন নিস্তব্ধ।
একাধিক ব্যবসায়ী নেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা জানায়, কোন সহিংস ঘটনা এখনো ঘটেনি। এটা প্রশাসনের চাইতে প্রার্থীদের সহনশীলতাই বেশী বলে মনে করেন তারা। তবে আগামী নগর পিতা কে হবেন তা তারা খোলা মেলা না বললেও আগামীতে উন্নয়ন করতে পারবেন এমন প্রার্থীকেই তারা মেয়র হিসাবে দেখতে চান। শহরের যানজট এতটাই তীব্র যে, সাধারণ মানুষ এ নিয়ে ত্যক্ত বিরক্ত।
শহরের ফুটপাত বিশেষ করে রেল লাইনের দু’পাশে অবৈধভাবে গড়ে উঠা দোকানপাটের উচ্ছেদ চান ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের মতে, একটি প্রধান সড়ক দখল করে কীভাবে কাঁচাবাজার চলছে কারা এর সঙ্গে জড়িত তা চিহ্নিত করে এদেরকে আইনের আওতায় আনা উচিৎ। খালেদা হাবিব স্মৃতি নামের এক গৃহবধূ জানান, আমরা সন্ত্রাসমুক্ত শান্তির নারায়ণগঞ্জ চাই।
বন্দরের বাসিন্দা নাসির উদ্দিন জানান, নৌ ফেরিঘাটগুলি উন্নত করে টোল আদায়ের নামে জুলুমবাজি বন্ধ হওয়া উচিৎ।
একাধিক রাজনৈতিক নেতা বলেন, নাসিকের মেয়র পদে মূলত সেলিনা হায়াৎ আইভী ও তৈমূর আলম খন্দকারের নৌকা-হাতি মার্কায় ভোটযুদ্ধ হবে। তবে এই দুই প্রার্থী নির্বাচিত হলে আগামীতে তারা নগরবাসীর জন্য কী করবেন তার স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা কোন ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ ঘোষণা দেননি। যদিও তাদের প্রচার প্রচারণায় আগামীতে কী কী করবেন তা বলেছেন। তবে এসব বক্তব্যকে তারা রাজনৈতিক বক্তব্য বলে মনে করছেন।
শহরের একাধিক বাসিন্দা টেক্সসহ বিভিন্ন করের বোঝা লাঘবে আগামীতে যিনি নির্বাচিত হবেন তার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা নগরবাসী অবশ্যই আগামীতে যিনি কাজ করতে পারবেন তাকেই নির্বাচিত করব। সব মিলিয়ে সাধারণ ভোটাররা মুখ খুলতে নারাজ। তবে ভোটযুদ্ধ যে এবার হাড্ডাহাড্ডি হবে এমনটাই মনে করছেন নগরবাসী। পাশাপাশি তারা সরকারের প্রতি নির্বাচন নিয়ে যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে তা থেকে সরে যাওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। নির্বাচন নিয়ে নারায়ণগঞ্জের মানুষের মতোই দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হলো কারা পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন পরিচালনার দায়িত্বে আসছেন। কে হচ্ছেন নগরপিতা।
এবারও কি বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জিতবে, নাকি তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি স্বতন্ত্র হিসাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপি নেতা অ্যাড. তৈমূর আলম জিতবেন? এমন নানামুখী আলোচনার উত্তর পাওয়া যাবে রবিবার রাতেই। বিকেল চারটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের পর শুরু হবে ভোট গণনা। এবারই প্রথমবারের মতো ইভিএম পদ্ধতিতে সকল কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে ফলাফল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।
গত বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন উদাহরণ হয়ে থাকবে। এছাড়া নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রেখে ভোটারদের সব নিরাপত্তা দেওয়ার কথা দৃঢ় চিত্তে উচ্চারিত করেছেন জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তারা।
রবিবার সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। এবারের ভোটে দেশের পাঁচটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা মেয়র পদে অংশ নিয়েছেন। স্বতন্ত্র রয়েছে দু’জন। নাসিক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর। ভোটগ্রহণের তারিখ ১৬ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। এই নির্বাচনে মেয়র পদে ৫টি রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মূলত আওয়ামী লীগ (নৌকা) ও স্বতন্ত্র (হাতি) প্রার্থীর মধ্যে।
এছাড়া ২৭টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর ২৭টি পদে বিপরীতে লড়বেন ১৪৮ ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ৯টি পদের বিপরীতে লড়বেন ৩৪জন প্রার্থী।
