বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব: বিনোদনজগতে আমূল পরিবর্তন

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২২, ১০:১১

১৯৬৪ সালে মার্শাল ম্যাকলুহান বলেছিলেন, মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ। অর্থাৎ বাহনই হলো বার্তা। মাত্র চার শব্দের এই বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সহস্র শব্দের মর্মার্থ। আর ছয় দশক আগে বলা সেই কথা সময়ের সঙ্গে যেন আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

বিশ্বায়নের যুগে এই চার শব্দের একটা বাক্য ডালপালা মেলে আরো বেশি সত্য আর মূর্ত হয়ে ধরা দিচ্ছে। এখন আর বিনোদনকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে রাখা যাবে না। ডিজিটাল কনটেন্টগুলো তাই নির্মিত হচ্ছে নির্দিষ্ট দেশের, শ্রেণির, ভাষার দর্শকদের জন্য নয়, বরং বিশ্বের দর্শকদের জন্য। বাংলাদেশের মানুষ তাই বাংলাদেশি, ভারতীয় বা মার্কিন কনটেন্ট ছাড়াও ঝুঁকেছে কোরিয়া, জাপান, ইতালি, স্প্যানের চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ আর গানের প্রতি।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ব্লক চেইন, আইওটি, ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, রোবটিকস, মাইক্রোপ্রসেসর ডিজাইনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পথে নেতৃত্ব দিতে সবাইকে একসঙ্গে উদ্ভাবনের পথে একযোগে কাজ করতে হবে, তাহলেই আমরা এগিয়ে যাব। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার, বিদু্যতের ব্যবহার এবং ট্রানজিস্টার আবিষ্কার ব্যাপক শিল্পায়ন সৃষ্টির মাধ্যমে মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছিল বলে ঐ তিন ঘটনাকে তিনটি শিল্পবিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এখন বলা হচ্ছে, ডিজিটাল প্রযুক্তির নিত্যনতুন উদ্ভাবনের পথ ধরে আসছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, যেখানে বহু প্রযুক্তির এক ফিউশনে ভৌতজগত্, ডিজিটাল জগত্ আর জীবজগত্ পরস্পরের মধ্যে লীন হয়ে যাচ্ছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব শুধু আমাদের কর্মজীবনেই পরিবর্তন করছে না, পালটে দিচ্ছে সবকিছুকেই। এটি প্রভাব ফেলবে আমাদের পরিচয় সত্তায় এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুতে, আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায়, আমাদের সম্পদ মালিকানার ধরনে, আমাদের ভোগের ধরনে, আমাদের কাজ ও বিশ্রামের সময়ে, আমাদের কর্মজীবন গড়ায়, আমাদের দক্ষতাচর্চায়, মানুষের সঙ্গে সাক্ষাতে এবং আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কে।

এই পরিবর্তন তালিকা অন্তহীন। এটি সীমিত একমাত্র আমাদের কল্পনায়। অনেকের ব্যক্তিগত জীবনে প্রযুক্তিকে স্বাগত জানানোর ব্যাপারে প্রবল উত্সাহ। কিন্তু এরা কখনো কখনো অবাক হন, আমাদের জীবনে এই অদম্য প্রযুক্তির সমন্বয় ধ্বংস করে দিতে পারে আমাদের কিছু অতি প্রয়োজনীয় পরিপূর্ণ মানবিক গুণা, যেমন :সমবেদনা ও সহযোগিতা। এক্ষেত্রে আমাদের স্মার্টফোন একটি বিবেচ্য। অব্যাহত সংযুক্তি আমাদের বঞ্চিত করতে পারে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ থেকে : একটু থামার, প্রতিফলন ঘটানোর ও অর্থপূর্ণ কথাবার্তা বলার সময়।

ব্যক্তিজীবনে নতুন প্রযুক্তি যে চ্যালেঞ্জটি নিয়ে এসেছে বা আনবে, তা হচ্ছে, আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিনষ্ট হওয়া। আমরা তাত্ক্ষণিকভাবেই বুঝতে পারি, কেন এটি এতটা অপরিহার্য। এর পরও আমাদের সম্পর্কিত তথ্যের ওপর নজরদারি ও বিনিময় হচ্ছে নতুন কানেক্টিভিটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মৌলিক বিষয়ে বিতর্ক, যেমন আমাদের অন্তর্জীবনে এর প্রভাব হবে আমাদের ডাটার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ আসছে বছরগুলোতে আরো জোরদার হবে। একইভাবে, জৈবপ্রযুক্তি তথা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে ঘটে চলা বিপ্লব আমাদের বর্তমান জীবনকাল, স্বাস্হ্য, বোধশক্তি ও সক্ষমতাকে পেছনে ঠেলে দিয়ে মানুষ হওয়ার সংজ্ঞা পালটে দিচ্ছে। বিষয়টি আমাদের বাধ্য করবে নৈতিক ও জীবনবিধান-সম্পর্কিত সীমানা নতুন করে নির্ধারণে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে আসা প্রযুক্তি কিংবা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একটি বাহ্যিক শক্তি, যার কোনোটির ওপরই তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ কাজটি আমরা করছি আমাদের নাগরিক, ভোক্তা ও বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায়। অতএব, আমাদের সুযোগ ও ক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে নতুন আকার দেওয়ায় এবং তাকে এমন এক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে হবে, যাতে প্রতিফলন থাকে মানবজাতির অভিন্ন লক্ষ্য ও মূল্যবোধের। নিজেদের জন্যই সবকিছুতেই।

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কম্পিউটার সহজলভ্য হয়েছে এবং একসময় মানুষ তার নিজের ব্যক্তিগত কাজের জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করতে শুরু করে। কম্পিউটার যখন শক্তিশালী হয়েছে তখন এটি শুধু লেখালেখি বা হিসাব নিকাশের জন্য ব্যবহূত না হয়ে ধীরে ধীরে বিনোদনের জন্য ব্যবহূত হতে শুরু করেছে। গান, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র সবকিছু এখন কম্পিউটার দিয়ে করা যায়। তথ্যপ্রযুক্তির কারণে বিনোদনের গ্রহণের প্রক্রিয়াটিতে যে রকম পরিবর্তন এসেছে, ঠিক সেরকম পরিবর্তন এসেছে বিনোদনের বিষয়গুলোতে। সংগীতকে ডিজিটাল রূপ দেওয়ায় এখন আমরা কম্পিউটারে গান শুনতে পারি।

ঠিক একইভাবে আমরা ভিডিও বা চলচ্চিত্র দেখতে পারি। সিডি রম কিংবা ভিডিও বের হওয়ার পর সেখানে বিশাল পরিমাণের তথ্য রাখা সম্ভব হয়েছে। সিনেমা হলে না গিয়ে ঘরে বসে কম্পিউটার কিংবা টেলিভিশনে সিনেমা দেখা এখন খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতি হবার পর নতুন কিছু বিনোদনের জন্ম হয়েছে, যেটি আগে উপভোগ করা সম্ভব ছিল না, তার একটা হচ্ছে কম্পিউটার গেমস। সারা পৃথিবীতে এখন কম্পিউটার গেমের বিশাল শিল্প তৈরি হয়েছে এবং নানা ধরনের কম্পিউটার গেমের জন্ম হয়েছে। কম্পিউটার গেমসের ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখে আন্দাজ করা যায়, এটি বিনোদনের অন্তত সফল একটি মাধ্যম, এর সাফল্যের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, এটি ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক লোকজনকেও তার রুচিমতো আনন্দ দিতে পারে।

গত কয়েক দশকে বদলে গেছে বিশ্ব। অন্য সবকিছুর সঙ্গে অবধারিতভাবে পরিবর্তন এসেছে বিনোদনমাধ্যমে। প্রযুক্তির কল্যাণে বিনোদনমাধ্যমে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে বিনোদন গ্রহণের ক্ষেত্রে। সিনেমা হল, টিভি, ডিভিডি ছাড়িয়ে বিনোদন স্হান করে নিয়েছে ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফরমে। একটা স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যে কেউ জামার পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারে বিশ্বের বিনোদনের জগত্।

একটা দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ আর ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে অ্যাকাউন্ট থাকলেই হাতের মুঠোয় চলে আসছে দেশি-বিদেশি হাজারো কনটেন্ট। আবার প্রতিটি প্ল্যাটফরমেই পুরোনো আর ক্ল্যাসিক প্রযোজনার পাশাপাশি থাকছে তাদের নিজস্ব মৌলিক কনটেন্ট। একেকটি প্ল্যাটফরম কিছু কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে নিজেদের আকর্ষণীয় করে তুলছে সবার কাছে। হলে সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে কত রকম ঝক্কি-যানজট ঠেলে হলে যাওয়া, টিকিট কাটা বা নির্দিষ্ট শোর সময় মেনে সিনেমা দেখার বাধ্যবাধকতা। এসব ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফরমগুলো। বিশেষ করে তাদের মৌলিক প্রযোজনাগুলো। ডিজিটালভাবে মুক্তি পাওয়া মাত্রই একযোগে সেসব দেখার সুযোগ পাচ্ছেন সারা বিশ্বের দর্শক।

বিনোদন নিয়ে কেবল দর্শকের রুচির পরিবর্তনই নয়, নির্মাণ আর বিনোদনের সঙ্গে যুক্ত সবার ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন এনেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফরম। তরুণ একজন নির্মাতার এখন আর টিভিতে ভালো স্পট পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। চলচ্চিত্র নির্মাতারা এখন আর হল পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত নন। প্রযোজকেরাও লগ্নির অর্থ নিয়ে এখন বেশ স্বস্তিতেই আছেন ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের প্রসারে। লাভের গুড়ে ভাগ বসানোর সুযোগও নেই মধ্যস্বত্বভোগীদের।

পরিবর্তনই একমাত্র ধ্র‚ব সত্যি। সেই সত্যি মেনে সময়ের সঙ্গে সবকিছুই বদলে যায়। বদলে যায় বিশ্ব আর বিশ্বের সবকিছু। বদলে যায় মানুষের জীবন, জীবন যাপন, দর্শক আর দর্শকদের রুচি। আর সবকিছুর সঙ্গে অবধারিতভাবে বদলে যায় বিনোদন। পরিবর্তিত এই বিনোদনজগতে মানুষ যে আগের চেয়ে স্বাধীন ও সহজভাবে বিনোদন পাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতি মুহূর্তে ওপরের দিকে উঠতে থাকা জনপ্রিয়তার পারদই নীরবে চিত্কার করে তার প্রমাণ দিচ্ছে।

পুরো প্রযুক্তি শিল্প জুড়ে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, অনেক শিল্প খাতই নতুন প্রযুক্তি সূচনা করেছে, যা বিদ্যমান চাহিদা পূরণ করবে পুরোপুরি নতুন উপায়ে গ্রাহকেরাই ক্রমবর্ধমান হারে চলে আসছে ভৌত পণ্য অথবা সেবা এখন জোরদার করা যাবে ডিজিটাল সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে, নাগরিক সাধারণ তাদের অভিমত তুলে ধরার সুযোগ পাবে, এমনকি জনগণ সরকারি কর্তৃপক্ষকেও তত্ত্বাবধান করবে। একই সঙ্গে সরকার অর্জন করবে নয়া প্রাযুক্তিক ক্ষমতা, যার মাধ্যমে সরকার জনগোষ্ঠীর ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে।

সবকিছুই নির্ভর করে মানুষ ও মানবজাতির মূল্যবোধের ওপর। আমাদের প্রয়োজন মানবজাতির জন্য এমন একটি ভবিষ্যত্ বিনির্মাণ, যা আমাদের সবার জন্য উপকার বয়ে আনে, আমাদের জন্য তা কার্যকর প্রমাণিত হয়। জোর দিতে হবে মানুষের ওপর এবং মানুষের ক্ষমতায়নের ওপর। সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ডিহিউম্যানাইজড আকারের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের হয়তো সম্ভাবনা আছে মানবজাতিকে রোবটায়িত করার।

মানবপ্রকৃতি-সৃজনশীলতা-সহমর্মিতা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্বের সর্বোত্তম অংশ হচ্ছে একটি নতুন ধরনের যৌথ নৈতিকতা বোধ, যার ভিত্তি আমাদের পরিণতি বোধ। সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের সবার দায়িত্ব। আর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটি আমাদের কারো ভুলে থাকার অবকাশ নেই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

ইত্তেফাক/এসজেড