পরিবারের সুখের জন্যই আসতে হয় দূরপ্রবাসে। আর এজন্য লাখ লাখ টাকার প্রয়োজন। সেই টাকা জোগাড় করার জন্যে কেউ জমি বিক্রি করে, কেউবা রাখে বন্ধক। যদি কারো তেমন জমি না থাকে তাহলে ঘরটাও বন্ধক রেখে দেয়। গ্রামের আশেপাশে তো দালালের অভাব নেই। সেই দালালের মিষ্টি মিষ্টি কথায় আমার মতো হাজার হাজার যুবক পাগল হয়ে যায় দেশ ছেড়ে বিদেশ যাওয়ার জন্যে।
আমি আমার কথাই বলি—এসএসসি পাশ করার পর আমাদের গ্রামের পাশেই সিঙ্গাপুর যাওয়ার জন্যে ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি হলাম। দুটি বছর চলে গেল, কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারলাম না কোনো কারণবশত। আমার টার্গেট আমি সিঙ্গাপুর যাবই। আমাদের গ্রামের অধিকাংশ আমার বয়সি কিবা ছোট-বড় অনেকে তিন-চার মাস ট্রেনিং দিয়েই ফাইনাল পরীক্ষায় পাশ করে সিঙ্গাপুর চলে গেছে। আর আমি কি না চান্স পেলাম না! ইচ্ছাশক্তির জোর আর ভাগ্য অনুকূল থাকায় আসতে পারলাম সিঙ্গাপুরে ছয় মাসের ভিসায়। সেখানে পরীক্ষা দেব। যে বিষয়ে পরীক্ষা দেব তা তো আমার জানা আছেই। নিশ্চিত পাশ করব। কিন্তু তা হলো না। ছয় মাস শেষে বাংলাদেশ ফিরে আসি একবুক জ্বালা নিয়ে। তারপর মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য প্রস্ত্ততি নিলাম ভিজিট ভিসায়। এখানে যাওয়ার আগে ইন্ডিয়ায় ঘুরতে হবে, ঘুরলাম। মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্যে ফ্লাইট হলো। আমার চিন্তা হলো এখানে অবৈধভাবে থেকে যাব। কিন্তু তাও হলো না। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন পুলিশ আটকিয়ে দিল। রিটার্ন টিকিট কাটা ছিল বলেই দুদিন পর দেশে আসতে পারি। দুই সপ্তাহ পর আবার গেলাম। এবারও আটকিয়ে দিল। দেশে এসে ছয় মাসের মতো শহরে কাজ করি। তারপর শুনলাম, আমাদের ঐ ট্রেনিং সেন্টার থেকে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানো হচ্ছে অল্প টাকায়। সেখানে পাসপোর্ট জমা দিলাম। ছয় মাস হয়ে গেল কোনো খবর নেই। তারপর তারা বলল, মালদ্বীপ চলে যেতে। প্রথমেই দুই বছরের ভিসা। দশ বছর থাকতে পারব।
বেশি টাকা না, মাত্র দেড় লাখ টাকা। মাসিক বেতন ৩০০ ডলার। অবশেষে মালদ্বীপ এলাম। দুই লাখ টাকা খরচ হয়ে গেল। দিল এক বছরের ভিসা। আমার সঙ্গে যোগাযোগ না করেই, আমাদের গ্রাম থেকে একজন লোক এলো আড়াই লাখ টাকা খরচ করে। তাও আবার সাত মাসের ভিসা। ৩০০ ডলার বলে তার ২৫০ ডলার বেতন। যা হোক, আমার এক বছর হয়ে গেল। ভিসাও শেষ। এছাড়া আমার সাইডের কাজও নেই। দেশে পাঠিয়ে দেবে। টিকিটও কেটে ফেলেছে কোম্পানি। দেশে চলে গেলে ঋণগুলো দেবে কে? তা আবার ঘরবাড়ি বন্ধক রাখা, মুনাফায় টাকাও আনা। এভাবেই বিদেশ বিদেশ করে লাখ লাখ টাকা ক্ষতি হয়ে গেছে। কোম্পানি থেকে পালিয়ে এসে পড়লাম অন্য কোম্পানিতে। ছয় মাস না যেতেই বিশ্বজুড়ে দেখা দিল করোনাভাইরাস। আমাদের গ্রামের লোকটাও ঐ কোম্পানি থেকে পালিয়েছে ভাইরাস আসার এক মাস আগেই। কী করবে! ঋণে তো জর্জরিত। করোনার কারণে হয়ে গেল এলোমেলো। অনেক কোম্পানি কাজ বন্ধ করে দিল। কিছু কিছু কোম্পানি কাজ চালু রেখেছে।
সেই কোম্পানিগুলো পাঁচ-ছয় মাস হলেও বেতন দিচ্ছে না। রাজপথে নামে প্রবাসীরা, করে আন্দোলন। পুলিশের সঙ্গে হয় হাঙ্গামা। মালদ্বীপে অধিকাংশই বাঙালি তা আবার কারো কাগজপত্র ঠিক নেই। তবে পুলিশ তাদের তেমন কিছু বলে না। তবে হাঙ্গামা করলে কাউকে ছাড়ে না। করোনারভাইরাসের কারণে দেখা দিল খাদ্যের সংকট। বাংলাদেশ থেকে খাদ্যদ্রব্য পাঠানো হলো। কিছুটা পরিস্হিতি ভালো হলে মালদ্বীপ সরকার ঘোষণা দিল, যারা দেশে যেতে ইচ্ছুক তাদের দেশে পাঠিয়ে দিবে ফ্রি টিকেটে। প্রতিসপ্তাহে ফিরছে স্বদেশিরা। তবে পরিস্হিতি তেমন ভালো হয়নি। কিছু করারও নেই। কিন্তু আমার মতো ঋণগ্রস্ত মানুষ কী করবে? দেশে গেলে তো রেহাই নেই। এখানে থেকেও লাভ নেই কোনো। যা হোক, আমার দুই বছরের ওপরে হয়ে গেল। আমার কাজ চলছে শুরু থেকেই। আমার গ্রামের ঐ লোকটি কোনো কাজ না পেয়ে ছয় মাস অপেক্ষা করার পর ফ্রি টিকেটে দেশে চলে গেল।
আমার কাজ চলছে তো চলছেই, তবে বেতন ঠিকমতো পাচ্ছি না। এতটুকুও ধারণা করতে পারি—আমার দু-তিন মাসের বেতন মার যেতে পারে। এই তো ক’দিন আগে ক্যান্টিনের কর্মচারীদের কয়েক মাস ধরে বেতন না দেওয়ায় তারা বেতনের জন্য আন্দোলন করল। এই আন্দোলন করার জন্যে পুলিশ আনা হলো, যাতে এখানে কোনো হাঙ্গামা সৃষ্টি না হয়। কিন্তু পুলিশ বেতন ছাড়াই এখান থেকে বিদায় করে দিল কিছু খরচের টাকা দিয়ে। এরকম চলছে আরো অনেক কোম্পানিতে। আবার কিছু কিছু কোম্পানি বেতন দিচ্ছে, কিন্তু কিছু বাঙালি বস শ্রমিকদের বেতন মেরে উধাও হয়ে যাচ্ছে। আমরা সাধারণ প্রবাসীরা কোথায় যাব? পরিবারের সুখ খুঁজতে এসে এখন শুধু দুঃখকেই সঙ্গী করে পথ চলছি।
লেখক: মালদ্বীপ প্রবাসী
