বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সরকারকে বেকায়দায় ফেলার সূক্ষ্ম প্রস্তাব ড্যাপে 

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:০০

এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব বিবেচনায় ভবনের ফ্লোর এরিয়া নির্ধারণ করে চূড়ান্ত করা হয়েছে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)। যা গেজেটের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে এটি হবে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। যা সরকারকে বেকায়দায় ও বিব্রত অবস্থায় ফেলতে একটি সুক্ষ্ণ পদক্ষেপ। এছাড়া এটি গেজেটের অপেক্ষায় থাকায় বর্তমানে ভবন নিমা‌র্ণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন নিমা‌র্তারা। তাদের দাবি, গেজেট না হওয়ায় কোন এলাকা নিয়ে কী সিদ্ধান্ত আসবে সে কারণে অনেকে ভবন নিমা‌র্ণের কাজ শুরু করতে পারছেন না। এতে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।

ড্যাপের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ড্যাপে উত্তর-দক্ষিণে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকা, পশ্চিমে সাভারের বংশী নদী এবং পূর্বে কালীগঞ্জ-রূপগঞ্জ যা শীতলক্ষ্যা নদী বেষ্টিত এলাকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে পৃষ্ঠা ১৫ কলাম ১

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে প্রস্তাবিত ড্যাপের বাস্তবায়ন হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গেজেটের অপেক্ষায় থাকায় বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভবন নির্মাণ নিয়ে স্থবিরতা পার্ক, বিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র করতে অধিগ্রহণ হবে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি  কেরানীগঞ্জকে রাজউকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে রাজউকের এলাকার মোট আয়তন ১৫২৮ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে নগর ধরা হয়েছে ৬০ শতাংশ এলাকাকে। আর এই এলাকায় জনঘনত্বকে বিবেচনা করে ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিয়ো) নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় ঢাকা কেন্দ্রীয় এলাকার (উত্তর ও দক্ষিণ সিটি) জন্য প্রতি একরে ২০০ জন, পুরান ঢাকায় প্রতি একরে ২৫০ জন; গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, পূর্বাচল, ঝিলমিল নগর এলাকার জন্য প্রতি একরে ১৮০ জন, অন্যান্য নগর এলাকার জন্য প্রতি একরে ১৫০ জন (কৃষি এলাকা ছাড়া) ধরা হয়েছে।

পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এটি একটি কারিগরি দলিল। এটি বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ বুঝবে না। দুই সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য জনঘনত্ব অনুযায়ী যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, এর কারণে ভবিষ্যতে বেশিরভাগ মানুষ মূল শহরে থাকতে পারবে না। নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, নতুন ড্যাপে এলাকাভিত্তিক যে ফার নির্ধারণ করা হয়েছে। তা ত্রুটিপূর্ণ। পাশাপাশি দুটি এলাকায় ব্যাপক পার্থক্য রাখা হয়েছে। যেখানে দেখা যায়, বারিধারা এলাকায় প্রায় ফার ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৬। সে অনুযায়ী ১১ থেকে ১২ তলার বেশি করা যাবে না এই এলাকায়। এর পাশেই বাড্ডা এলাকায় ফার ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৩। সে অনুযায়ী দোতলা থেকে তিনতলার বেশি এই এলাকায় করা যাবে না। এই ড্যাপের মাধ্যমে একটি খর্বাকৃতির শহর তৈরি করার চিন্তা করা হচ্ছে। এটি একটি শুভঙ্করের ফাঁকি। আমরা এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছি। আশা করছি সরকার এটি বিবেচনা করবে। সকলের অভিভাবকত্ব ছাড়া এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

এদিকে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) ড্যাপ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ড্যাপের গেজেট প্রকাশে আপত্তি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেছে রিহ্যাব। সংগঠনটি ওই চিঠিতে দাবি করেছে , ‘ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮’ মোতাবেক নির্মাণযোগ্য ভবনে যে পরিমাণ ফার বা বর্গফুট পাওয়া যায় প্রস্তাবিত ড্যাপে তা অনেক কমে গেছে। বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রেও আশঙ্কাজনক হারে আয়তন কমানো হয়েছে। ফলে ঢাকা শহরের ফ্ল্যাটের দাম ন্যুনতম ৫০ শতাংশ বাড়বে, যা ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। এতে আবাসন শিল্প ক্রেতাশূন্য হয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে এবং এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ২৬৯টি লিংকেজ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ৪০ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে।

তাদের দাবি, এখন ২০ ফুট রাস্তা সংলগ্ন পাঁচ কাঠা জমিতে গ্রাউন্ড ফ্লোরসহ আট তলার ভবনে মোট ১৩৫০০ বর্গফুট নির্মাণের অনুমতি পাওয়া যায়। প্রস্তাবিত ড্যাপের বিধিমালা অনুযায়ী ওই জায়গায় ৫ তলা ভবনে মোট ৯০০০ বর্গফুট ভবন নির্মাণের অনুমতি পাওয়া যাবে। ২০ ফুটের চেয়ে ছোট রাস্তার ক্ষেত্রে ভবনের উচ্চতা ৩ থেকে ৪ তলার বেশি হবে না। আয়তন অনেক কমে যাবে। এমন চিত্র প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই হবে। এতে নির্মাণযোগ্য ফ্ল্যাট সংখ্যা কমে আসার কারণে ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। তখন ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। এ বিষয়ে রিহ্যাব ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রথম) কামাল মাহমুদ বলেন, প্রস্তাবিত ড্যাপে বড় রাস্তা এলাকাতেও ভবনে ৫৩ হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তন করা যাবে না। ফার কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আবাসন ব্যবসা। আমরা ড্যাপে ত্রুটিপূর্ণ বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছি।

এছাড়া ড্যাপে ২৮৭টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র, পাঁচটি বৃহৎ আঞ্চলিক পার্ক, ৪৯টি জলকেন্দ্রিক পার্ক, আটটি বৃহৎ ইকোপার্ক (ভাওয়াল বনসহ) এবং ৯টি অন্যান্য পার্ক ও খেলার মাঠ এবং ৬২৭টি স্কুল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় জমি অধিগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, কিভাবে এসব বাস্তবায়ন করা হবে সুনির্দিষ্টভাবে তা উল্লেখ না করলে এটি জমি অধিগ্রহণ করে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহম্মদ খান বলেন, ‘এটি একটি দীর্ঘ পদ্ধতি। খাস জমি ছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করে এসব বাস্তবায়ন কঠিন হবে। মামলা মোকাদ্দমা লড়ে বাস্তবায়ন করা হবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অন্যদিকে ড্যাপের গেজেট প্রকাশ হলে কী হবে এ নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবন নির্মাতা ও আবাসন ব্যবসায়ীরা। এয়ারপোর্ট এলাকার আবাসন ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম কবির বলেন, একটি ভবন নিমা‌র্ণ করার জন্য অপেক্ষায় আছি। কিন্তু ড্যাপের গেজেট না হওয়া পর্যন্ত শঙ্কায় আছি, কততলা ভবনের অনুমোদন পাবো। ভবিষ্যতের বিষয়ে চিন্তা করতে গিয়ে বর্তমান নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা তো বেকায়দায় আছি। এই ক্ষেত্রে একটা স্থবিরতা বিরাজ করছে।

ড্যাপের বিষয়ে রাজউকের প্রকল্প পরিচালক (ড্যাপ) আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঢাকাকে বাসযোগ্য করার লক্ষ্যে এলাকা ভিত্তিক রাস্তা প্রশস্তকরণ, স্কুল, কলেজ ও নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির জন্য এলাকা জনঘনত্ব জোনিংয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাস্তার প্রশস্ততা অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা নির্ধারিত হবে। যেখানে বহুতল ভবনসহ সকল উচ্চতার ভবন নির্মাণের সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, রাজউক এলাকা ভিত্তিক ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করেছে বলে বিভিন্ন মহল বলছে, এটি ঠিক নয়। 

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

চাকরির পেছনে না ছুটে শরিফা এখন উদ্যোক্তা

বিশেষ অবদানের জন্য ৫ ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা

‘আমি বেঁচে থাকি সন্ধ্যামাখা জলের গন্ধে’ শীর্ষক আবৃত্তিসন্ধ্যা অনুষ্ঠিত 

দেশীয় মালিকানাধীন তামাক শিল্প রক্ষায় আইন দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নুরের বিরুদ্ধে থানায় ছাত্রলীগের অভিযোগ

আড়াই মাসেও উদ্ধার হয়নি অপহৃত স্কুলছাত্রী, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা 

রাজধানীতে এবার বসছে ১৯টি পশুর হাট

বিশেষ সংবাদ

জলাবদ্ধতা ঠেকাতে রাজধানীর ১৭৮ স্থানে সংস্কার শুরু