শাবিপ্রবিতে আন্দোলন

মানবিক সংকটে উপাচার্য-শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২২, ২০:৪১

দুই সপ্তাহ অতিক্রম হতে যাচ্ছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যারয় (শাবি)-এর সংকটজনক পরিস্থিতির। গত কয়েকদিন থেকে ‘আলোচনা’র উদ্যোগ নেওয়া হলেও এই সংকটের সমাধান হয়নি। আন্দোলনকারীরা বলছেন, এরই মধ্যে  উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদ ও তারা নিজেরা মানবিক সংকটের মুখোমুখি পড়েছেন। ২৮ শিক্ষার্থী আমরণ অনশনের ১৪৬ ঘণ্টা পার হয় মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬ টায়। তাদের  জীবন এখন সংকটাপন্ন। ‘অর্গান ড্যামেজের ঝুঁকিতে আছেন তারা।

এদিকে, পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা  ভিসির বাসভবন অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। সাংবাদিক ও পুলিশ ছাড়া আর কাউকেই তার বাসভবনে ঢুকতে দিচ্ছেন না তারা। এর আগে রবিবার সন্ধ্যায় ভিসির বাসভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে অবশ্য সোমবার গভীর রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপিত করেন শিক্ষার্থীরা। 

মঙ্গলবার দুপুর ১টায় ভিসির জন্য খাবার নিয়ে তার বাসভবনে প্রবেশ করতে গেলে আবারও শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে পড়েন শাবি শিক্ষক সমিতি। সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ড. তুলসি কুমার দাশ, সাধারণ স¤পাদক মহিবুল আলম, সহ-সভাপতি ড. আশরাফুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক বিভিন্ন ধরনের খাবার নিয়ে ভিসির বাসভবনে প্রবেশ করতে চাইলে ভবনের সামনে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরা তাদের বাধা দেন। এ সময় আলোচনার টেবিলে বসে দাবি কথা তোলার জন্য শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানান শিক্ষকরা। তবে সেই আহ্বানে সাড়া দেননি শিক্ষার্থীরা। 

এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় কয়েকজন শিক্ষক খাবার নিয়ে ভিসির বাসভবনে যেতে চাইলে শিক্ষার্থীরা তাদের ঢুকতে দেননি। ভিসি‘র ভাসভবনে দায়িত্বরত একজন পুলিশ কর্মকর্তা সন্ধ্যায় জানান, শাবি‘র নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মীর মাধ্যমে ভিসি ভবনে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। বাসভবনের কেউ অসুস্থ হলে তাদের চিকিৎসা সেবা দিতে তাদের আপত্তি থাকবে না। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, অনশনরত শিক্ষার্থীদের জন্য মেডিক্যাল সাপোর্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাতে তাদের খাবারের জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য অর্থায়নও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 

চলছে দফায় দফায় আলোচনা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো অচলাবস্থার সমাধান সম্ভব। কিন্তু ফলপ্রসূ আলোচনা হচ্ছে না। শাবি সংকট দূরীকরণের কোনো পথও বের হচ্ছে না। আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও অবরুদ্ধ ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন মানবিক সংকট অতিক্রম করছেন। আলোচনা কোনো শর্তসাপেক্ষে হয় না। আলোচনার জন্য স্পেস থাকতে হবে এমন মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধূরী নাদেলও। কিন্তু গত ১৩ জানুয়ারি থেকে শাবি ক্যাম্পাস উত্তপ্ত। কিন্তু সমাধানের পথ দিনে দিনে কঠিন হচ্ছে। ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ (১৯ জানুয়ারি দুপুর থেকে) নিজ বাসভবনে অবরুদ্ধ। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মশাল মিছিলসহ প্রতিদিন বিক্ষোভ, আমরণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার হাসপাতাল থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় আমরণ অনশন ‘প্ল্যাটফর্মে’ বসেছেন। 

এই সংকটজনিত পরিস্থিতির উত্তরণে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আলোচনাটির পথও ভেস্তে যায় ‘শর্ত’ এর কারণে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকার ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অনড়। সরকার চায় আন্দোলনরতরা যেন অনশন ভেঙে বা শর্ত ছাড়াই আলোচনায় বসেন। আর আন্দোলনকারীরা আলোচনায় রাজি। তবে ভিসি ফরিদ উদ্দিনের পদত্যাগের শর্তে।

বন্ধ মেডিক্যাল সাপোর্ট 

ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দেওয়া মেডিক্যাল সাপোর্ট বন্ধের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীরা জানান, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে থেকে যে যারা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অনশনরত শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছিলেন, তারা সেবা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। মঙ্গলবার (২৫ জানুয়ারি) ভোররাত আড়াইটার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আয়োজিত জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়। তারা গভীর শঙ্কা প্রকাশ ও অনশনকারীদের জীবনঝুঁকির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

আন্দোলনকারীদের এক মুখপাত্র চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে বলেন, 'অনশনরত শিক্ষার্থীদের সবার অবস্থার অবনতি হচ্ছে।  তাদের প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়ছে। তারা  খিঁচুনিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। ব্লাডে অক্সিজেন ও সুগার লেভেল কমে যাচ্ছে। প্রেশারসহ নানা শারীরিক জটিলতায় পড়ছেন। তারা অর্গান ড্যামেজের ঝুঁকিতে আছেন।' তিনি আরও বলেন, 'অনশনকারীদের মেডিক্যাল রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে সিনিয়র চিকিৎসকরা আরও জানিয়েছেন, অনশন দীর্ঘায়িত হলে যেকোনো মুহূর্তে হার্ট ফেইলিওরসহ কোমায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আর্থিক সহায়তা করায় শাবির ৫ সাবেক শিক্ষার্থী আটক

চলমান আন্দোলনে আর্থিক সহায়তা করায় শাবির সাবেক ৫ শিক্ষার্থীকে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. নিশারুল আরিফ বেসরকারি এক সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, 'আটক ব্যক্তিরা মুক্তির পর  এখন রাস্তায় আছেন। তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে।' 

এর আগে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের তুলে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরিবার ও বন্ধুদের অভিযোগ, শাবির আন্দোলনে কিছু অর্থ সহায়তা করায় তাদের আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে শাবি‘র সাবেক ২ শিক্ষার্থীর পরিচয় জানা গেছে।  তারা হলেন শাবিপ্রবির আর্কিটেকচার বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী রেজা নূর মুঈন ও সিএসই বিভাগের ২০১২-১৩  শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান। শাবির চলমান উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের আন্দোলনকারীদের 'টাকা পাঠানোয়' রেজা নূর মুঈনকে আটক করা হয়েছে বলে মনে করেছেন তার স্ত্রী ও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী জাকোয়ান সালওয়া তাকরিম।

সোমবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে তাকরিম অভিযোগ করে বলেন, 'রেজা সন্ধ্যায় উত্তরা অ্যাগোরার কাছে মুদি কেনাকাটার জন্য গিয়েছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তাকে সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইউনিট তুলে নেয়।' পরে তারা রেজার গাড়ি ফেরত দিতে বাসায় আসে। তারা জানায় যে রেজাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যারা বাসায় এসেছিল তাদের গাড়িতে সিআইডির স্টিকার লাগানো ছিল বলে জানান রেজার স্ত্রী।তার ধারণা, শাবিপ্রবিতে চলমান উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের আন্দোলনকারীদের 'টাকা পাঠানোয়' রেজাকে আটক করা হয়েছে।  

এদিকে শাবিপ্রবির সাবেক শিক্ষার্থী শাহ রাজী সিদ্দিক বলেন, 'আমি আর হাবিবুর রহমান গত প্রায় আড়াই বছর ধরে একসঙ্গে থাকি। তাকে সিআইডির লোকেরা উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টর এলাকা থেকে তুলে নিয়ে গেছে।' হাবিবুরকে নিয়ে যাওয়ার সময় ৩ জন সিআইডি কর্মকর্তা ছিল। যোগাযোগের জন্য মাহমুদুল ইসলামের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে যায় বলে তিনি জানান। তিনি জানান, হাবিব জার্মানির একটা সফটওয়্যার ফার্মে চাকরি পেয়েছেন। গতকালই তার ভিসা হয়েছে। তবে আটকের বিষয়ে জানতে সিআইডির মুখপাত্র আজাদ রহমান ও সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল ইসলাম তালুকদারকে একাধিকবার কল করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। ফোনে মেসেজ পাঠালে কোনো উত্তর দেননি।

শাবির ফুডকোর্ট বন্ধ

আন্দোলন চলাকালীন এর আগে ক্যাম্পাসে অবস্থিত ফুডকোর্টগুলো বন্ধ করা না হলেও মঙ্গলবার থেকে খাবারের দোকান বন্ধ করা হয়। এ বিষয়ে আন্দোলনকারীরা বলেন, হয়তো আন্দোলনকালীন আমরা সহজে যেন  খাবার না পেতে পারি, এজন্য এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 

২৪ ঘণ্টা শেষ হলেও ব্যাখ্যা দেয়নি প্রশাসনিক শিক্ষকরা

গত ২২ জানুয়ারি, শাবির মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকরা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে-যাওয়া যেকোনো ঘটনার দায়ভার কোনোভাবেই প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এড়াতে পারেন না। এমতাবস্থায়, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যাবতীয় বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের অফিশিয়াল ব্যাখ্যা জনসমক্ষে  উপস্থাপন করার দাবি জানাই। একইসঙ্গে  উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য  দায়ী ব্যক্তিদের পদত্যাগেরও জোর দাবি করছি। এ বিজ্ঞপ্তির ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনিক পদে থাকা কোন শিক্ষক জনসমক্ষে তাদের দায়-দায়িত্ব উপস্থাপন করেননি বলে জানা যায়।’

শাবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের শুরু ১৩ জানুয়ারি। রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্ট জাফরিন আহমেদ লিজার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগসহ ৩ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন হলের কয়েক শ ছাত্রী। ১৬ জানুয়ারি বিকেলে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি ভবনে ভিসিকে অবরুদ্ধ করলে তখন শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা, গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে ভিসিকে মুক্ত করে পুলিশ। 

পরে পুলিশ ৩০০ জনকে আসামি করে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা করে। সেদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীরা তা উপেক্ষা করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে তার পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামেন।বাসভবনের সামনে অবস্থানের কারণে গত ১৭ জানুয়ারি থেকেই অবরুদ্ধ অবস্থায় ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদ। ১৯ জানুয়ারি দুপুর আড়াইটা থেকে ভিসির  পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরণ অনশনে বসেন ২৪ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে একজনের বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি অনশন শুরুর পরদিনই বাড়ি চলে যান। ২৩ জানুয়ারি আরও পাঁচজন শিক্ষার্থী অনশনে যোগ দেন।

এর মাঝে ভিসি ইস্যুতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ২২ জানুয়ারি গভীর রাতে ভার্চুয়ালি বৈঠক করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপুমনির সঙ্গে। বৈঠকে ভিসির পদত্যাগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও দাবিগুলো লিখিতভাবে জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তবে বৈঠকের পর শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের মূল দাবি ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগ। এই দাবি না মানা পর্যন্ত তারা আন্দোলন থেকে সরবেন না। ২৩ জানুয়ারি দুপুরের পর শিক্ষার্থীদের আবার শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তবে তা না হওয়ায় তারা ভিসিকে অবরুদ্ধের ঘোষণা দেন। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত অনশনকারীদের মধ্যে ১৮ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি ১০ জন অনশনকারী ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান করছেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি